kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ঘরে আগুন, কনস্টেবল স্ত্রী-সন্তানসহ নিহত ৫

পার্থ সারথী দাস ঠাকুরগাঁও   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ঘরে আগুন, কনস্টেবল স্ত্রী-সন্তানসহ নিহত ৫

মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় আপনজন হারিয়ে কাঁদছেন স্বজনরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

পূজার ছুটিতে স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে ঠাকুরগাঁওয়ে গ্রামের বাড়ি বেড়াতে এসেছিলেন পুলিশ কনস্টেবল খরেশ চন্দ্র রায়। সঙ্গে এসেছেন তাঁর শ্যালিকা।

কিন্তু দুর্গোৎসবের শেষ দিন আত্মীয়স্বজনকে শোকে ভাসিয়ে পাঁচজনই চলে গেল না ফেরার দেশে।

গতকাল মঙ্গলবার ভোরের দিকে হঠাৎ ঘরে আগুন লেগে দগ্ধ হয়ে মারা যায় তারা। পীরগঞ্জ উপজেলার জনগাঁ গেণ্ডাবাড়ী গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটেছে।

নিহতরা হলো সুরেশ চন্দ্র রায়ের ছেলে পুলিশ কনস্টেবল খরেশ চন্দ্র রায়, তাঁর স্ত্রী কেয়া রানী (৩৮), মেয়ে নাইস (১৩), ছেলে নির্ণয় (৮) ও শ্যালিকা সন্ধ্যা রানী (২২)।

খরেশ দিনাজপুর সদর থানায় কর্মরত ছিলেন। সন্ধ্যা রানী দিনাজপুর সরকারি কলেজের স্নাতক শ্রেণিতে পড়তেন। তাঁর বাড়ি দিনাজপুরেই।

কিভাবে ঘরে আগুন লাগল, সেটা নিশ্চিত করতে পারেনি কেউ। পুলিশ বলছে, ঘটনাটি নাশকতাও হতে পারে। এ ব্যাপারে তদন্ত চলছে।

তবে এলাকাবাসী বলছে, ঘরের ভেতর বিদ্যুতের গোলযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, খরেশের ঘরের ওপর দিয়ে ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের যে তার গেছে সেটা ছিঁড়ে শর্টসার্কিট হয়ে আগুন লাগতে পারে। সঠিক কারণ অনুসন্ধানে দুটি কমিটি করা হয়েছে।

প্রতিবেশী ও পরিবারের লোকজন জানায়, কনস্টেবল খরেশ চন্দ্র রায় পূজার ছুটি কাটাতে সোমবার সকালে দিনাজপুর থেকে স্ত্রী-সন্তান ও শ্যালিকাকে নিয়ে বাড়ি আসেন। মহানবমীর সারা দিন মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরে গভীর রাতে বাড়ি ফেরে তারা। খাওয়াদাওয়া সেরে মধ্যরাতে ঘুমাতে যায় তারা। ভোর ৫টার দিকে হঠাৎ তাদের চিৎকার শুনে বাড়ির অন্য সদস্যরা ছুটে আসে। তারা দেখে, খরেশের ঘরের ভেতর আগুন জ্বলছে। স্বজনরা দরজা ও জানালা ভেঙে তাঁর স্ত্রী কেয়া ও শ্যালিকা সন্ধ্যাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে। খরেশ, তাঁর মেয়ে নাইস ও ছেলে নির্ণয়কে দগ্ধ অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে পীরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এসে আগুন নেভান।

দগ্ধ তিনজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁদের মৃত্যু হয়। স্ত্রী-সন্তান, শ্যালিকাসহ খরেশের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায়  এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ছেলে, বৌমা ও নাতি-নাতনির এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না খরেশের মা ও বাবা। কাঁদতে কাঁদতে কিছুক্ষণ পরপর মূর্ছা যাচ্ছিলেন তাঁরা।

খরেশের বড় ভাই হরিলাল চন্দ্র রায় বলেন, তাঁর ভাই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রাত ২টার দিকে স্থানীয় পূজামণ্ডপে আরতি দেখে বাসায় ফেরেন। বাসায় ফেরার পথে অন্য মণ্ডপে ঘোরাঘুরি করেন এবং প্রতিমা দর্শন নিয়ে তাঁদের মধ্যে আলাপ হয়। এরপর যে যাঁর ঘরে চলে যান তাঁরা। ভোরে আর্তচিৎকার শুনে তাঁরা ছুটে এসে খরেশের ঘরে আগুন জ্বলতে দেখেন।

খরেশের ছোট ভাই তোরাশ চন্দ্র বলেন, তাঁরা সবাই মিলে রাতে মণ্ডপে আনন্দ করেছেন। তখন কে জানত এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে ভাই ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা সবাইকে ছেড়ে যাবে!

তোরাশ বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে ঘরে আগুন লেগে থাকতে পারে।

এ ব্যাপারে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, খরেশের ঘরের ওপর দিয়ে যাওয়া ১১ হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের তার ছিঁড়ে পড়ায় শর্টসার্কিট হয়ে থাকতে পারে। তবে তার ছিঁড়ে পড়ে আগুন লাগলে টিনের চালা পুড়ে যেত। কিন্তু সেটা না হয়ে শুধু ঘরের ভেতরেই আগুন লেগেছে।

জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল ও পুলিশ সুপার ফারহাত আহমেদ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁওয়ের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেওয়ান লালন আহমেদকে প্রধান করে পুলিশের তিন সদস্যের কমিটি করা হয়। এ কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) ও পীরগঞ্জ থানার ওসি। কমিটিকে সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে প্রধান করে সাত সদস্যের কমিটি করেছে জেলা প্রশাসন।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার দেওয়ান লালন আহমেদ জানান, আগুন লাগার কারণ এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। এটি নাশকতার ঘটনাও হতে পারে। এ বিষয়ে পুলিশের গোয়েন্দারা তদন্ত করছেন। তদন্ত শেষে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যাবে।

জেলা প্রশাসক আব্দুল আওয়াল বলেন, এটি বেদনাদায়ক একটি ঘটনা। তবে অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি জানান, প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।

এদিকে পাঁচজনের লাশ ময়নাতদন্ত শেষে গ্রামের বাড়িতে সৎকার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন।

ভগবানের এ কেমন খেলা : ‘দুর্গাপূজার কয়েক দিন পরেই বাড়িতে লক্ষ্মীপূজা। এবার বাড়ির পূজায় বৌমা তোমাকে থাকতে হবে। বাবা খরেশ, তুইও এক দিনের জন্য ছুটি নিয়ে আসবি’— এটাই ছিল ছেলে খরেশ ও পুত্রবধূ কেয়া রানীর সঙ্গে বাবা সুরেশ চন্দ্রের শেষ কথা। সোমবার দিবাগত রাত ২টার দিকে ঘুমাতে যাওয়ার আগে দাদুর কথায় তাল মিলিয়ে সায় দিয়েছিল খরেশের ১১ বছরের মেয়ে নাইস। গতকাল দুপুরে বাড়িতে বিলাপ করতে করতে ভাঙা গলায় এমনটিই জানান সুরেশ চন্দ্র। তিনি বলেন, ‘এটা ভগবানের কেমন খেলা, বাপের আগে পৃথিবী ছেড়ে যেতে হলো ছেলেকে, সঙ্গে নাতি-নাতনি আর বৌমাও। কেন এমন হলো? এমন শোক যেন আর কেউ না পায়। ’ 

 


মন্তব্য