kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

সাতে সাত হলো না

নোমান মোহাম্মদ, চট্টগ্রাম থেকে   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সাতে সাত হলো না

রূপকথার এক টাট্টুঘোড়ায় সওয়ার হয়েছিল বাংলাদেশের আশা। ওখানেই সমর্পিত ১৬ কোটি ক্রিকেটপ্রাণের ভালোবাসা।

একের পর এক রাজ্য জয় করে এগিয়ে চলে সে। অপ্রতিরোধ্য গতিতে। অজেয় অহংকারে। কিন্তু সব গল্পেরই তো শেষ আছে, সব যাত্রার যেমন রয়েছে গন্তব্য। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চট্টগ্রামের তৃতীয় ওয়ানডে হেরে বাংলাদেশের ক্রিকেট-রূপকথার টাট্টুঘোড়া তাই পথচলা শেষে থমকে দাঁড়ায় আপাতত।

টানা ছয়টি ওয়ানডে সিরিজ জয়ের পর পরাজয়ের সঙ্গে ফের পরিচয় হয় লাল-সবুজের ক্রিকেটযোদ্ধাদের।

অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিল না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২৭৭ রানের পুঁজি জমা করার পর জয় নিয়ে সংশয় ছিল সামান্য। এই জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় ইনিংসে ২২৫ রানের বেশি তাড়া করে জেতার ইতিহাস নেই কোনো দলের। বাংলাদেশের রসদ সেখানে আরো ৫২ রান বেশি। শুধু তা-ই নয়। অতিথি স্পিনাররা যেভাবে উইকেট থেকে টার্ন পান প্রথমার্ধে, তাতে স্বাগতিকদের জয় মনে হয় সময়ের ব্যাপার। কিন্তু সেই সময়টা কিভাবেই না বিশ্বাসঘাতকতা করে!

পঞ্জিকা বলছে, এখন শরৎকাল। কিন্তু চট্টগ্রামে বুধবারের সন্ধ্যা দেখে সেটি বোঝার উপায় নেই। ধোঁয়া ধোঁয়া কুয়াশায় ভর করে টুপটাপ শিশির পড়ে যায় নিরন্তর। বল ভিজে যায়। ভিজিয়ে দেয় বাংলাদেশের আশার আগুনও। শরতের শিশিরে স্পিনাররা যে বল গ্রিপ করতে পারেন না! যে সাকিব আল হাসান অধিনায়কের ব্রহ্মাস্ত্র, তাঁকে দিয়ে ১০ ওভারের বোলিং কোটাই শেষ করানোর উপায় থাকে না। মাশরাফি বিন মর্তুজার দলও খুঁজে পায় না জয়ের উপায়। চার উইকেটে ম্যাচটি হেরে সিরিজ হেরে যায় ১-২ ব্যবধানে।

২০১৪ সালে মাশরাফি অধিনায়ক হওয়ার পর যে আশ্চর্য সাফল্য-সাগরে ভাসছিল বাংলাদেশ, অবশেষে তাতে ভাটির টান। জিম্বাবুয়ে, পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে, আফগানিস্তানের ধারাবাহিকতায় বধ করা হয় না ইংরেজ-সিংহকে। আঁকা হয় না সাফল্য সপ্তকের তিলক।

এই ম্যাচে শিশির যদি হয় প্রকৃতির নির্মমতার নিদর্শন, এর উদারতার উদাহরণও ভুলে গেলে চলবে না। কে ভেবেছিলেন, তৃতীয় ওয়ানডে সময়মতো মাঠে গড়াবে! সামান্যতম বাগড়া ছাড়া পুরো ম্যাচ হয়ে যাবে নির্বিঘ্নে! আগের তিন দিনের বৃষ্টিতে চুপচুপে ভেজা চট্টগ্রামে বসে অমনটা কল্পনাও করা যায়নি। এমনকি ম্যাচের দিন সকাল থেকেও আকাশজোড়া মেঘ। কিন্তু ক্লান্ত হয়েই কিনা তা আর অঝোরে ঝরে পড়ে না। আর স্টেডিয়ামের দুর্দান্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় খেলা শুরু হয়ে যায় সময়মতো। আর শুরুতে মাশরাফির ওই টস হারা যে শেষ পর্যন্ত ম্যাচ হারা হয়ে যাবে—তখন তা কল্পনা করা যায়নি।

আগে ব্যাটিং করা বাংলাদেশের ইনিংসে বরং ছিল কল্পনার নানা রং। সেখানে আনন্দের পোঁচ যেমন রয়েছে, তেমনি আক্ষেপের স্ট্রোকও। ইমরুল কায়েস-তামিম ইকবালের আশ্বস্ত করা ওপেনিংয়ে বড় রানের ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। এরপর উইকেট ছুড়ে আসার দোষে দুষ্ট দুজনই। প্রথমে ইমরুলের (৪৬) বিদায়ে ভাঙে ৮০ রানের জুটি। এরপর তামিম (৪৫) প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে পাঁচ হাজার রানের মাইলফলক স্পর্শের ম্যাচটি স্মরণীয় করে রাখতে ব্যর্থ। কাভারে সহজ ক্যাচ তুলে দেন তিনি। ছক্কার মারার ঠিক পরপরই আরেকটি বাজে বলে নিজের উইকেট উপহার দিয়ে আসেন মাহমুদ উল্লাহ (৬)। বিনা উইকেটে ৮০ থেকে হঠাৎই ৩ উইকেটে ১২২ রান বাংলাদেশের।

এই মিনি-ধস ঠেকে সাব্বির রহমান-মুশফিকুর রহিমের জুটিতে। কিন্তু ব্যাটিং অর্ডারের আগের দুজনের মতো তিনে নামা সাব্বিরও (৪৯) আউট হন চল্লিশের ঘরে। টপাটপ সাকিব আল হাসান (৪) ও নাসির হোসেন (৪) ফিরে গেলে ফিরে ফিরে আসে গত কয়েক ম্যাচের শেষ দিকের হুড়মুড়িয়ে পড়ার স্মৃতি। কিন্তু মুশফিক এবার তা হতে দেন না। অনেক দিন ধরেই তো তাঁর কাছে বড় এক ইনিংস প্রাপ্য দলের। পরশু ম্যাচের মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়ে সে পাওনা মেটান তিনি। খেলেন এ বছরে নিজের প্রথম পঞ্চাশ পেরোনো ইনিংস। চল্লিশের ঘরে একটি সুযোগ দেন যদিও। তাঁর ৬২ বলে অপরাজিত ৬৭ রানের ইনিংসটি বাংলাদেশকে জয়ের বাতিঘর দেখায় দারুণভাবে। সপ্তম উইকেটে তরুণ মোসাদ্দেক হোসেনের (৩৯ বলে অপরাজিত ৩৮) সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন ৮৫ রানের জুটিতে স্বাগতিকরা যে পেয়ে যায় ২৭৭ রানের রসদ!

এই মাঠের পরিসংখ্যান, মিরপুরে মাত্র গত ম্যাচেই ২৩৮ করে জেতার রেকর্ড অনুপ্রেরণার জ্বালানি জোগায় তাই বাংলাদেশ ড্রেসিংরুমে। কিন্তু ফিল্ডিংয়ে নামতেই শিশিরে সর্বনাশের ঘণ্টা শুনতে পায় দল। সাকিবকে দেখায় তাই বড্ড সাদামাটা। ইংল্যান্ডের ওপেনিং জুটিতে উঠে যায় ৬৩ রান। জেমস ভিনসকে (৩২) আউট করে নাসির হোসেন ব্রেক থ্রু দিলেও চাপটা ধরে রাখা যায় না। স্যাম বিলিংস (৬২), বেন ডাকেটরা (৬৩) ম্যাচ থেকে একটু একটু করে ছিটকে ফেলেন বাংলাদেশকে।

পরের দিকে জোড়ায় জোড়ায় শিকার করে শফিউল ইসলাম ও মাশরাফি আবার খানিকটা উসকে দেন আশার সলতে। বিশেষত অধিনায়ক টানা দুই ওভারে জস বাটলার ও মঈন আলীকে ফেরানোর পর। তখনো ৪৫ বলে ৪২ রান দরকার ইংল্যান্ডের; হাতে চার উইকেট। যখন প্রয়োজন ২১ বলে ২১ রান, ওই সময় স্লিপে ক্রিস ওকসের ক্যাচ ফেলে দেন ইমরুল। সম্ভাবনার প্রদীপ নিভিয়ে দেওয়ার শেষ ফুৎকার সেটি।

বাংলাদেশ তাই পারে না টানা সপ্তম ওয়ানডে সিরিজ জিততে। আশ্চর্য এক জয়যাত্রা যায় থেমে। কে জানে, পরাজয়ে এই খানিক ‘দম নিয়েই’ হয়তো আরো অবাক কোনো রূপকথামাখা পথচলা শুরু করবেন এ দেশের ক্রিকেটবীররা!


মন্তব্য