kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো দুর্গোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হলো দুর্গোৎসব

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার দশমীর দিন গতকাল চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে বিসর্জন দেওয়া হয় প্রতিমা। ছবি : রবি শংকর

ভক্তদের চোখের জলে ভাসিয়ে সপরিবারে দুর্গতিনাশিনী দেবী মা দুর্গা বাবার বাড়ি থেকে ফিরে গেলেন স্বামীর ঘর কৈলাসে। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব।

গতকাল মঙ্গলবার প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় পাঁচ দিনের এই মহা আয়োজন। পূজার শেষ দিনে রাজধানীর পুরান ঢাকাসহ সারা দেশেই মণ্ডপগুলোতে ছিল মানুষের ঢল।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, মানুষের মনের আসুরিক প্রবৃত্তি যেমন কাম, ক্রোধ, হিংসা, লালসা বিসর্জন দেওয়াই মূলত বিজয়া দশমীর মূল তাৎপর্য। এ প্রবৃত্তিগুলো বিসর্জন দিয়ে একে অন্যের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করাই এ আয়োজনের উদ্দেশ্য। পঞ্জিকা মতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) আসেন এবং স্বর্গলোকে বিদায় নেন ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে। যার ফল হচ্ছে রোগ, শোক, হানাহানি, মারামারি বাড়বে। তবে ভক্তদের বিশ্বাস, মঙ্গলময়ী ও আনন্দময়ী দেবী দুর্গা সবার কল্যাণই করবেন। গত পাঁচ দিনের আয়োজনে সেটাই ছিল মূল প্রার্থনা।

পূজা উদ্‌যাপন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, এবার সারা দেশে ২৯ হাজার ৩৯৫টি স্থায়ী ও অস্থায়ী মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। যা গত বছরের তুলনায় ৩২৪টি বেশি। আর রাজধানী ঢাকায় পূজা অনুষ্ঠিত হয় ২২৯টি মণ্ডপে। মানুষের মধ্যে নিরন্তর শান্তি-সম্প্রীতির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে এই উৎসব শুরু হয়েছিল। প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তার পরিসমাপ্তি হলো। বিজয়া দশমী উপলক্ষে গতকাল ছিল সরকারি ছুটি। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ বঙ্গভবনে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।

গতকাল সকালে সব মণ্ডপে দশমী পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন করা হয়। বিষাদের ছায়া ছিল ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টাসহ বিভিন্ন বাদ্যে, আলোকিত করা ধূপ আরতি ও দেবীর পূজা-অর্চনায়। বিসর্জনের আগে সকাল থেকে ঢাকার মন্দিরে মন্দিরে চলে সিঁদুর খেলা আর আনন্দ উৎসব। প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গন থেকে কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়। দুপুরে পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ এবং মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বের হওয়া এই বর্ণাঢ্য বিজয়া শোভাযাত্রাটি পলাশী মোড় থেকে শুরু হয়ে নগরীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে গিয়ে পৌঁছায়। ঢাকের শব্দে আর ধূপের গন্ধে মুখরিত হয়ে ওঠে ওয়াইজঘাট এলাকা। মণ্ডপের প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হলেও শুধু ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিমাটি রেখে দেওয়া হয়। কিন্তু পূজার কাজে ব্যবহৃত দেবীর ফুল, বেলপাতা ও ঘট বিসর্জন দেওয়া হয়।

এদিকে বিজয়া শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নিতে দুপুর গড়িয়ে যেতেই ভক্তরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপ থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে সমবেত হতে শুরু করে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে। ঢাকার বিভিন্ন স্থানের পূজামণ্ডপ থেকে আসা প্রতিমা নিয়ে ট্রাকগুলো সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে যায় রাস্তায়। বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রাকে আরো বর্ণিল করে তোলে। অনেকেই দুর্গা, শিব ও মহিষাসুরসহ পৌরাণিক চরিত্রের নানা সাজে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়। যাত্রাপথে রাস্তার দুই পাশে এবং আশপাশের ভবনের ছাদ-বারান্দায় দাঁড়িয়ে অসংখ্য মানুষ শোভাযাত্রাকে স্বাগত জানায়। ঢাকেশ্বরী থেকে শুরু হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা পেরিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, দোয়েল চত্বর, জাতীয় প্রেস ক্লাব, মুক্তাঙ্গন, গোলাপ শাহ মাজার, গুলিস্তান হল, নবাবপুর, বাহাদুর শাহ পার্ক ও স্টার সিনেমা হল হয়ে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে গিয়ে পৌঁছায়। বিশাল এ শোভাযাত্রা এগিয়ে চলার সঙ্গে সঙ্গে লোকসমাগম ও ট্রাকে প্রতিমার সংখ্যাও বাড়তে থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিমা নিয়ে মিছিলে যোগ দিতে থাকে ভক্তরা।

যাত্রাপথে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পুলিশ সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখে। নিরাপত্তাব্যবস্থাও জোরদার করা হয়। বিপুলসংখ্যক পুলিশের পাশাপাশি র‌্যাব সদস্যরাও মাঠে ছিলেন। এ সময় বুড়িগঙ্গার দুই তীরে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী প্রতিমা বিসর্জন দেখতে ভিড় করে। সেখানে ‘দুর্গা মায় কী জয়’, ‘আসছে বছর আবার হবে’ ইত্যাদি ধ্বনি ও উৎসবমুখর পরিবেশে প্রতিমা বহনকারী নৌকাগুলো মাঝনদীতে গিয়ে বিসর্জন দেয় প্রতিমা। বিসর্জনের এই পর্ব চলেছে রাত অবধি। অনেকে প্রতিমা বিসর্জনের সময় নৌকায় করে নদীতে আনন্দ করে। রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ধ্যা আরতির পর মিশনের পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এরপর ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ ও মিষ্টিমুখ করে। প্রথা অনুযায়ী প্রতিমা বিসর্জনের পর সেখান থেকে শান্তিজল নিয়ে আসা হয়।

পূজামণ্ডপে ট্রান্সফাস্টের সুদৃশ্য গেট : ‘উৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত হয়ে উঠুক আনন্দময়, সবার প্রাঙ্গণ ভরে যাক খুশির হাওয়ায়। সবাইকে শারদীয়ার অনেক অনেক শুভেচ্ছা। ’ এবারের শারদীয় দুর্গোৎসবে দেশের একাধিক স্থানে পূজামণ্ডপের গেটে দেখা গেছে এমন শুভেচ্ছা বাণী। আন্তর্জাতিক মানি এক্সচেঞ্জ কম্পানি ট্রান্সফাস্টের উদ্যোগে এসব গেট নির্মাণ করা হয়। রাজধানীর কুর্মিটোলার কাওলায় দুর্গামন্দির, চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানার দেওয়ানহাটে শ্রীশ্রী দেওয়ানেশ্বরী সর্বজনীন পূজামণ্ডপ ও সিলেটের বালুচরে সেন্ট্রাল দুর্গাবাড়ি মণ্ডপে স্থাপিত এসব গেট সবার দৃষ্টি কেড়েছে।


মন্তব্য