kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলাদেশ-চীন ২৭ চুক্তি ও সমঝোতা

সুফল পেতে চাই সদিচ্ছা ও দক্ষতা

বিশ্লেষকদের মত

আবুল কাশেম ও আরিফুর রহমান   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সুফল পেতে চাই সদিচ্ছা ও দক্ষতা

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ২২ ঘণ্টার ঢাকা সফর উন্নয়নের নতুন পথ দেখাচ্ছে বাংলাদেশকে। বলা হচ্ছে, তাঁর সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।

অবকাঠামো উন্নয়ন থেকে মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধি—নানা খাতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে দেশটির প্রভাবশালী এই নেতার উপস্থিতিতে স্বাক্ষর হয়েছে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক। এর মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে সড়ক, রেল ও সেতু, অন্যদিকে আছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতও। যার আর্থিক মূল্য দুই হাজার ৫০০ কোটি ডলারেরও বেশি। বিশ্লেষকরা বলছেন, এখন দক্ষতার সঙ্গে এসব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি এর গুণগত মান নিশ্চিত করতে পারলে গড়ে উঠবে নতুন এক বাংলাদেশ, যেখানে ব্যবসায়ীদের শিল্প-কারখানা গড়ার জন্য অবকাঠামোর জোগান নিয়ে ভাবতে হবে না, বিদ্যুত্হীন অন্ধকারে জীবন কাটাতে হবে না কোনো পরিবারকে। শ্রমিকের দক্ষতা কারখানায় উত্পাদন বাড়াবে। তাতে শিল্প মালিকের উত্পাদন যেমন বাড়বে, তেমনি বাড়বে শ্রমিক সন্তুষ্টিও। ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্নপূরণে এ প্রকল্পগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে দেশের ইতিহাসে বৃহত্তম এই ঋণ চুক্তির এত এত সুফল কবে নাগাদ দেশবাসীর নাগালে পৌঁছাবে তা নির্ভর করবে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আমলাদের কর্মদক্ষতার ওপর।

চীনের সঙ্গে যেসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে সেগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তার প্রায় সবগুলোই অবকাঠামোকেন্দ্রিক। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যে ২৮টি প্রকল্পে দুই হাজার ২০০ কোটি ডলার অর্থায়ন বিষয়ে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন, সেখানেও অবকাঠামো নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্প বেশি। এর মধ্যে এখনো অনেক প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়নি। অনেক প্রকল্প এখনো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতেও (একনেক) অনুমোদন পায়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকার দীর্ঘদিন ধরেই চীনের দেওয়া ঋণের সুদের হার ও শর্ত শিথিলের অনুরোধ জানিয়ে আসছে। সুদ কমানো ও শর্ত শিথিলে দেশটির কাছ থেকে কোনো স্পষ্ট বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাই এক ধরনের অস্পষ্টতা রয়েই গেল।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকল্পের ঋণ চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক হয়ে গেছে। এখন দরকার আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে চীনের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বজায় রেখে অর্থায়ন নিশ্চিত করে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়া। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক কে এ এস মুরশিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে এখন দরকার বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ। যাতে অগ্রাধিকার হলো সড়ক, রেল ও সেতু। তিনি বলেন, ‘একটা সময় আসবে, যখন গ্রামীণ বৈশিষ্ট্য কমে যাবে আর শহরায়ণ গুরুত্ব পাবে। আগে আমাদের প্রধান সমস্যা ছিল টাকার। এখন আর এটা মূল সমস্যা নয়। চীন অনেক টাকা দিতে যাচ্ছে। আমাদের সামনে প্রধান সমস্যা হলো বাস্তবায়ন। ’ বিআইডিএস মহাপরিচালক বলেন, ‘আমাদের সক্ষমতার মারাত্মক ঘাটতি আছে। একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যে ধরনের দক্ষ কর্মকর্তা থাকা দরকার, তা নেই। ফলে বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে আমরা হিমশিম খাই। সঠিক সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় না। বছরের পর বছর চলে যায়, প্রকল্পের কাজ শেষ হয় না। ফলে ওই প্রকল্প থেকে সাধারণ মানুষ সুফল পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। ’ তিনি বলেন, চীনের বড় বিনিয়োগ কাজে লাগাতে হলে এখন উচিত হবে দ্রুতগতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা। আর দ্রুতগতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে দক্ষ জনবল বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে সমন্বয়হীনতা দূর করার ওপর জোর দেন তিনি।

শি চিনপিংয়ের সফরে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ, ঢাকার পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ছয়টি জাহাজ কেনার ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, যেখানে ১২৫ কোটি ডলার ঋণ সহায়তা দেবে চীন। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণেও দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। আরো ৯টি ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ, সেগুলোতেও চীনের বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন থাকবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা সন্তোষজনক নয়। প্রতিবছরই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ বাড়ছে। কিন্তু বছর শেষে সে টাকা খরচ হয় না। বিশেষ করে বিদেশি অর্থায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে কর্মকর্তাদের আগ্রহ থাকে না। কারণ, এ ধরনের প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের সুযোগ কম। আর সময়মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারায় প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ ফেরত যায়। তা ছাড়া বড় অঙ্কের প্রকল্পের কাজ পাওয়া নিয়ে সরকারের প্রভাবশালীদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিযোগিতা দেখা যায়। এ কারণেও অনেক প্রকল্পে সময়মতো ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয় না। আর ঠিকাদার নিয়োগ হলেও বাস্তবায়নের ধীরগতি প্রকল্প ব্যয় বাড়িয়ে দেয়, জনগণ এর সুফল থেকে বঞ্চিত হয়।

চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে মোট কত টাকার ঋণ চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না সরকারের নীতিনির্ধারকরা। হিসাব-নিকাশ করে তা জানাতে আরো দু-এক দিন সময় লাগবে বলে কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ। তবে এটাই যে বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ঋণ চুক্তি সে বিষয়ে কারো দ্বিমত নেই। এর আগে রাশিয়ার সঙ্গে সবচেয়ে বড় ঋণ চুক্তি করে বাংলাদেশ। রাশিয়ার সঙ্গে এক হাজার ২০০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি সই হয়েছে রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন জাপান সফরে যান, তখন ৬০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিলেছিল। আর গত বছর ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে এসে অবকাঠামো উন্নয়নে ২০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার ঘোষণা দেন। সে ঋণের চুক্তিও সই হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব প্রকল্পে ঋণ চুক্তি সই হয়েছে, তার বেশির ভাগেরই সমীক্ষা হয়নি। ফলে ব্যয় ধরা হয়েছে অনুমাননির্ভর। জমি অধিগ্রহণ ও ঠিকাদার নিয়োগ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়। এসব দূর করার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশের অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতের উন্নয়নে যে বিপুল বিনিয়োগ করা দরকার, তা বহুজাতিক সংস্থার বাইরে কেবল চীনের কাছ থেকেই পাওয়া সম্ভব। চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে সরকার বাংলাদেশের উন্নয়ন সম্ভাবনা দক্ষভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে। ফলে বিপুল অর্থ বিনিয়োগের বিষয়ে দুই দেশ চুক্তি ও সমঝোতা স্বাক্ষর করেছে। তবে এসব তখনই কাজে লাগবে, যখন জনগণ এর সুফল ভোগ করতে পারবে। এ জন্য দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে সরকারকে গুরুত্ব দিতে হবে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ বলেন, চীনের মোট দেশজ উত্পাদন (জিডিপি) পৃথিবীর মোট অর্থনীতির প্রায় ১৬ শতাংশ। দেশটি অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির রিজার্ভ ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। চীন প্রতিবছর বিদেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করে তার ১ শতাংশ বাংলাদেশে আনতে পারলেও তা বিশাল টাকা। যাতে কমপক্ষে চীনের ১ শতাংশ এফডিআই বাংলাদেশে আসে, সেই চেষ্টা করতে হবে। তবে এ বিনিয়োগ কাজে লাগাতে হলে অবশ্যই আমাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম কালের কণ্ঠকে বলেন, বড় বড় প্রকল্প নেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারকে আরো স্বচ্ছতা আনতে হবে। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়; পরে তা আবার সংশোধন করা হয়। প্রকল্পের সঠিক ব্যয় যৌক্তিক ধরা হয় না। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, প্রকল্পটি যখন প্রথম শুরু হয়, তখন এর ব্যয় ছিল দুই হাজার কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত সে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে সাড়ে তিন হাজার কোটিতে উন্নীত হয়েছে। তাই প্রকল্পের শুরুতে সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই করে সঠিক ব্যয় ধরে অনুমোদন দেওয়া উচিত। গোলাম মোয়াজ্জেম আরো বলেন, চীনের সঙ্গে কোনো প্রকল্পে ঋণ চুক্তি করার সময় সুদের হার ও শর্ত নিয়ে দরকষাকষি করা জরুরি।


মন্তব্য