kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঢামেকে অ্যাম্বুল্যান্সচাপায় চারজনের মৃত্যু

ট্রলিতে শুয়ে স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখলেন জাকির

রেজোয়ান বিশ্বাস   

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ট্রলিতে শুয়ে স্ত্রী-সন্তানের লাশ দেখলেন জাকির

গতকাল রবিবার বিকেল পৌনে ৪টা। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের সামনে এসে দাঁড়াল একটি অ্যাম্বুল্যান্স।

ঠিক একই সময়ে বার্ন ইউনিট থেকে ট্রলিতে করে নামানো হলো ট্রাকচালক জাকির হোসেনকে। তাঁর দুই পায়ে ব্যান্ডেজ। পায়ের ক্ষত থেকে রক্ত ঝরছে। কপালে হাত দিয়ে ট্রলিতে অনেকটা নিথর হয়ে পড়ে আছেন তিনি। অ্যাম্বুল্যান্স ঘিরে আছে স্বজন আর উত্সুক লোকজন। কয়েকজন স্বজন এসে ট্রলি থেকে তুলে জাকিরকে উঁচু করে ধরলেন। অ্যাম্বুল্যান্সের ভেতর কফিনে রাখা স্ত্রী আমেনা বেগম আর তাঁর গর্ভেই মারা যাওয়া সন্তানের লাশ। একটু চুপ করে থেকে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন জাকির, ‘ও খোদা আমার একি হয়ে গেল। আমি বাঁচতে চাই না, ক্যান বাঁচায়া রাখছো খোদা, হেগো আগে খোদা আমারে নিয়া গেলা না কেন। ’ এভাবে বিলাপ করে কাঁদতে কাঁদতে এক সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন জাকির। কফিনের ঢাকনা বন্ধ করে দেওয়া হলো। এভাবেই স্ত্রী-সন্তানকে চিরবিদায় জানালেন ট্রাকচালক জাকির। এরপর আবার বার্ন ইউনিটের নিজ বিছানায় তাঁকে শোয়ানো হলো ধরাধরি করে। লাশবাহী অ্যাম্বুল্যান্সটি রওনা দিল ঝিনাইদহের উদ্দেশে। গত শনিবার সকালে ঢামেকের ভেতরেই একটি অ্যাম্বুল্যান্স নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে কয়েকজনকে চাপা দেয়। এতে আমেনার গর্ভের সন্তানকে মৃত প্রসব করানো হয়। এরপর মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আমেনাও। তাঁদের আরেক সন্তান সজীব ঢামেক হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে। ওই ঘটনায় আরো দুজনের মৃত্যু হয়। জাকিরের মামা আমিনুর রহমানের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, জাকিরের স্ত্রী আমেনা ও তাঁর গর্ভের সন্তানের লাশ গ্রামের বাড়ি নিয়ে দাফন করা হবে। শিশু সজীব চিকিৎসাধীন। তাকে এখনো তার মায়ের মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি। গত শনিবার দুর্ঘটনার পর থেকে বাবা জাকিরের সঙ্গেও তার দেখা হয়নি। আমিনুর বলেন, একটি দুর্ঘটনায় পুরো পরিবারটিই শেষ হয়ে গেল।   

আমিনুর রহমান জানান, গত ২৫ আগস্ট চট্টগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মক আহত হয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ বার্ন ইউনিটে ভর্তি হন ভাগ্নে জাকির। ওই দুর্ঘটনায় তাঁর একটি পা ভেঙেছে। অপর পায়ের গোড়ালি থেকে হাঁটুর ওপর পর্যন্ত চামড়া মাংসসহ উঠে গেছে। এর পর থেকে অনেকটা পঙ্গু অবস্থায় বার্ন ইউনিটে তাঁর চিকিৎসা চলছে। হাতের লাঠি অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আর ছেলে সজীবই তাঁকে হাসপাতালে দেখাশোনা করত। স্ত্রী আর নেই, ছেলে কাতরাচ্ছে। জাকির এখন বড় অসহায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যে অ্যাম্বুল্যান্সচাপায় চারজন নিহত হয়েছে সেটির মালিক ঢামেক হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় মাহফুজ। মাহফুজ চালকের সহকারী সোহেল মিয়াকে (১৮) রাস্তা থেকে অ্যাম্বুল্যান্সটি জরুরি বিভাগের সামনে আনতে বলেন। এরপর অ্যাম্বুল্যান্সটি জরুরি বিভাগের ফটক লাগোয়া পুলিশ ফাঁড়ির সামনে দিয়ে আসার সময় নিয়ন্ত্রণ হারায়। আর তখনই ঘটনাস্থলে মারা যায় তিনজন। পরে গর্ভের সন্তানসহ মারা যান জাকিরের স্ত্রী।

অ্যাম্বুল্যান্সচাপায় নিহত অপর ব্যক্তিরা হলেন গোলেনুর বেগম ও তাঁর সাত বছরের ছেলে সাকিব এবং অজ্ঞাতপরিচয় পুরুষ (৬০)। নিহতদের মধ্যে তিনজনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে গতকাল পরিবারের লোকজন দাফনের জন্য গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গেছে। তবে অজ্ঞাতপরিচয় ওই ব্যক্তির লাশ এখনো মর্গে পড়ে আছে। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পাশে রাস্তায় ওই ব্যক্তি ভিক্ষা করতেন।

অ্যাম্বুল্যান্সচাপায় স্ত্রী গোলেনুর বেগম ও সাত বছরের ছেলে সাকিবকে হারিয়ে এখন পাগলপ্রায় রিকশাচালক ফেরদৌস। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ছেলে সাকিবের চিকিৎসার জন্য স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে ঢামেক হাসপাতালে আসেন। পাঁচ মাসের সন্তান রেখে তাঁর স্ত্রী মারা গেছেন। এখন এই শিশুসন্তানকে কে দেখবে। তিনি ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে চালকের সহকারী সোহেল মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে শাহবাগ থানার পুলিশ। জব্দ করে অ্যাম্বুল্যান্সটি শাহবাগ থানায় নেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনার পর থেকে অ্যাম্বুল্যান্সটির মূল চালক সোহাগ ও মালিক মাহফুজ গা ঢাকা দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

শাহবাগ থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিকি কালের কণ্ঠকে বলেন, এ ঘটনায় গাড়ির মালিক ঢামেকের ওয়ার্ড বয় মাহফুজসহ চালক সোহাগ, হেলপার সোহেলকে আসামি করে একটি মামলা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন নিহত আমেনার স্বামী ফেরদৌস ওরফে জাকির। এজাহারে বলা হয়েছে, ‘দ্রুত বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু’। গতকাল তাঁকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়ার অনুমতি দিয়েছেন আদালত।

তবে পুলিশ মনে করছে, এটাকে হত্যাই বলা যায়। চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই, গাড়ি চালানোর অভিজ্ঞতাও তেমন নেই। সেই কারণে তার কাছে গাড়ি ছেড়ে দিয়ে মূল চালক ও গাড়ির মালিক সম-অপরাধ করেছেন। এ কারণে তাঁদেরও বিচারের আওতায় আনা হবে। প্রাথমিক তদন্ত শেষে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই শাহ আলম বলেন, ঘটনার পরপরই গাড়ি যিনি চালাচ্ছিলেন সেই সোহেলকে (হেলপার) গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁকে গতকাল আদালতে পাঠানো হয়। পরে শুনানি শেষে আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠিয়েছেন। তদন্তে এখন পর্যন্ত জানা গেছে, অ্যাম্বুল্যান্সটির মূল চালক সোহাগ শুক্রবার রাতে অ্যাম্বুল্যান্সে করে লাশ নিয়ে ঢাকার বাইরে যান। শনিবার ভোরে ফিরে এসে অ্যাম্বুল্যান্সটি ঢামেক জরুরি বিভাগের সামনে রেখে দেন। এরপর সকালে ওয়ার্ড বয় মাহফুজ আরেকটি লাশ নেওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্সটি নিয়ে আসতে তাঁর সহকারী অর্থাৎ অ্যাম্বুল্যান্সটির হেলপার সোহালকে বলেন। আর তখনই ওই অ্যাম্বুল্যান্সচাপায় চারজন মারা যায়। এ ছাড়া তদন্তে ওই অ্যাম্বুল্যান্সের কোনো বৈধ কাগজপত্রও পাওয়া যায়নি। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের পার্কিংও অবৈধ।   অ্যাম্বুল্যান্সটির আরো একজন মালিক আছেন। তাঁর নাম নাসির। তবে মামলায় তাঁর নাম নেই।

জানতে চাইলে ঢামেক হাসপাতালের উপপরিচালক খাজা আব্দুল গফুর কালের কণ্ঠকে বলেন, অ্যাম্বুল্যান্সটির মালিক মাহফুজ হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় বলে জানা গেছে। তবে হাসপাতালে চাকরি করে অ্যাম্বুল্যান্সের ব্যবসা করা পুরোপুরি বেআইনি। সার্বিক বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মিজানুর রহমান জানান, গতকাল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একজন উপপরিচালককে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে আগামী পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্স মালিক ও হাসপাতালের ওয়ার্ড বয় মাহফুজকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালের সামনে প্রতিদিন কমপক্ষে আটটি অ্যাম্বুল্যান্স দাঁড় করে রাখা হয়, যার বেশির ভাগের মালিক ঢামেক হাসপাতালের কর্মচারী। রাস্তার ওপর অ্যাম্বুল্যান্স রাখতে হাসপাতালের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও পুলিশের অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। এমন পরিস্থিতি হাসপাতালের ঊর্ধ্বতনরা জানলেও এসব অসাধু চক্রের কাছে অনেকটা জিম্মি হওয়ায় তাঁরা ব্যবস্থা নিতে পারছেন না।


মন্তব্য