kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চীনা ১৩ কম্পানির ১৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বাণিজ্য চুক্তি

আবুল কাশেম ও এম সায়েম টিপু   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



চীনা ১৩ কম্পানির ১৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বাণিজ্য চুক্তি

১৪০ কোটি মানুষের চাহিদা পূরণ। বিপুল অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ।

বিশ্বের বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। প্রতিবছর দুই লাখ ১৪ হাজার কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বিদেশে। তাই বলে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিকারক দেশ চীন যে সব কিছু নিজেরাই তৈরি করে তা নয়। অন্য দেশ থেকেও কিনে থাকে অনেক কিছু। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ থেকে চীন নিজের চাহিদা পূরণে আমদানি করে ১৫ হাজার ৮০০ কোটি ডলারের পণ্য। সেখানে ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব থেকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ৮৪ কোটি ডলার। অথচ চীন থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদানি করে। গত বছর চীন থেকে বাংলাদেশের আমদানির পরিমাণ ছিল এক হাজার ৩৯০ কোটি ডলার। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এক লাখ কোটি টাকারও বেশি।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০০৩ সাল থেকে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বিভিন্ন সময় চীনের কাছ থেকে নানা পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছে। এখন সব মিলিয়ে পাঁচ হাজার ৫৪ বাংলাদেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে চীন। তা সত্ত্বেও চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়ছে না। মূলত প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাক ও চামড়াজাত পণ্য চীনেরও প্রধান রপ্তানি পণ্য। ফলে এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রপ্তানি বাড়াতে হলে পণ্যের বহুমুখীকরণের বিকল্প নেই।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের ঢাকা সফর উপলক্ষে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে তৎপর হয়ে উঠেছেন। এরই মধ্যে চীনের ব্যবসায়ী ও বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে এসেছে। গতকাল ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে ‘বাংলাদেশ-চায়না বিজনেস টক অ্যান্ড সাইনিং সেরিমনি’ অনুষ্ঠানে দুই দেশের ব্যবসায়ীরা ১৮ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। এই চুক্তিতে উভয় দেশের ২০টি প্রতিষ্ঠান স্বাক্ষর করে। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের ১৩টি এবং চীনের সাতটি। চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশ থেকে পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া, হিমায়িত মাছ এবং সামুদ্রিক খাবার আমদানি করবে।   চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য উন্নয়ন ব্যুরো এবং বাংলাদেশের রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও এফবিসিসিআই। এ ছাড়া আজ শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেশটির শীর্ষ ১২০টি কম্পানির উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারাও বাংলাদেশে আসছেন।

গতকালের চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে ঢাকায় চীনা দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর লি গুয়াংইয়াম বলেন, চীন সরকার নিজ দেশের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও কারখানা প্রতিষ্ঠায় উৎসাহ দিচ্ছে। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়লে তা বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে সহায়ক হবে।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ সম্ভাবনা তুলে ধরে লি গুয়াংইয়াম বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৬ কোটি মানুষের বসবাস। ভবিষ্যতে বাংলাদেশে শ্রমনির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ বাড়বে। ৩০ বছর আগে চীন যে অবস্থায় ছিল, এখন বাংলাদেশ সেই অবস্থায় রয়েছে। আমরা একে বলি পপুলেশন প্রফিট (জনসংখ্যাগত লাভ)। বাংলাদেশের কম মজুরির বিপুল শ্রমিক কাজে লাগানো গেলে চীনা কম্পানিগুলোও লাভবান হবে। ’

চীনের বাণিজ্য উন্নয়ন ব্যুরোর উপমহাপরিচালক লি চ্যাংইউ বলেন, চীনের বাজার ধীরে ধীরে খুলে দেওয়া হচ্ছে। চীনে পণ্য আমদানিতে শুল্ক হার কমানো হচ্ছে। ২০০২ সালে চীনে গড় আমদানি শুল্ক ছিল ১৫.৩ শতাংশ। এখন তা ৯.৮ শতাংশ, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ২০২১ সালে মধ্যম আয়ের দেশ হতে চায়। আমরা এ দেশের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ব্যবসা বাড়াতে চাই। ’

অনুষ্ঠানে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান মাফরুহা সুলতানা বলেন, চীন বাংলাদেশকে পাঁচ হাজার ৫৪টি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিলেও বাংলাদেশের রপ্তানিযোগ্য পণ্যের সীমাবদ্ধতার কারণে এই বাণিজ্য বাড়াতে পারছে না। বর্তমানে কাঁচা পাট, চামড়া ও হিমায়িত পণ্য যায় বাংলাদেশ থেকে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, চীন প্রায় পাঁচ হাজার পণ্যে বাংলাদেশকে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। বাংলাদেশের রপ্তানি গত তিন মাসে ২৫ শতাংশ হারে বাড়ছে। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যেই দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ দুই বিলিয়ন ডলারে পৌঁছবে।

কেবল আমদানি-রপ্তানিতেই চীন বিশ্বের বৃহত্তম দেশ নয়। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে বিনিয়োগ করে দেশটি। ২০১৫ সালে চীন বিদেশে বিনিয়োগ করেছে ১৮৮ বিলিয়ন ডলার। তবে তাদের এই বিপুল বিনিয়োগের মধ্য থেকে তেমন ছিটেফোঁটা আসেনি বাংলাদেশে। বেসরকারি খাতের এই বিনিয়োগের বাইরে চীন সরকার প্রতিবছরই আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ঋণ সহায়তা (ওডিএ) দিচ্ছে। ২০১৩ সালে চীন সরকারের দেওয়া ওডিএর পরিমাণ ছিল সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশেও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে চীনাদের বিনিয়োগ রয়েছে।

এদিকে শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় চীনের শিল্প মালিকরা শ্রমঘন শিল্প থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করছেন। যেসব দেশে শ্রমিকের মজুরি কম, ওই সব দেশে চীনের শিল্প মালিকরা কারখানা স্থানান্তর করছেন। বাংলাদেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলগুলোতে (ইপিজেড) চীনাদের কিছু বিনিয়োগ থাকলেও তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার চেয়ে অনেক কম বলে মনে করছেন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। তাঁরা বলছেন, চীনাদের বেসরকারি বিনিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও তা খুব বেশি কাজে লাগছে না। কারণ চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা নেই, গ্যাস পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণে সরকার চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বৃহৎ একটি শিল্পপার্ক তৈরি করছে। ওই শিল্পপার্কে শুধু চীনাদেরই বিনিয়োগ করার সুযোগ দেওয়া হবে।

দেশের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মাতলুব আহমাদ বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য বৈষম্যের পেছনে একটি বড় কারণ শুল্ক বাধা। এই বাধা দূর করতে চীনের কাছ থেকে সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায় করতে হবে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডাব্লিউটিও) নীতি অনুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ চীনে সব পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ার দাবিদার। এটি হলেই দেশটির সঙ্গে বাণিজ্যিক ঘাটতি কমবে।

বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, চীন থেকে বাংলাদেশ শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি করে। তাই দেশটি থেকে আমদানি কমানোর সুযোগ নেই। তবে চীনে রপ্তানি বাড়াতে আরো কিছু উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এর পাশাপাশি চীনে যেহেতু মজুরি অনেক বেশি, তাই চীনের বেসরকারি খাতের ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, গাড়ি নির্মাণ, মোবাইল ফোনসেটসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে চীনা কম্পানিকে এটা নিশ্চিত করতে হবে যে তারা বিনিয়োগের জন্য প্রয়োজন অনুযায়ী জমি ও গ্যাস সংযোগ পাবে।

এফবিসিসিআইয়ের সিনিয়র সহসভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে রপ্তানি পণ্যে বহুমুখীকরণ করতে হবে। এ জন্য আমাদের চামড়াজাত পণ্যে আরো বেশি কমপ্লায়েন্স হতে হবে। এ ছাড়া জাহাজ নির্মাণ ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে রপ্তানি বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে। ’

ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি বেনজির আহমেদ বলেন, ‘চীনের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের শিল্প খাতে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ লাভবান হবে। এ জন্য শ্রমঘন শিল্পের দিকে আমাদের জোর দিতে হবে। কারণ চীনের শ্রমিকদের মজুরি বেশি হওয়ায় তারা উচ্চমূল্য সংযোজনকারী পণ্যের দিকে ঝুঁকছে। তাই তাদের যেসব শিল্প-কারখানা কম দামি পণ্য উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছে, সেসব কারখানা যাতে বাংলাদেশে স্থানান্তর করা হয়, সে জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদের একযোগে কাজ করতে হবে। এটি হলে বাংলাদেশের পাশাপাশি চীনও লাভবান হবে। কারণ বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানির ক্ষেত্রে চীনা কম্পানিগুলো শুল্কমুক্ত সুবিধা পাবে। ’

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) ভাইস চেয়ারম্যান সাদিক আহমেদ বলেন, চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) পৃথিবীর মোট অর্থনীতির প্রায় ১৬ শতাংশ। চীন অর্থনৈতিক দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রকেও ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির রিজার্ভ ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। চীন শুধু রপ্তানিই করে না, আমদানির ক্ষেত্রেও চীন বৃহৎ দেশ।

তিনি বলেন, ‘চীন প্রতিবছর বিদেশে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করে তার ১ শতাংশ বাংলাদেশে আনতে পারলে বিশাল টাকা। যাতে কমপক্ষে চীনের ১ শতাংশ এফডিআই বাংলাদেশে আসে, সেই চেষ্টা করতে হবে। তবে চীনের বিনিয়োগ আনতে আমাদের অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে হবে। অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ ও অবকাঠামোয় জোর দিতে হবে। ’

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম  মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বিশ্ব অর্থনীতির প্রধান অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের ক্ষেত্রে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ‘টেস্ট কেস’ হবে। চীন থেকে আমদানি বহুমুখী হচ্ছে। তবে আমাদের রপ্তানি বহুমুখী হচ্ছে না। চীন আমাদের বাজার সুবিধা দিলেও তা কাজে লাগাতে পারছি না। চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশে বাড়ছে, এটি ইতিবাচক দিক। তবে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগের ৯০ শতাংশই হচ্ছে বস্ত্র খাতে। ’


মন্তব্য