kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ট্রেনের ছবি তুলতে গিয়ে কাটা পড়ল তিন শিশু

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি   

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ট্রেনের ছবি তুলতে গিয়ে কাটা পড়ল তিন শিশু

নিহত মোনায়েম

চলন্ত একটি ট্রেনের দৃশ্য মোবাইল ফোনে ধারণ করার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয়েছে তিন শিশু। গতকাল রবিবার সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার ভাদুঘর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

তিন শিশুর এমন মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নিহত শিশুরা হলো আনিস মিয়ার ছেলে পারভেজ (১৪), বাহার মিয়ার ছেলে মোনায়েম (১২) ও কাউছার মিয়ার ছেলে শুভ (১১)। পারভেজ ও মোনায়েমের বাড়ি ভাদুঘর এলাকায়ই। শুভর বাড়ি বিজয়নগর উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামে। সে পারভেজের খালাতো ভাই। গত শনিবার মা-বাবার সঙ্গে খালার বাড়ি বেড়াতে এসেছিল সে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, পারভেজ ভাদুঘরের মাহবুবুল হুদা উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ত। স্থানীয় একটি মাদ্রাসার ছাত্র ছিল মোনায়েম। আর শুভ নোয়াগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই তিনজনের লাশ গতকাল বিকেলে স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেয় রেলওয়ে পুলিশ।

স্থানীয়রা জানায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাদুঘর অংশে ডাবল লাইন (আপ-ডাউন) রয়েছে। সকালে একটি লাইনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিল সোনার বাংলা ট্রেন। পাশের লাইনটি দিয়ে সিলেট থেকে ঢাকা অভিমুখে যাচ্ছিল সুরমা মেইল ট্রেন। ওই তিনজন সোনার বাংলা ট্রেনটির দৃশ্য ধারণ করছিল। তারা যে লাইনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল সেটি দিয়েই ঢাকার দিকে যাচ্ছিল সুরমা মেইল ট্রেন। তাতেই ধাক্কা খেয়ে কাটা পড়ে তিনজন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, সম্প্রতি এ পথে চালু হয়েছে সোনার বাংলা ট্রনটি। নতুন বগি নিয়ে যাত্রা শুরু করা ট্রেনটি দেখতে বেশ সুন্দর। প্রায় প্রতিদিনই স্থানীয় লোকজনকে ট্রেনটি দেখতে ও ছবি তুলতে রেললাইনের পাশে অপেক্ষা করতে দেখা যায়।

প্রত্যক্ষদর্শী ভাদুঘর এলাকার রফিকুল ইসলাম ও মান্নান মিয়া জানান, রেললাইনের পাশেই একটি ছোট টং দোকান রয়েছে। তারা কয়েকজন মিলে সেই দোকানে বসেছিলেন। সকাল তখন সোয়া ৯টার মতো। হঠাৎ তাঁদের চোখ পড়ে রেললাইনে। তাঁরা দেখেন, তিনটি শিশু পাশের লাইনে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে সোনার বাংলা ট্রেনের দৃশ্য ধারণ করছে। শিশুরা যে লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল সেই লাইন দিয়ে আরেকটি ট্রেন আসছিল, বুঝতে পেরে তাঁরা ডাকাডাকি করতে থাকেন। কিন্তু শব্দের তীব্রতায় সে ডাক শিশুদের কানে যাওয়ার আগেই মুহূর্তের মধ্যেই তিনজন কাটা পড়ে। পারভেজ ও শুভ ঘটনাস্থলেই মারা যায়। মাথায় ও হাতে আঘাত পাওয়া মোনায়েমকে উদ্ধার করে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সেখান থেকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে ঢাকায় নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।  

পারিবারিক সূত্র জানায়, ছবি তোলার কথা বলে সকালে শুভ তার বাবার কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি চেয়ে নেয়। পরিবারের লোকজন জানত না যে সে ছবি তোলার জন্য অন্যদের নিয়ে রেললাইনে গেছে। দুর্ঘটনার পর এলাকার লোকজনের মুখে শুনে বিষয়টি তারা জানতে পারে।

শুভর বাবা কাউছার মিয়া কাঁদতে কাঁদতে বলেন, শনিবার তাঁরা বিজয়নগর থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেড়াতে আসেন। সকালে (গতকাল) ছবি তোলার কথা বলে পীড়াপীড়ি করে তাঁর কাছ থেকে মোবাইল ফোনটি চেয়ে নেয় শুভ। এরপর খালাতো ভাই পারভেজকে সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর তাঁরা খবর পান ছবি তুলতে গিয়ে একাধিক শিশু ট্রেনে কাটা পড়েছে। খোঁজ নিয়ে দেখেন সেই শিশুদের মধ্যে শুভও আছে।

আখাউড়া রেলওয়ে থানার ওসি মো. আবদুস সাত্তার বলেন, ওই তিন শিশু রেললাইনে বসেছিল। একপর্যায়ে তারা মোবাইল ফোনে চট্টগ্রামগামী সোনার বাংলা ট্রেনের দৃশ্য ধারণ করতে থাকে। একই সময় পাশের লাইন দিয়ে বিপরীত দিক থেকে আসা ট্রেনে তারা কাটা পড়ে। মোবাইল ফোনে দৃশ্য ধারণের সময় তাদের মনোযোগ ছিল সামনে দিকে, তাই পেছন থেকে আসা ট্রেনের শব্দ তারা শুনতে পায়নি। পরিবারের লোকজনের কোনো অভিযোগ না থাকায় ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম নেহার বলেন, ‘পারভেজ ও মোনায়েম আমাদের এলাকার সন্তান। উভয়ের পরিবারই দরিদ্র। পারভেজের বাবা রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। মোনায়েমের বাবা আগে সিএনজি অটোরিকশা চালাতেন। সম্প্রতি তিনি বিদেশে গেছেন। পরিবারের একমাত্র ছেলে সন্তানদের এমন মৃত্যুতে স্বজনদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তবে দুর্ঘটনার বিষয়ে পরিবারের কারো কোনো অভিযোগ নেই। ’

গতকাল সন্ধ্যায় জানাজা শেষে পারভেজ ও মোনায়েমের লাশ ভাদুঘর কবরস্থানে দাফন করা হয়। শুভর লাশ দাফন করার কথা বিজয়নগর গ্রামে তাদের নিজ বাড়িতে।

তবে তিন শিশু যে মোবাইল ফোনটিতে ট্রেনের দৃশ্য ধারণ করছিল, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সেটির কোনো খোঁজ পায়নি পুলিশ। পরিবারের লোকজনও এ বিষয়ে কিছু বলতে পারেনি।


মন্তব্য