kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


তৃণমূলের তোপে পড়বেন অনেক মন্ত্রী-এমপি

তৈমুর ফারুক তুষার   

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



তৃণমূলের তোপে পড়বেন অনেক মন্ত্রী-এমপি

আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনে জেলা পর্যায়ের নেতারা খোলামেলা বক্তব্য রাখার সুযোগ পেতে যাচ্ছেন। এই সুযোগে তাঁদের বক্তব্যে নিজ এলাকায় সংগঠন শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হওয়া মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতাদের ওপর ক্ষোভের প্রকাশ ঘটবে।

এবার সম্মেলন হবে দুই দিনব্যাপী। প্রথমদিকে এ সম্মেলন এক দিনেই শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা। পরে তা বাড়িয়ে দুই দিন করার সিদ্ধান্ত দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তিনি সম্মেলনে সারা দেশ থেকে উপস্থিত হওয়া তৃণমূল নেতাদের মনের কথা শুনতেই এমন সিদ্ধান্ত দেন বলে জানা গেছে। আর এ সুযোগটিই কাজে লাগাতে যাচ্ছেন দলের জেলা পর্যায়ের অনেক নেতা। তাঁরা দলের শীর্ষ নেতার সামনে মন খুলে বলবেন নিজ জেলার সাংগঠনিক হালচাল। দলের যেসব মন্ত্রী, এমপি ও কেন্দ্রীয় নেতা নিজ এলাকার নেতাকর্মীদের এড়িয়ে চলেন তাঁদের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরবেন তৃণমূল নেতারা। গতকাল রবিবার আওয়ামী লীগের ১৫টি সাংগঠনিক জেলার গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা বলে এমন আভাস পাওয়া গেছে।

আওয়ামী লীগের জেলা পর্যায়ের ওই নেতারা জানান, টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আছে দল। অথচ এই অনুকূল সময়কে কাজে লাগিয়ে তৃণমূলে দলকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করতে পারেননি অনেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা। তাঁরা নিজ এলাকায় নেতাকর্মীদের সময় দেন না। আওয়ামী লীগের দুর্দিনে যাঁরা দলের জন্য কষ্ট-ত্যাগ স্বীকার করেছেন তাঁদের মূল্যায়ন করেন না। অনেকে  জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের দলে ভিড়িয়ে তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন। কেউ কেউ আবার জামায়াত-বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তাদের সঙ্গে ওঠাবসা করেন। এবারের জাতীয় সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেলে দলীয় প্রধানের সামনে বিষয়গুলো তুলে ধরবেন বেশ কয়েকটি জেলার নেতারা।

জেলা পর্যায়ের ওই নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের যে আহ্বান জানিয়েছেন সে প্রসঙ্গেও কথা বলবেন জেলার নেতারা। তাঁরা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে শেখ হাসিনাকে রেখে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে তরুণ নেতৃত্ব নির্বাচনেরও পরামর্শ দেবেন।

গত শনিবার আওয়ামী লীগের জাতীয় কমিটির বৈঠকে শেখ হাসিনার কাছে তৃণমূলের সঙ্গে মন্ত্রী-এমপিদের সম্পর্ক না রাখা নিয়ে অসন্তুষ্টির কথা জানান জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা। এর জবাবে শেখ হাসিনা দলীয় মন্ত্রী-এমপিদের তৃণমূলের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতে বলেছেন। তৃণমূল নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করলে ভবিষ্যতে জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন ও দলের কোনো পর্যায়েই পদ দেওয়া হবে না বলেও মন্ত্রী-এমপিদের সতর্ক করে দেন শেখ হাসিনা। ওই বৈঠকের সূচনা বক্তব্যে আওয়ামী লীগ সভাপতি তাঁর ৩৫ বছর দায়িত্ব পালনের কথা তুলে ধরে দলে নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের পরামর্শ দেন। এ পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে কী ধরনের বক্তব্য তুলে ধরবেন তা কালের কণ্ঠ’র পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয় ১৫টি সাংগঠনিক জেলার নেতাদের কাছে। তবে জেলা পর্যায়ের বেশির ভাগ নেতাই তাঁদের পরিচয় প্রকাশ করতে রাজি হননি।

জাতীয় সম্মেলনে সুযোগ হলে সাংগঠনিক বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরবেন বলে জানান রংপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি শফিউর রহমান শফি। তিনি বলেন, ‘নেত্রী চাইলে জাতীয় সম্মেলনে সংগঠন নিয়ে আমাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা তুলে ধরব। আমরা চাই দল গতিশীল হোক। সুষ্ঠুভাবে সকলে সংগঠন করতে পারে এমন একটা দল চাই আমরা। ’

শেখ হাসিনার নতুন নেতৃত্ব খোঁজার আহ্বান প্রসঙ্গে সম্মেলনে কী বক্তব্য থাকবে জানতে চাইলে শফিউর রহমান শফি বলেন, ‘নেত্রী যা-ই বলুন, উনি যত দিন আছেন আমরা ওনাকেই দলের সভাপতি হিসেবে দেখতে চাই। উনি নতুন নেতৃত্বের কথা বলেছেন, মানলাম। আমরা ওনার পাশাপাশি নতুন নেতৃত্ব খুঁজতে পারি। কিন্তু ওনার বিকল্প কেউ হতে পারে না—আমরা এ পরামর্শই দেব। ’

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কক্সবাজারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ব্যাপক উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ হাতে নিয়েছেন। তিনি কক্সবাজারের উন্নয়নের মধ্য দিয়ে এ এলাকার মানুষকে আওয়ামী লীগের প্রতি আকৃষ্ট করেছেন। আমাদের এখানে আওয়ামী লীগের একজন সংসদ সদস্যের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড দলকে কিছুটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলেছিল। কিন্তু আমরা সেখানে বিকল্প নেতৃত্ব তৈরি করেছি। আমাদের বিশ্বাস, নেত্রী উপযুক্ত সময়ে সঠিক ব্যবস্থা নেবেন। ’

আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রস্তাবের কথা জানিয়ে সিরাজুল মোস্তফা বলেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়তে হলে নতুন নেতৃত্ব লাগবেই। কিন্তু নেত্রী (শেখ হাসিনা) ছাড়া আওয়ামী লীগ কল্পনাই করা যায় না। তাই আমাদের প্রস্তাব থাকবে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে উদ্যমী তরুণ নেতৃত্ব সামনে আনা হোক। তবে সভাপতি পদে শেখ হাসিনাকেই থাকতে হবে। ’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা বলেন, ‘জেলার একাধিক সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম রাব্বানী সংগঠনের কোনো নিয়মই মানেন না। তাঁর কারণে শিবগঞ্জ-কানসাট উপজেলায় সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সাংগঠনিক অবস্থা উপস্থাপনের সময় বিষয়টি তুলে ধরা হবে। ’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মঈনউদ্দিন মণ্ডল বলেন, ‘সম্মেলনে সাংগঠনিক রিপোর্ট তুলে ধরার সুযোগ হলে তা আমাদের জেলার সাধারণ সম্পাদক পেশ করবেন। সুতরাং সে বিষয়ে তিনিই ভালো বলতে পারবেন। তবে গোলাম রাব্বানী তো কাউকেই মানে না। কোনো নেতাকর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে না। উল্টো বলে বেড়ায়, আমি তো ভোটে এমপি হইনি। ’

পিরোজপুর জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘জাতীয় সম্মেলনে দলের পক্ষে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। যদি সাধারণ সম্পাদক বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ পান তবে পিরোজপুরে কাদের কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা উঠে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা বলেন, ‘ফরিদপুর জেলায় আওয়ামী লীগে বহুমুখী সমস্যা রয়েছে। জাতীয় সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ পেলেও সব কিছু খুলে বলার বাস্তবতা নেই। তবে আকারে-ইঙ্গিতে যতটা সম্ভব আমাদের সমস্যার কথা বলার চেষ্টা করব। ’

মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতা বলেন, ‘বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পাব কি না জানি না। কী বলব তা এখনো ঠিক করিনি। তবে নেত্রী যদি সংগঠনের অবস্থা জানতে চান তবে যা সত্য তা-ই বলব। মাগুরায় কাদের জন্য দলীয় কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তাও তুলে ধরব। ’

উত্তরবঙ্গে জামায়াতের শক্তিশালী অবস্থান আছে এমন একটি জেলার আওয়ামী লীগের সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে-পরে জামায়াতের ভয়ে আমাদের জেলার প্রায় সব এমপিই ঢাকায় থেকেছেন। আমরা বহু কষ্ট করে ঝুঁকি নিয়ে এলাকায় থেকেছি। দলের কর্মীদের সাহস জুগিয়েছি। কিন্তু ওই সব এমপিই এখন দেখি জামায়াত-বিএনপির সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলেছেন। মাঝেমধ্যে তাঁদের কর্মকাণ্ডে মনে হয় পুরনো আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ওনারা চেনেনই না। সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ হলে এ বিষয়গুলো অবশ্যই নেত্রীর কাছে তুলে ধরব। ’

সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এনামুল কবির ইমন বলেন, ‘সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ হলে আমরা প্রবীণ ও নবীনের সমন্বয়ে সুনামগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করতে বলব। যারা তরুণদের বিভ্রান্ত করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীতে নিয়ে যায় তাদের প্রতিহত করতে পারে এমন নেতাদের নিয়ে জেলা কমিটি গঠন করার পরামর্শ দেব। ’

আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলনে জেলার নেতাদের কথা বলতে দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা। দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তৃণমূলের নেতাদের কথা শুনতে চান। সে কারণেই এবারের সম্মেলন দুই দিনব্যাপী করা হয়েছে। ’

আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মুহম্মদ ফারুক খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনের পরই তৃণমূলের নেতাদের কথা বলার সুযোগ দেওয়া হবে। আমরা তাদের কথা শুনব। তারা নিজ নিজ এলাকার সাংগঠনিক রিপোর্ট দেবে। ’


মন্তব্য