kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাক্ষাৎকার : শেখ হাসিনা

সবার সঙ্গেই সম্পর্ক ভালো রাখতে চাই

► সার্ক সম্মেলন বর্জন পাকিস্তানের আচরণের কারণে
► আইএসের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই বাংলাদেশে
►আশা করি, পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপি ভুল করবে না

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সবার সঙ্গেই সম্পর্ক ভালো রাখতে চাই

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চীনের দিকে বেশি ঝুঁকছে, এমন অভিযোগ ঠিক নয় মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভারতের সঙ্গেও আমাদের সম্পর্ক ভালো এবং অব্যাহতভাবে তা বাড়বে। ’ তিনি আরো বলেছেন, ‘আমাদের নীতিমালা খুব পরিষ্কার।

আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং আমরা তা বজায় রাখতে চাই। ’

ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকায় গতকাল শুক্রবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন। গত মঙ্গলবার বিকেলে গণভবনে এ সাক্ষাৎকার নেন দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার। গতকালই দুই দিনের সরকারি সফরে ঢাকায় এসেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট। ব্রিকস-বিমসটেক সম্মেলনে যোগ দিতে আজ চীনা প্রেসিডেন্ট ও আগামীকাল রবিবার শেখ হাসিনা ভারত সফরে যাচ্ছেন।

সাক্ষাৎকারটিতে চীনের সঙ্গে চুক্তি, ভারত সফর, পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক, সার্ক  সম্মেলন বর্জন প্রসঙ্গ, গণমাধ্যমের স্বাধীনতাসহ বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন প্রধানমন্ত্রী।

বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে চীনের চেয়ে ভারত পিছিয়ে কেন—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আসলে আমাদের দ্বিপক্ষীয় (বাংলাদেশ-ভারত) বাণিজ্য অনেক বেড়েছে; বিশেষ করে ভারত আমাদের শুল্কমুক্ত, কোটামুক্ত সুবিধা (২০০৭-০৮) দেওয়ার পর থেকে এটা হয়েছে। অতীতে আমরা ভারত থেকে খাদ্যশস্য আমদানি করতাম, কিন্তু এখন আমাদের প্রয়োজনমতো খাদ্যশস্য আছে। এটি একটি কারণ হতে পারে বাণিজ্য কমার ক্ষেত্রে। তবে আমরা অনেক অভোগ্য পণ্য, যন্ত্রপাতি ও তুলা এখনো ভারত থেকে আমদানি করছি। আমাদের সম্পর্ক ভালো এবং তা ক্রমাগত বাড়বে। ’

চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, প্রতিরক্ষা অংশীদার। বাংলাদেশ চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগে বড় ভূমিকা পালন করেছে। আঞ্চলিকভাবে বাংলাদেশ চীনের কথিত ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ হয়ে উঠছে বলে ভারতের যে উদ্বেগ রয়েছে তা কি বাস্তবসম্মত নয়—এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যকার ভালো সম্পর্কের কথা বলেছেন। আপনাদের যদি সেটা মনে হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশ চীনের দিকে ঝুঁকছে বলে কি অভিযোগ করতে পারেন? না, আমাদের নীতিমালা খুব পরিষ্কার। আমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে এবং আমরা তা বজায় রাখতে চাই। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি সুসম্পর্কের জন্য কানেকটিভিটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বিবিআইএন নেটওয়ার্ক স্থাপন করেছি এবং এর ফলে ভুটান, ভারত ও নেপালের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো হয়েছে। চীন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গেও আমরা বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডর স্থাপন করেছি, যাতে আমরা সবাই একসঙ্গে নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য বাড়াতে পারি। এর ফলে আমাদের জনগণের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো হবে, জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে। এতে আমাদের এ অঞ্চলে সবচেয়ে লাভবান হবে কে? ভারত। বাংলাদেশের বাজারে ভারতই বেশি সুবিধা নিতে পারে। এটা আপনাদের অনুধাবন করা উচিত। ’

বাংলাদেশ সার্কের প্রতিষ্ঠাতা দেশ হয়েও এ বছর পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বর্জনকারী চার দেশের একটি বাংলাদেশ, এর মানে কি সার্কের সমাপ্তি ঘটছে—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘না। সার্ক বর্জনের ক্ষেত্রে আমরা যে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়েছি, তাতে বলেছি সার্ক অঞ্চলে এখন যে পরিবেশ-পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তা এ সম্মেলনের উপযোগী নয়। আমাদের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে পাকিস্তান অসন্তোষ প্রকাশ করেছে এবং এ ইস্যুটি তাদের পার্লামেন্টে উত্থাপিত হয়েছে। অগ্রহণযোগ্য মন্তব্যের মধ্য দিয়ে তারা আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেছে। এতে আমরা মর্মাহত হয়েছি। আমরা আমাদের দেশের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করছি, এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এতে তাদের নাক গলানোর সুযোগ নেই। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাকিস্তানের এ ধরনের আচরণের কারণে দেশটির সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য আমার ওপর চাপ রয়েছে। কিন্তু আমি বলেছি, সম্পর্ক থাকবে এবং আমাদেরকে সমস্যাগুলো সমাধান করতে হবে। মূল কথা হলো, আমরা পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে জয়ী হয়েছি এবং তারা পরাজিত শক্তি। আমরা যুদ্ধে জিতেছি এবং তাদের কাছ থেকে দেশকে মুক্ত করেছি। তারা যে এটা ভালোভাবে নেবে না, তা প্রত্যাশিত ছিল। ’

পাকিস্তান থেকে উদ্ভূত সন্ত্রাসবাদের কারণে ভারত, ভুটান, আফগানিস্তান ও বাংলাদেশের একসঙ্গে সার্ক সম্মেলন বর্জন কী পাকিস্তানকে একঘরে করার প্রচেষ্টা নয়—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘পাকিস্তানের পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে আমরা সার্ক সম্মেলন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সন্ত্রাসবাদের কারণে সেখানকার সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি ভুগছে। সেই সন্ত্রাসবাদ সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে। এ কারণে আমরা অনেকেই পাকিস্তানের ওপর হতাশ। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যেও দ্বিপক্ষীয় সমস্যা রয়েছে, সেসব বিষয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না। ভারত উরির হামলার কারণে সার্ক বর্জন করেছে; কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কারণটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ’

সন্ত্রাসীদের নিধন করতে নিয়ন্ত্রণরেখা পেরিয়ে পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে অভিযান চালানোর ব্যাপারে ভারতের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন কি—প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি মনে করি, দুই দেশেরই নিয়ন্ত্রণরেখা (এলওসি)-এর অলঙ্ঘনীয়তা মেনে চলা উচিত এবং এর মধ্য দিয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। ’

একই ধরনের অভিযান বাংলাদেশে কি সমর্থন করবেন—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এ প্রশ্নটি আপনার দেশের (ভারত) সরকার ও প্রধানমন্ত্রীকে করা উচিত বলে মনে করি। আমি বিশ্বাস করি, সীমান্ত ও এর নিয়ন্ত্রণরেখা পুরোপুরি মেনে চলা উচিত। ’

বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে সন্ত্রাসবিরোধী পারস্পরিক সহযোগিতা বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে—এ প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেখুন, আমি বিশ্বাস করি, সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশে ঘাঁটি গাড়তে পারবে না। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত কিংবা মিয়ানমার, ২০০৯ সাল থেকে আমরা যে পদক্ষেপ নিয়েছি, তার ফলও পাচ্ছি। আমাদের সীমান্ত এলাকায় আগে প্রায় প্রতিদিনই সহিংসতা, বোমাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চলত, আমরা তা নিয়ন্ত্রণে এনেছি। আমরা কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে অন্য দেশে হামলা চালানোর জন্য আমাদের মাটি ব্যবহার করতে দেব না। বাংলাদেশ আর সন্ত্রাসবাদ রপ্তানিকারক দেশ নয় কিংবা অস্ত্র পাচারের জন্য নিরাপদ রুটও নয়। ’

গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় সন্ত্রাসী হামলার পর বাংলাদেশের সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি—এ প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সন্ত্রাসবাদ বর্তমানে একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এর বিরুদ্ধে আমি বেশ কিছু অন্যরকম পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছি। প্রথমেই স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের বিষয়টিতে সচেতন হতে বলছি। এরপর মা-বাবাদের বলছি, সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে চলাফেরা করে সে বিষয়ে নজর রাখুন। মসজিদের ইমাম ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বলেছি, ইসলাম যে সহিংসতা সমর্থন করে না, তা নিয়ে প্রচার চালাতে। উগ্রবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের সন্তানদের জঙ্গি হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করতে পারব। ’

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুম করার মধ্য দিয়ে সন্ত্রাসবাদবিরোধী যুদ্ধ চালানোর কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমর্থন হারাচ্ছে বলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে—এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক যে মানবাধিকার সংগঠনগুলো ভুক্তভোগীদের চেয়ে অপরাধীদের অধিকারের পক্ষেই বেশি সোচ্চার। যুক্তরাষ্ট্রে কী হচ্ছে? যখন সে দেশের স্কুল কিংবা অন্য কোথাও হামলা হয় তখন সেখানকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কী করে? তারা কি হামলাকারীদের হত্যা করে জিম্মিদের উদ্ধার করে না? নিজেদের ওপর হামলা করলে আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কি হামলাকারীদের হত্যা করবে না?’

হলি আর্টিজানে হামলায় আইএসের দায় স্বীকার বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি প্রমাণ করে কি না—এ প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, ‘হামলাকারীদের কেউ কেউ আইএসের অনুসারী হতে পারে। তবে বাংলাদেশে আইএসের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি নেই। বাংলাদেশে আইএসের ঘাঁটি আছে—এমন প্রমাণ কারো কাছে থাকলে তাদের উচিত আমাদের কাছে সেই প্রমাণ তুলে দেওয়া। আমরা হামলাকারীদের চিহ্নিত করেছি। তারা স্থানীয়। ’

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি যখন ক্ষমতায় এসেছি তখন আমাদের একটিমাত্র টেলিভিশন চ্যানেল ছিল, এখন ২৩টি আছে। কারা এগুলো চালু করেছে? কারা শত শত সংবাদপত্রকে অনুমোদন দিয়েছে? যদি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নাই থাকত, তাহলে স্বাধীনতা যে নেই এ কথাটিই বা তারা লেখার সুযোগ পায় কিভাবে?’

সাক্ষাৎকারে জাতীয় নির্বাচনের প্রসঙ্গও উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে লড়াই করেছেন। অথচ আপনি এখন এমন একটি সংসদের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যেখানে বিরোধী দল নেই। আগামী নির্বাচনে কি বিরোধী দল হিসেবে বিএনপিকে আনতে পারবেন?

জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি নির্বাচন বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আমি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ফোন করি। কিন্তু তিনি যতটা পারা যায় রূঢ় আচরণ করেছেন আমার সঙ্গে। এমনকি তাঁর ছেলের মৃত্যুর পর সহানুভূতি জানানোর জন্য তাঁর বাড়ি গিয়েছিলাম। অথচ তিনি দরজা খোলেননি। মানুষ হিসেবে আমি আর কিইবা করতে পারি? নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো ছিল বিএনপির ভুল সিদ্ধান্ত। আশা করি, পরবর্তী নির্বাচনে তিনি সে ভুল করবেন না। তবে দুষ্কর্ম করে তিনি যদি গণতন্ত্রকে ব্যাহত করার চেষ্টা চালান, তা কিছুতেই মেনে নেব না। ’


মন্তব্য