kalerkantho


হিলারির মাদক পরীক্ষার দাবি ট্রাম্পের

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হিলারির মাদক পরীক্ষার দাবি ট্রাম্পের

প্রথম প্রেসিডেনশিয়াল বিতর্কে রিপাবলিকান দলের প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, নির্বাচনের ফল যাই হোক তিনি মেনে নেবেন। ‘হিলারি (ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন) জিতলে আমি তাঁকে সবভাবে সহযোগিতা করব’—তাঁর দাবি ছিল এমনই। তবে মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে নানা বিতর্কের জেরে জয়ের সম্ভাবনা ফিকে হতে শুরু করার পরই ভোল পাল্টে ফেললেন ট্রাম্প। এখন তাঁর অভিযোগ, নির্বাচন ব্যবস্থাটি জালিয়াতিতে ভরা। এটুকুতেই থেমে যাননি তিনি। তাঁর আরো দাবি, শেষ বিতর্কের আগে দুই প্রার্থীরই মাদক পরীক্ষা করতে হবে। কারণ প্রথম দুই বিতর্কে এই মাদকের প্রভাবেই হিলারির উপস্থাপনা ভালো হয়!

এমন একসময়ে ট্রাম্প এসব অভিযোগ তুলছেন যখন একের পর এক নারী বিভিন্ন সময়ে তাঁর যৌন অসদাচরণের ঘটনা নিয়ে মুখ খুলছেন। একই সঙ্গে জাতীয়ভাবে এবং বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে মতামত জরিপে হিলারির তুলনায় পিছিয়ে পড়েছেন তিনি।

হিলারির বিরুদ্ধে মাদকের অভিযোগ : একের পর এক যৌন হয়রানির অভিযোগে বিপর্যস্ত ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারির বিরুদ্ধে মাদক নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। ট্রাম্পের অভিযোগ, দ্বিতীয় বিতর্কে হিলারি মঞ্চে উঠেছিলেন মাদক নিয়ে। এবার তৃতীয় বিতর্কের আগে দুজনেরই মাদক পরীক্ষার দাবি তুলেছেন তিনি। গত শনিবার নিউ হ্যাম্পশায়ারের এক সমাবেশে এ দাবি জানান তিনি।

হ্যাম্পশায়ারের সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, গত ১০ অক্টোবর দ্বিতীয় বিতর্কের শুরুতে হিলারিকে দারুণ উজ্জীবিত দেখাচ্ছিল। কিন্তু শেষে মনে হচ্ছিল, উনি বোধ হয় নিজের গাড়ি পর্যন্তই হেঁটে যেতে পারবেন না। জোর কণ্ঠে এ প্রার্থী বলেন, ‘আমাদের ড্রাগ টেস্ট হওয়া উচিত। ’

অবশ্য যে অভিযোগ তিনি তুলেছেন, তার কোনো প্রমাণ হাজির করেননি এই রিপাবলিকান প্রার্থী। হিলারি শিবির অবশ্য ট্রাম্পের এই বক্তব্যকে দেখছে ভোটে হারার ভয় থেকে তাঁর ‘নির্লজ্জ মন্তব্য’ হিসেবে।

গত ৭ অক্টোবর ওয়াশিংটন পোস্ট ২০০৫ সালে ট্রাম্পের সঙ্গে এনবিসি টিভির উপস্থাপক বিলি বুশের একটি কথোপকথন ফাঁস করে। ওই অডিও টেপে ট্রাম্পকে বলতে শোনা যায়, ‘তুমি যদি তারকা হও, তবে মেয়েদের নিয়ে যা ইচ্ছা তাই করতে পারো’। কথোপকথনে বিবাহিত এক অভিনেত্রীর সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপনে উদগ্র আগ্রহের কথাও বলতে শোনা যায় ট্রাম্পকে।

ওই টেপ ফাঁস হওয়ার পরই হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের স্পিকার রিপাবলিকান পল রায়ান জানিয়ে দিয়েছিলেন, সমর্থন না তুলে নিলেও তিনি আর ট্রাম্পের পক্ষে প্রচার চালাবেন না। তাঁর মতোই একডজনেরও বেশি রিপাবলিকান নেতা ট্রাম্পের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নেন।

দ্বিতীয় বিতর্কে ফাঁস হওয়া ওই টেপকে ‘লকার রুমের কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিন্তু এর পর এক নারী ১৩ বছর বয়সে ধনকুবের ট্রাম্পের ধর্ষণের শিকার হওয়ার অভিযোগে মামলা করেন। বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্পের যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খোলেন অন্তত পাঁচ নারী।

ট্রাম্প অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাঁর দাবি, ওই নারীদের সঙ্গে তাঁর ‘কিছুই হয়নি’ এবং নারীর প্রতি তাঁর চেয়ে বেশি সম্মান আর কেউ দেখাতে পারবে না।

নির্বাচন পদ্ধতিতেই কারচুপি : ‘পুরো ব্যবস্থাই জালিয়াতিপূর্ণ। এ কারণেই গণমাধ্যম যা খুশি তাই করতে পারে, এখন যেমন করছে। ’ গত শুক্রবার শার্লোটে এক জনসভায় ভাষণ দেওয়ার সময় এ অভিযোগ করেন ট্রাম্প। তার পর থেকেই এ অভিযোগ শুনিয়ে চলেছেন তিনি এবং তাঁর প্রচার শিবির। যদিও ট্রাম্প কারচুপির গন্ধ পেলেও তাঁর দলের জ্যেষ্ঠ নেতা স্পিকার পল রায়ান বলেছেন, আসছে ৮ নভেম্বরের নির্বাচন যে সুষ্ঠুভাবেই হবে, এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত।

ট্রাম্প অবশ্য জনসভায় বলেই বিষয়টি ইতি টানেননি। গত শনিবার তিনি এ নিয়ে একাধিক টুইট বার্তাও পোস্ট করেন। তিনি বলেন, এত জালিয়াতিপূর্ণ ব্যবস্থা আগে কেউ কখনো দেখেনি। ট্রাম্প অবশ্য এই অভিযোগ এবারই প্রথম করলেন না। এর আগেও যখন তাঁর প্রচার ধাক্কা খেয়েছিল তখনো তিনি একই অভিযোগ করেন। আগস্টের গোড়ার দিকে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, ‘আমি আশা করব রিপাবলিকানরা এই প্রচারের দিকে ঘনিষ্ঠ নজর রাখবেন, নয়তো (নির্বাচনের ফল) আমাদের কাছ থেকে ওরা ছিনিয়ে নেবে। ’ সে সময় গোল্ড স্টার পরিবার খাজির ও ঘাজালা খানকে নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্যের জের ধরে জনপ্রিয়তায় ধস নামে তাঁর।

এরও আগে প্রাইমারি চলাকালে আইওয়াকে বিজয়ের পর কারচুপির অভিযোগ তোলেন তিনি। তখনো তাঁর প্রার্থিতা নিশ্চিত হয়নি।

প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচন আইন বিশেষজ্ঞ কিম লান স্ক্যাপল বলেন, সাধারণত নির্বাচনে সেই সব প্রার্থী অংশ নেন, যাঁদের এ ব্যবস্থার প্রতি গভীর আস্থা রয়েছে। অনিশ্চয়তার বিষয়টি আসে সচেতন ভোটারদের তরফ থেকে, প্রার্থীর পক্ষ থেকে নয়। ‘সমস্যা হলো, তাঁর সমর্থকরাও বিষয়টি বিশ্বাস করে। এ কারণেই তিনি যদি নির্বাচনে পরাজিত হন, তাঁর সমর্থকরা তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে। তবে এ দাবির পক্ষেও ট্রাম্প কোনো প্রমাণ দেখাননি বা কোনো ঘটনার কথা উল্লেখ করেননি। কিন্তু এ বিষয়টি নিয়ে তাঁর বারবার অভিযোগ যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যা দেশটির গণতন্ত্রের ভিত্তিপ্রস্তরস্বরূপ।

তবে ট্রাম্পের দলের স্পিকার পল রায়ান বিষয়টিকে এভাবে দেখেন না। রায়ানের প্রেস সেক্রেটারি এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের গণতন্ত্র নির্বাচনের ফলের ওপর নির্ভরশীল ও আস্থাশীল। এ ব্যবস্থায় স্পিকারেরও পূর্ণ আস্থা রয়েছে। গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা রাখাও আইনের অংশ। ’

যদিও এ নিয়ে ভোটারদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। গত মার্চে গ্যালপ পরিচালিত এক জরিপে দেখা যায়, মাত্র ৩০ শতাংশ আমেরিকান মনে করে, তাদের নির্বাচনী ব্যবস্থা যথাযথ। তবে এও সত্য যে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ব্যবস্থা বেশ বিদঘুটে। বেশির ভাগ আমেরিকানের কাছেই নির্বাচন ব্যবস্থা স্বচ্ছ নয়। বোঝে না বলেই মনে করে, এতে গলদ রয়েছে।

‘ভারতপ্রেমী’ ট্রাম্প : নিউ জার্সিতে ‘হিন্দু রিপাবলিকান কোয়ালিশন’ নামে এক সংগঠন আয়োজিত এক নির্বাচনী জনসভায় ট্রাম্প বলেন, ‘হিন্দুদের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। আমার এমন অনেক বন্ধু আছে, যারা হিন্দু। ওরা দারুণ মানুষ, অসাধারণ ব্যবসায়ী!’ তিনি আরো বলেন, ‘সত্যি কথা বলতে কি, ভারতের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা আছে আমার। দেশটা অসাধারণ। ’

ওই অনুষ্ঠানের মূল বিষয় ছিল, ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’। নির্বাচনের আগে যে বিষয় নিয়ে বিভিন্ন জনসভায় জোরদার মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প। মুসলিমদের আমেরিকায় ঢোকার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির মতো উগ্র ধর্মান্ধ বক্তব্যও বেরিয়েছে তাঁর ভাষণে। কিন্তু জনসভায় আর সেসব তোলেননি তিনি

ইলেক্টোরাল কলেজে শক্ত অবস্থানে হিলারি : যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারে ট্রাম্প অপ্রীতিকর একটি সপ্তাহ কাটানোর পর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনের অবস্থান আরো সংহত হয়েছে। শনিবার বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও জরিপ সংস্থা ইপসোস প্রকাশিত সর্বশেষ জরিপে ইলেক্টোরাল কলেজে হিলারি অনেক এগিয়ে আছেন বলে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে হলে পপুলার ভোটের পাশাপাশি ইলেক্টোরাল কলেজের ভোটেও জয় পেতে হয়। এ ক্ষেত্রে একজন প্রার্থী কমপক্ষে ২৭০টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট পেলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

জরিপে দেখা গেছে, চলতি সপ্তাহে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭০টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট হিলারির পাওয়ার সম্ভাবনা ৯৫ শতাংশেরও বেশি ছিল। এতে দেখা যায়, হিলারি অন্তত ৩১০টি ইলেক্টোরাল ভোট পেতেন এবং ট্রাম্প পেতেন মাত্র ১৭৬টি। এ নিয়ে টানা দ্বিতীয় সপ্তাহের মতো জরিপে হিলারি বড় ব্যবধানে এগিয়ে আছেন বলে দেখা গেল। অন্যান্য জরিপেও ইলেক্টোরাল কলেজে হিলারির শক্ত অবস্থান লক্ষ করা গেছে। এর মধ্যে কোনো কোনোটিতে দেখা গেছে, হিলারির জয়ের ৯০ শতাংশ সম্ভাবনা আছে।

নির্বাচনে জয়ী হতে চাইলে কয়েকটি রাজ্যে ট্রাম্পকে অবশ্যই জয় পেতে হবে। এর মধ্যে ফ্লোরিডা অন্যতম। এই রাজ্যে ২৯টি ইলেক্টোরাল কলেজ ভোট আছে; কিন্তু এই অঙ্গরাজ্যে ৬ শতাংশ বেশি সমর্থন পেয়ে এগিয়ে আছেন হিলারি, গত সপ্তাহেও এখানে তিনি একই ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।

ট্রাম্পের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্য ওহাইও। গত সপ্তাহে ওহাইও ও নেভাডা হিলারির পক্ষে ঝুঁকে থাকলেও চলতি সপ্তাহে পরিস্থিতি প্রায় সমান সমান হয়ে গেছে।

হিলারির আরো ই-মেইল প্রকাশ : বিকল্প ধারার গণমাধ্যম উইকিলিকস হিলারির আরো কিছু ই-মেইল ফাঁস করেছে। এক মেইলে বলা হয়, হিলারি এক বক্তৃতায় বলেন, উত্তর কোরিয়ার পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কার্যক্রমের লাগাম টেনে ধরতে আরো সক্রিয় না হলে চীনকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বলয়ে যুক্তরাষ্ট্র ঘিরে ফেলবে। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর প্রচার শিবিরের চেয়ারম্যানের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট নিয়ন্ত্রণে নিয়ে হাতিয়ে নেওয়া ই-মেইলে থাকা হিলারির এই বক্তব্য প্রকাশ করেছে উইকিলিকস। বিকল্প ধারার এই গণমাধ্যমটি বলছে, তিন বছর আগে ২০১৩ সালের ৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বহুজাতিক ব্যাংকিং ফার্ম গোল্ডম্যান স্যাকসে এক বক্তৃতায় চীনকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বলয়ে ঘিরে ফেলার ওই কথা বলেছিলেন হিলারি।

‘চীনকে ওই বার্তা দেওয়া হয়েছে যে তুমি তাদের (উত্তর কোরিয়া) নিয়ন্ত্রণ করো, আর তা না হলে আমরা তাদের থেকে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিচ্ছি। ’ সূত্র : বিবিসি, এএফপি, সিএনএন, রয়টার্স, এনবিসি।


মন্তব্য