kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সাহিত্যের নোবেল বব ডিলানের

সাব্বির রহমান খান সুইডেন থেকে   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সাহিত্যের নোবেল বব ডিলানের

আমেরিকার ‘সংগীত ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক মূর্ছনা সৃষ্টি’র জন্য এ বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন মার্কিন গায়ক ও গীতিকার বব ডিলান। এই মহান শিল্পী একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পক্ষে নিউ ইয়র্কে ঐতিহাসিক ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’-এ গান গেয়েছিলেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার স্টকহোমে সাহিত্যে ১১৩তম নোবেল বিজয়ী হিসেবে বব ডিলানের নাম ঘোষণা করেন দ্য রয়্যাল সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব সারা দানিউস। সাহিত্যের নোবেল ‘বইয়ের মলাটে’ বন্দি, এই প্রথাগত ধারণা থেকে নোবেল কমিটি প্রথমবারের মতো বেরিয়ে এলো বব ডিলানকে পুরস্কৃত করার মধ্য দিয়ে। প্রচলিত ধারণায় সাহিত্যিক বলতে যা বোঝায়, তিনি তা নন। নোবেলের শত বছরের ইতিহাসে তিনি এ পুরস্কারজয়ী প্রথম সংগীতশিল্পী ও গীতিকার।

৭৫ বছর বয়সী বব ডিলানের আসল নাম রবার্ট অ্যালেন জিমারম্যান। তাঁকে পুরস্কার দেওয়ার পক্ষে সুইডিশ একাডেমি বলছে, আমেরিকার সংগীত ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক মূর্ছনা সৃষ্টির জন্য রক, ফোক, ফোক-রক, আরবান ফোকের এই কিংবদন্তিকে নোবেল পুরস্কারের জন্য বেছে নিয়েছে তারা।

পুরস্কার ঘোষণার সংবাদ সম্মেলনে সারা দানিউস বলেন, তাঁদের এবারের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা হবে না বলেই তিনি আশা করছেন। ডিলানকে তিনি বর্ণনা করেন ইংরেজি বাচনরীতির ‘এক মহান কবি’ হিসেবে, নোবেল পুরস্কার যাঁর প্রাপ্য। সারা বলেন, ৫৪ বছর ধরে চলছে তাঁর এই অভিযাত্রা, প্রতিনিয়ত নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করে চলেছেন, সৃষ্টি করছেন নতুন পরিচয়।

ডিলানের ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চেইঞ্জিং’ গানটিকে সারা তুলনা করেছেন গ্রিক কবি হোমার আর শ্যাফোর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা যদি ৫০০ বছর পেছনে ফিরে যাই, আমরা হোমার আর শ্যাফোকে পাব। তাঁদের গীতি কবিতা লেখাই হতো গেয়ে শোনানোর জন্য। বব ডিলান একই কাজ করেছেন। ’  

১৯৪১ সালের ২৪ মে মিনেসোটার ডুলুথে এক ইহুদি পরিবারে রবার্ট অ্যালেন জিমারের জন্ম। পরে ইংরেজ কবি ডিলন টমাসের নাম থেকে বব ডিলান নাম নেন। তাঁর সংগীত ক্যারিয়ারের সূচনা হয়েছিল ১৯৫৯ সালে মিনেসোটার এক কফি হাউসে। এই শিল্পী, গীতিকার খ্যাতির তুঙ্গে পৌঁছেন গত শতকের ষাটের দশকে। হাতে গিটার আর গলায় ঝোলানো হারমোনিকা হয়ে ওঠে তাঁর ট্রেডমার্ক। সে সময় তাঁর ‘ব্লোয়িং ইন দ্য উইন্ড’ আর ‘দ্য টাইমস দে আর আ-চেইঞ্জিং’-এর মতো গানগুলো পরিণত হয়েছিল যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের গণসংগীতে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাংলাদেশের পক্ষে নিউ ইয়র্কে আয়োজিত ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশে’ জর্জ হ্যারিসন, রিংগো স্টার, এরিক ক্ল্যাপটন, বিলি প্যাটারসন, রবিশঙ্করের সঙ্গে ডিলানও অংশ নিয়েছিলেন। ঐতিহাসিক সেই কনসার্টে তিনি গেয়েছিলেন ‘এ হার্ড রেইনস আ-গনা ফল’, ‘ব্লোইং ইন দ্য উইন্ড’, ‘জাস্ট লাইক আ ওম্যান’সহ কয়েকটি গান। শুধু ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ই নয়, মানুষের অধিকার নিয়ে তিনি সব সময় সোচ্চার। বলা যায়, গণমানুষের জন্য কণ্ঠের হাতিয়ার নিয়ে তিনি সদা জাগ্রত সুরসৈনিক।

বব ডিলান একজন সংগীতশিল্পী, গীতিকার, লেখক ও চিত্রপরিচালনার পাশাপাশি গিটার, কি-বোর্ড, মাউথ-অর্গান বাজাতেও সমান পারদর্শী। তিনি সুইডেনের পোলার প্রাইজ জয় করেছেন বেশ আগেই। নোবেল ছাড়াও তিনি প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট, গ্র্যামি লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট, সংগীতে অস্কার, প্রিন্সেস অস্টোরিয়ান প্রাইজ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেনশিয়াল মেডেল অব ফ্রিডমসহ বহু পুরস্কার ও সম্মাননা জয় করেছেন।

আগামী ১০ ডিসেম্বর পুরস্কারের জনক বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের রাজধানী স্টকহোমে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সাহিত্যের এই নোবেল বিজয়ীকে ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রাউন (প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার ডলার), একটি মানপত্র ও একটি স্বর্ণপদক প্রদান করা হবে।

গত বছর সাহিত্যে নোবেল পান বেলারুশের লেখক ও অনুসন্ধানী সাংবাদিক সেতলানা আলেক্সিয়েভিচ, যাঁর ‘বহুস্বরের’ গদ্যকে সুইডিশ একাডেমি অভিহিত করে ‘সমকালীন যাতনা আর সাহসিকতার সৌধ’ হিসেবে।


মন্তব্য