kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশ্লেষকদের অভিমত

একসঙ্গে এগোবে দুই দেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



একসঙ্গে এগোবে দুই দেশ

বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে বিবেচিত দেশ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সত্যিকার অর্থেই নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে বলে মনে করছেন দেশের সাবেক কূটনীতিক, নেতৃস্থানীয় ব্যবসায়ী ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা। তাঁরা বলছেন, বাংলাদেশের মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে চীনের বিনিয়োগ নতুন অনুপ্রেরণা জোগাবে।

দুই দেশের মধ্যে অমীমাংসিত কোনো সমস্যা না থাকায় এই সম্পর্ক যেমন মসৃণ, তেমনি কৌশলের দিক থেকেও কার্যকর। বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কোন্নয়নে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে কোনো টান পড়বে না। কারণ সম্পর্কে ভারসাম্য রেখে এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে বাংলাদেশ।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সফরের সময় দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে ‘ঘনিষ্ঠ সমন্বিত সহযোগিতার’ সম্পর্ক ‘স্ট্র্যাটেজিক রিলেশনশিপে’ (সুদূরপ্রসারী সামগ্রিক লক্ষ্যাভিমুখী সম্পর্ক) প্রবেশ করাতে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও চীন। গতকাল শুক্রবার দুই পক্ষের মধ্যে সই হয়েছে ২৭টি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক। এসবের মধ্যে আছে চীনের ১৫টি কম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের ১৩.৬ বিলিয়ন বা ১৩৬০ কোটি ডলারের চুক্তি। চীনের ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগ বাস্তবায়নে একসঙ্গে এগোতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। এর ফলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো, শিল্প, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোতে চীনের সহযোগিতা জোরদার হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ফারুক আহমেদ চৌধুরী গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, চীনের প্রেসিডেন্টের ঢাকা সফর বর্তমান সরকারের একটি যুগান্তকারী সাফল্য। এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক নতুন একটি উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সফল উল্লেখ করে সাবেক এই কূটনীতিক বলেন, শেখ হাসিনার দায়িত্ব পালনকালেই বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্কোন্নয়নের বিষয়টি ফলপ্রসূ হয়েছে। চীন বাংলাদেশের বিশেষ বন্ধু হিসেবে পরিচিত হলো।

বাংলাদেশে চীনের প্রেসিডেন্টের এই সফর গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন সাবেক পররাষ্ট্রসচিব সমশের মবিন চৌধুরী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৩০ বছর পর কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফরের সময়টি বাংলাদেশ ও চীন উভয় দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। উভয় দেশই মনে করে তারা বিশ্বস্ত বন্ধু। চীনা প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশ সম্পর্কে খুবই আশাবাদী। চীনের সঙ্গে আমাদের অমীমাংসিত বিষয় নেই। ভবিষ্যতে হয়তো নদীর পানিবণ্টন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে সমস্যা হতে পারে। বাংলাদেশে বয়ে চলা ব্রহ্মপুত্র নদের উৎসস্থল চীন। ’ চীনের প্রেসিডেন্টও বলেছেন, ‘আমরা একই নদীর পানি পান করি। নদীবেসিন ব্যবস্থাপনা নিয়ে উভয় দেশ ভবিয্যতে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। ’

সমশের মবিন চৌধুরী ১৯৮৬ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত চীনে বাংলাদেশ মিশনে উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর মতে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বহুমুখী সম্পর্ক বিকশিত হচ্ছিল, সম্পর্ক সুদৃঢ় হচ্ছিল। এ অবস্থায় চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকালে ঋণ ও কাঠামো চুক্তি এবং সমঝোতা সই হওয়ায় অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন এগিয়ে যাবে।

যুক্তরাষ্ট্র, শ্রীলঙ্কা, জার্মানি, ভিয়েতনামসহ বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী সমশের মবিন বলেন, চীন সরকার স্বল্প সুদে ঋণ দান করে। অনেক ক্ষেত্রে সেটি পরে অনুদান হয়ে যায়। তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ পররাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রেখে এগোচ্ছে। ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রসচিব বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। আমি বলব, চীনা প্রেসিডেন্টের সফর এ সময়ে খুবই গুরুত্ব বহন করছে। ’

চীনে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত আশফাকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চীনা প্রেসিডেন্টের এ সফর গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক। চীন থেকে আমরা নেব আর চীন আমাদের কাছ থেকে নেবে। এতে উভয়েই একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠব। চীন বাংলাদেশের স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেন্ড। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে—এটা আশাব্যঞ্জক। এই সফরের মধ্য দিয়ে আমরা বেশ কিছু পাওয়ার আশা করছি। তবে খেয়াল রাখতে হবে প্রকল্পের খরচ যেন বেশি না হয়। কারণ চীনের কাছ থেকে ধার এনে সুদ পরিশোধ করতে হবে আমাদের। সঠিক মূল্যে সঠিক পণ্য যেন আমরা আনতে পারি তার দক্ষতা দেখাতে হবে আমাদের। ’

বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে চীনা ১৫টি প্রতিষ্ঠানের চুক্তির বিষয়টি উল্লেখ করে এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ বলেন, ‘বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের দরজা খুলে গেছে। শি চিনপিং ছয় বছর আগে বাংলাদেশে এসেছিলেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও চীন সফর করেছেন গত বছর। তাঁদের মধ্যে দুই দেশের উন্নয়ন সামনে রেখে বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়েছে। এবার চীনা প্রেসিডেন্টের সফরে ১৫০ জন চীনা বিনিয়োগকারীও এসেছেন। এই সফরে সম্পাদিত চুক্তির মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীনা বিনিয়োগ বাড়বে। ১৫টি চীনা কম্পানির সঙ্গে ব্যবসায়ীদের সম্পাদিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক অনুসারেই ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো। কয়লানির্ভর বিদ্যুৎকেন্দ্রও হবে চীনা সহযোগিতায়। তার বাইরে জি-টু-জি ভিত্তিতে অন্যান্য চুক্তি হয়েছে। আমরা উভয় দেশের সম্পর্ক উন্নয়ন ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন হচ্ছে দেখে খুশি। ’ 

বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান মৃধা জানান, চীনা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সফরসঙ্গীদের মধ্যে তিনি অনাবিল আন্তরিকতা প্রত্যক্ষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘চীনা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সফরসঙ্গীদের শারীরিক ভাষা ছিল অনাবিল। আমি তাঁদের ভাষা পাঠ করে তা বুঝতে পেরেছি। বন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেলে শুধু চুক্তি করলেই হয় না, আন্তরিকতাও লাগে। চীনের এ আন্তরিকতা আছে। সন্ত্রাস দমনে দুই দেশ একসঙ্গে কাজ করবে। দারিদ্র্য বিমোচনেও চীনের মতো বড় দেশ আমাদের পাশে থাকছে। এটা বন্ধুর জন্য বন্ধুর আবেগের বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। বিনিয়োগের অঙ্ক দেখলেই হবে না, দেখতে হবে আন্তরিকতার  বিষয়টিও। ’ তাঁর মতে, ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর জন্য যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, লাভজনক খাতে বিনিয়োগের ফলেও এগিয়ে যাওয়া যায় উন্নয়নের সড়কে। চীনা প্রেসিডেন্টের সফরে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন যেমন হয়েছে তেমনি বিনিয়োগের সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়েছে। পায়রা বন্দরে বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে। ছোট শহরগুলোর উন্নয়নের জন্য প্রকল্পও বাস্তবায়ন করা হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. দেলোয়ার হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর ফলপ্রসূ হয়েছে। এই সফর ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এই সফরের মাধ্যমে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নতুন পর্যায়ে উন্নীত হলো। বিভিন্ন ধরনের ২৭টি চুক্তি হয়েছে। মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের যে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে তা পূরণে সহায়ক হবে এসব চুক্তি। মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে রপ্তানি বাড়াতে হবে। তার জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। ভারতের সঙ্গে ট্রানজিট নিয়ে আলোচনার সময় দেখা গেছে, আমাদের সড়ক ও রেল অবকাঠামো দুর্বল। এগুলোর উন্নয়ন করতে হবে। পদ্মা সেততুে রেল সংযোগের মতো বড় প্রকল্পে চীনের মতো বড় দেশই তো বিনিয়োগ করতে পারবে। ’ তিনি আরো বলেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্কটা অর্থনৈতিক। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটা স্ট্র্যাটেজিক ও রাজনৈতিক। ভারতকে বুঝতে হবে চীনের বিনিয়োগে বাংলাদেশে উন্নয়ন হলে তার সুফল ভারতও ভোগ করতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রবিবার ভারতে যাচ্ছেন। কাজেই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ভারত বাংলাদেশকে ভুল বুঝবে না। চীনা প্রেসিডেন্টের সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও সম্পর্ক কয়েক ধাপ এগিয়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


মন্তব্য