kalerkantho


যোগাযোগ বিনিয়োগে নতুন জানালা খুলবে

পার্থ সারথি দাস   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



যোগাযোগ বিনিয়োগে নতুন জানালা খুলবে

বিশ্বের ৩২টি দেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগের শক্ত অবকাঠামোবলয়ে বাংলাদেশের অবস্থান দুর্বলই বলা চলে। ইউএন-এসকাপের প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে এশীয় মহাসড়কের অংশ আছে এক হাজার ৭৬০ কিলোমিটার।

এর মধ্যে চার লেন সড়ক আছে মাত্র ৭২ কিলোমিটার। আর ৮৯ শতাংশ সড়কই দ্বিতীয় শ্রেণির। শক্ত মহাসড়ক অবকাঠামো আছে চীন, জাপান, ইরান, দক্ষিণ কোরিয়া, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ায়। ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডও মহাসড়ক উন্নয়নে বেশ এগিয়ে। ভারতে ছয় লেনের এক্সপ্রেসওয়ে নির্মিত হলেও বাংলাদেশে একটি এক্সপ্রেসওয়েও নেই। এ অবস্থায় সড়ক ও রেল অবকাঠামোয় এগিয়ে থাকা চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো বিশেষ করে যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তায় এগিয়ে এসেছে। এর অংশ হিসেবে চীনা প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফরকালে কর্ণফুলী টানেল, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মিটার গেজ রেলপথ ডুয়াল গেজে  রূপান্তর, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেলপথ ডুয়াল গেজে রূপান্তর, সীতাকুণ্ড-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে, আখাউড়া-সিলেট মিটার গেজ রেলপথ ডুয়াল গেজে উন্নীতকরণের মতো প্রকল্পে ঋণ ও কারিগরি সহায়তার আশা করা হচ্ছে।

বিভিন্ন সমীক্ষা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক ও রেল অবকাঠামো উন্নয়নে লাগবে কমপক্ষে দেড় লাখ কোটি টাকা। ধাপে ধাপে প্রকল্প নিয়ে অবকাঠামো নির্মাণের মহাপরিকল্পনা থাকলেও অপর্যাপ্ত বিনিয়োগের ফলে দ্রুত অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছিল।

তবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), ভারতসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ও দেশের সঙ্গে এখন চীন সরকারের বিনিয়োগের আগ্রহে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে যাচ্ছে।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. এ কে আব্দুল মোমেন কালের কণ্ঠকে বলেন, আমি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি থাকা অবস্থায় চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছিল। তারপর আমাদের প্রধানমন্ত্রী চীন সফরে গিয়েছিলেন। চীনের প্রেসিডেন্ট যে দেশে সফরে গিয়েছেন সেখানেই দিয়েছেন অঢেল অর্থ। চীন ৪০ থেকে ৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে চায় বাংলাদেশে। কিন্তু জাপান, রাশিয়াসহ অন্যান্য দেশের কাছ থেকে ঋণ সহায়তা নেওয়ার কৌশলের কারণে চীন থেকে কম বিনিয়োগ নেওয়া হচ্ছে। তার পরও বলব, কর্ণফুলী টানেল, ঢাকা-সিলেট চার লেন, সিলেট-আখাউড়া রেলপথ ডাবল লাইন ডুয়াল গেজ রেলপথের মতো বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণে চীনের অর্থায়ন ও কারিগরি সহায়তা আমাদের কাজে আসবে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য এই অর্থায়ন নতুন মাত্রা যোগ করবে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফিরোজ সালাহউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, রেলের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য পাঁচটি বড় প্রকল্পে আমরা চীনের অর্থায়ন আশা করি। তার মধ্যে পদ্মা সেতু রেলসংযোগ প্রকল্প অন্যতম।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এম এ এন ছিদ্দিক কালের কণ্ঠকে বলেন, চীনের অর্থায়নে ঢাকা-সিলেট চার লেন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাই। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুত এ প্রকল্পের জন্য চীনা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এর মধ্যেই রূপরেখা চুক্তি হয়েছে আমাদের। জাইকা, এডিবির মতো অবকাঠামোয় চীনের আগ্রহ বাড়ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তিন বছরে বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো ঋণচুক্তি করেনি চীন। চীন সরকারের কাছে ২৫টি প্রকল্পের জন্য এক লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা অর্থায়ন চেয়েছে বাংলাদেশ। ২৫ প্রকল্পের মধ্যে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীতে টানেল নির্মাণ প্রকল্পও আছে। প্রকল্পে ব্যয় হবে আট হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে চার হাজার ৭৯৯ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ঋণ হিসেবে দেওয়ার কথা রয়েছে চীন সরকারের। চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকালে আজ দুপুরে প্রকল্পের কাজ উদ্বোধনের জন্য বাংলাদেশ সেতু বিভাগ প্রস্তুতি নিয়েছে। সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পের বাণিজ্যিক চুক্তি হয়েছে, এখন ঋণচুক্তি হবে। গত বছরের ২৪ নভেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছিল। টানেল নির্মাণ করবে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান চায়না কমিউনিকেশনস কনস্ট্রাকশন কম্পানি (সিসিসিসি)। এই টানেল হবে এশীয় মহাসড়কের অংশ। প্রকল্প পরিচালক ইফতেখার কবীর গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ উদ্বোধনের জন্য আমাদের প্রস্তুতি রয়েছে। ’

মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর দেশের সবচেয়ে বড় অবকাঠামো পদ্মা সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। এ জন্য বিশ্বব্যাংকসহ আরো তিনটি সংস্থা অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিল। বিশ্বব্যাংক তাতে গাফিলতি ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে কালক্ষেপণ করে। একপর্যায়ে বিশ্বব্যাংককে ‘না’ বলে নিজেদের অর্থায়নেই সরকার পদ্মা সেতু প্রকল্পের কাজ শুরু করে। অর্থায়ন না করলেও ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা ব্যয়সাপেক্ষ পদ্মা সেতু প্রকল্পে মূল সেতু নির্মাণ করছে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি লিমিটেড। নদীশাসনের কাজও করছে চীনা প্রতিষ্ঠান সিনোহাইড্রো করপোরেশন লিমিটেড। ২০১৮ সালের মধ্যে সেতু নির্মাণের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ প্রকল্পের কাজও চলছে বাংলাদেশ সেতু বিভাগের অধীনে। এ যাবৎ কাজের অগ্রগতি ৩৮ শতাংশ।

তবে পদ্মা সেতু রেল সংযোগের বড় প্রকল্পে চীনের অর্থায়ন আশা করা হচ্ছে। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হবে প্রকল্পের আওতায়। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা। রেলপথও নির্মাণ করবে চীনা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ নির্মাণকাজের ক্রয় প্রস্তাব গত ২০ জুলাই সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় অনুমোদন হয়েছে। এরপর গত ৮ আগস্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের সঙ্গে রেলওয়ের চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। চীন সরকার প্রকল্পে সহায়তা হিসেবে ২৪ হাজার ৭৪৯ দশমিক ৫ কোটি টাকা দেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এশীয় মহাসড়কের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে চার লেনের কাজ প্রায় শেষ। ঢাকা-মাওয়া, দৌলতদিয়া-খুলনা মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে ভুটানে স্বাক্ষরিত বিবিআইএন চুক্তির আওতায় চার দেশের সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের ৩০ প্রকল্পে এডিবি আট বিলিয়ন মার্কিন ডলার দেবে। এর মধ্যে প্রতিবছর বাংলাদেশকে দেবে এক বিলিয়ন ডলার বা ১০০ কোটি টাকা। ভারত সরকার বাংলাদেশকে ২০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে। এর একটি অংশ ব্যয় হবে সড়ক উন্নয়নে। জাইকার আট হাজার কোটি টাকা অর্থায়নে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্বিতীয় কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী সেতু নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। জয়দেবপুর-এলেঙ্গা চার লেন প্রকল্পে অর্থায়ন করছে এডিবি। হাটিকুমরুল-রংপুর চার লেন মহাসড়ক প্রকল্পে অর্থায়ন করছে এডিবি। ভাঙ্গা থেকে কালনা হয়ে বেনাপোল সড়কটি প্রশস্ত করতে অর্থায়ন করবে জাইকা। এ অবস্থায় চীন সরকারের অর্থায়নের জন্য ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক চার লেন প্রকল্প তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পে ব্যয় হবে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আলাদা সার্ভিস লেনসহ ২৩৬ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে কাজ করবে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কম্পানি লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সওজ অধিদপ্তরের রূপরেখা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে গত ৯ অক্টোবর। এশীয় মহাসড়কে অযান্ত্রিক ও ধীরগতির যানবাহন চলাচল করে না। এগুলোর চলাচলের জন্য মূল মহাসড়কের পাশে সার্ভিস লেন থাকে। বাংলাদেশে এ ধরনের একটি সড়ক আছে বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়কে। এ ধরনের সুবিধা রেখেই নির্মাণ করা হবে ঢাকা-সিলেট চার লেন।

ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পে ১৩৯ কোটি ডলার, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মিটার গেজকে ডুয়াল গেজে রূপান্তর প্রকল্পে ২৬ কোটি ডলার, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী রেললাইন ডুয়াল গেজ রূপান্তর প্রকল্পে ৭৫ কোটি ডলার, সীতাকুণ্ড-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে, আখাউড়া-সিলেট রেললাইনকে মিটার গেজ থেকে ডুয়াল গেজে উন্নীতকরণ প্রকল্পে ১৭৬ কোটি ডলার, ধীরাশ্রম রেলওয়ে স্টেশনে নতুন অভ্যন্তরীণ কনটেইনার ডিপো নির্মাণে ২০ কোটি ডলার অর্থায়নের আশা করছে বাংলাদেশ সরকার।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশে যোগাযোগ অবকাঠামো বিশেষ করে সড়ক ও সেতু নির্মাণে চীনের আর্থিক ও কারিগরি অংশগ্রহণ দীর্ঘদিনের। চীনের অর্থায়নে সাতটি মৈত্রী সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। অষ্টম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু বা বেকুটিয়া সেতু নির্মাণের বিস্তারিত নকশা প্রণয়নে গত জুনে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। পটুয়াখালী, বাগেরহাট ও খুলনায় চীন সরকারের অনুদানে তিনটি সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে। পটুয়াখালীর দুমকী ও বাউফল উপজেলার লোহালিয়া নদীর ওপর নবম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু, বাগেরহাটের মংলা উপজেলাধীন মংলা নদীর ওপর দশম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু ও খুলনার দাকোপ উপজেলার ঝপঝপিয়া নদীর ওপর ১১তম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণ করা হবে।


মন্তব্য