kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফাঁকা শত শত স্বাস্থ্যকেন্দ্র

তৌফিক মারুফ   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ফাঁকা শত শত স্বাস্থ্যকেন্দ্র

দূর থেকেই চোখে পড়ে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন নকশার তিনতলা ভবনটি। তবে কাছে গেলে বোঝা যায় এখন এটি আসলে কেবলই খোলস।

দামি গ্রিল লাগানো জানালার একটিতেও কাচ নেই। ভরদুপুরেও ভেতরে ভুতুড়ে অন্ধকার। পুরো ভবনের ১৪টি কক্ষের মধ্যে দুটি বাদে সব কটিই পরিত্যক্ত। কোনো কোনো কক্ষের দরজা ভেঙে পড়ে আছে, আবার কোনোটির দরজা উধাও। আসবাবপত্রও ভেঙে পড়ে আছে বিবর্ণ চেহারায়। সামনের দিকে ভবনের গায়ে লেখা, ‘অশ্বদিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র’। ২৪ ঘণ্টা নিরাপদ প্রসবসেবাসহ স্থানীয় মানুষের প্রাথমিক পর্যায়ের সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা থাকা একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এটি। এখানে সার্বক্ষণিক থাকার কথা একজন মেডিক্যাল অফিসার, একজন উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার, দুজন পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক ও একজন প্রহরী। ভবনের মধ্যেই তাঁদের সার্বক্ষণিক থাকার জন্য রয়েছে আলাদা আবাসন কক্ষ।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টায় নোয়াখালী সদর উপজেলার ওই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গেলে ভবনের কাছেই দাঁড়ানো এক কলেজ ছাত্র নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলে, ‘এটিকে এখন স্বাস্থ্যকেন্দ্র না বলে অসামাজিক কার্যকলাপের কেন্দ্র বলাই ভালো। ’ এর কারণ জানতে চাইলে ওই ছাত্র বলে, ‘সকাল ১১টার পর থেকে দুপুর ১টা-দেড়টার মধ্যে ঘণ্টা দেড়েক দুই-তিনজন স্বাস্থ্যকর্মীকে দেখা যায়। বাকি সময় পুরোপুরি পরিত্যক্ত থাকে ভবনটি। তখন এলাকার কিছু বখাটের আড্ডা ও অসামাজিক কর্মকাণ্ডের আখড়ায় পরিণত হয় এটি। ফলে এখানে সহজে কোনো রোগী সেবা নিতে যেতে চায় না। আর গেলেও ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দুপুরে এক-দেড় ঘণ্টা ছাড়া ডাক্তার তো দূরের কথা, কোনো স্বাস্থ্যকর্মীকেও পাওয়া যায় না। রাতের অবস্থা আরো খারাপ। রীতিমতো ভয় লাগে। এ জন্য দায়ী এখানকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরাই। তাঁরা এ ভবনে অবস্থান না করায় ধীরে ধীরে এটি অরক্ষিত ও পরিত্যক্ত অবস্থায় এসেছে। তাঁরা যদি সবাই এখানে বসবাস করে সেবা চালু রাখতেন, তবে এমন ভুতুড়ে পরিবেশ হওয়ার প্রশ্নই ছিল না। ’

ওই তরুণের সঙ্গে কথা শেষ করে ভেতরে গিয়ে অন্ধকার একটি কক্ষে পাওয়া যায় উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার (স্যাকমো) নুরুল আমিন ও দুই পরিবার কল্যাণ পরিদর্শককে। তাঁরা বসে ছিলেন আড্ডার ভঙ্গিতে। হঠাৎ আগন্তুক দেখে রীতিমতো ভড়কে যান। জানতে চাইলে স্যাকমো নুরুল আমিন অকপটে স্বীকার করেন ভবনটির ভুতুড়ে পরিবেশের কথা। বরং আরো বাড়তি তথ্য দিয়ে তিনি বলেন, ‘ভবনটি অরক্ষিত থাকার কারণেই এখানে ডেলিভারি করানো তো দূরের কথা, মানুষকে অন্যান্য সাধারণ চিকিৎসাসেবা দেওয়ারও কোনো উপায় নেই। বিদ্যুৎ নেই, পানি নেই, দরজা-জানালা, পানির ট্যাংকসহ আরো অনেক কিছুই চুরি হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি এরই মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। এমনকি ঢাকা থেকে বড় কর্মকর্তারা এসে এই চিত্র দেখেও গেছেন। ’ তাঁরা কেন সেখানে থাকেন না জানতে চাইলে তিনজন পরস্পরের দিকে তাকিয়ে জবাব এড়িয়ে যান।

জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের নোয়াখালী জেলার ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক মোস্তফা কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, কেবল অশ্বদিয়া কেন্দ্রটিই নয়, স্থানীয় বিনোদপুর, এজমালি, চরমধুয়া, দাদপুরসহ আরো বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের অবস্থা খুবই খারাপ। এসব কেন্দ্রে সেবা চালু রাখা দুষ্কর। তিনি জানান, অরক্ষিত অবস্থার কারণে মানুষের সেবা নিশ্চিত করা মুশকিল হয়ে পড়েছে। তিনি ওই ভবন ঠিক করার জন্য গত ২৮ আগস্টও স্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগকে চিঠি দিয়েছেন।

চট্টগ্রামের সন্দ্বীপ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. ফজলুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার উপজেলায় কাগজে-কলমে ১০টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র থাকার কথা। এর মধ্যে আটটির স্থাপনা আছে, বাকি দুটি এখনো হয়নি। আর দুঃখের বিষয় হচ্ছে, পর্যাপ্ত ডাক্তার তো নেই-ই, ওই আটটি কেন্দ্রে আটজন স্যাকমো থাকার কথা; কিন্তু মোট স্যাকমোই আছে দুজন। এফডাব্লিউভি থাকার কথা প্রতিটি কেন্দ্রে একজন করে আটজন; কিন্তু আছেন মোট তিনজন। ফলে তাঁদের দিয়ে কিভাবে আটটি কেন্দ্রে সেবা দেওয়া সম্ভব?’ ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘পর্যাপ্ত জনবল না থাকায় কেবল রোগীর সেবাকাজেই অচলাবস্থা নয়, অবকাঠামো সংরক্ষণেও সমস্যা হচ্ছে। সেগুলো নষ্ট হচ্ছে। অথচ এসব সমস্যার সমাধান করা গেলে সরকারের এত ভালো ব্যবস্থাপনার বড় সুফল পাওয়া যেত। ’

নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের এমন চিত্রের সূত্র ধরে দেশের অন্যান্য জেলায়ও আমাদের প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বেশির ভাগ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের চিত্র একই রকম। কিছু কেন্দ্রের অবস্থা আরো নাজুক। ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়ার মতো অনেক কেন্দ্র এমনকি শুক্রবার বন্ধই থাকে। আবার বহু কেন্দ্রেই নেই প্রয়োজনীয়সংখ্যক জনবল। ফলে ওই সব স্থানে সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। অনেক স্থানে সুরক্ষিত রাখা যাচ্ছে না অবকাঠামো। মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমের এমন অবস্থা নিয়ে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও আছেন বেকায়দায়। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে আরো গতি না আসার জন্য এমন অবস্থাকেই দায়ী করছে অনেকে। তবে এ ক্ষেত্রে অবকাঠামোর চেয়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের বেশি দায়ী করা হয়। তাঁরা কেন্দ্রগুলোতে না থাকায় এবং সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করায় দেশের বেশির ভাগ কেন্দ্রে এমন অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে বলে জানান অধিদপ্তরের কোনো কোনো কর্মকর্তা।

৭০% খুঁড়িয়ে চলছে, ১৫% একেবারেই অচল : সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থার পক্ষ থেকে সরকারের কাছে দেওয়া এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র ১৫ শতাংশ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ভালোভাবে চালু আছে। ৭০ শতাংশ খুঁড়িয়ে চলছে, আর বাকি ১৫ শতাংশ একেবারেই অচল হয়ে আছে। ফলে সব মিলিয়ে দুই হাজারের বেশি ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রই কমবেশি অচলাবস্থায় রয়েছে। অথচ এসব সেবাকেন্দ্র ঠিকমতো সচল থাকলে দেশে মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার আরো দ্রুত কমিয়ে আনা যেত।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের সর্বশেষ সংখ্যা তিন হাজার ৯২৪। এসব কেন্দ্র থেকে মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা, বয়ঃসন্ধিকালীন স্বাস্থ্যসেবা, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা এবং পুষ্টিসেবা দেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সেবা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাচ্ছে প্রত্যন্ত এলাকার অভীষ্ট জনগোষ্ঠী।

জানতে চাইলে পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মা ও শিশুস্বাস্থ্য) ডা. মোহাম্মদ শরীফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কোথাও জনবল সমস্যা আর কোথাও অবকাঠামোগত সমস্যার কারণে আমাদের বেশির ভাগ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে প্রত্যাশিত হারে সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থা কাটাতে আমরা নানা পদক্ষেপ নিচ্ছি। সম্প্রতি একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মাধ্যমে জরিপ ও পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আমরা যে ফল পেয়েছি, তা ধরে এখন নতুন উদ্যোগের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে আমরা কেন্দ্রগুলো সচল করতে ও রাখতে স্থানীয় কমিউনিটি লিডারদের যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছি। ’

ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘সরকারের উদ্যোগে ওপর থেকে যতই পদক্ষেপ নেওয়া হোক, মাঠের কর্মীরা যদি ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করেন, তবে কোনো উদ্যোগই সফল হবে না। মাঠকর্মীরা কেন্দ্রগুলোতে তাঁদের জন্য নির্ধারিত বাসস্থানে না থাকায় একেকটি কেন্দ্র এমন খারাপ অবস্থায় চলে যায়। কিন্তু কমিউনিটি লিডারদের যুক্ত করে এবং বেসরকারি সহায়তা নিয়ে এরই মধ্যে আমরা প্রায় সাড়ে তিন শ অচল ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে প্রাণ ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছি। তাই অন্যগুলোর ক্ষেত্রেও একই পন্থা অবলম্বনের প্রক্রিয়া চলছে। ’

‘ডাক্তার কখন আইসে, কখন যায় টেরই পাওয়া যায় না’ : রংপুর থেকে স্বপন চৌধুরী জানান, গত বৃহস্পতিবার দুপুর ১টায় রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার কোলকোন্দ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে গিয়ে তালা ঝুলতে দেখা যায়। দুপুরের রোদে ওই কেন্দ্রের মাঠেও কোনো মানুষের দেখা মেলেনি। পার্শ্ববর্তী বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এমন চিত্র নিত্যদিনের। তবে সকালে কেন্দ্রের এমএলএসএস ও আয়া এসে কিছুক্ষণ থেকে চলে যান। ডাক্তার কিংবা ওষুধ ঠিকমতো না পাওয়ায় এলাকার লোকজন এখানে সেবা নিতেও তেমন একটা আসে না বলে জানায় তারা। ফলে সরকার জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে এসব স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র নির্মাণ করলেও অনেক স্থানে এর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামের সাধারণ মানুষ।

কোলকোন্দ ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পার্শ্ববর্তী বাড়ির দুলালী বেগম বলেন, ‘ডাক্তার কখন আইসে, কখন যায় টেরই পাওয়া যায় না। কেন্দ্রোত মেট্রো ছাড়া কোনো ওষুধও পাওয়া যায় না। সেই কারণে এ্যাটে মাইনসে আইসে না। ’ একই রকম বক্তব্য ওই বাড়ির ছালেহা বেগমেরও। এলাকার কয়েকজন বাসিন্দা জানায়, শুধু এখানে নয়, দু-একটি ছাড়া উপজেলার ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রগুলোতে একই চিত্র পাওয়া যায়।

ওই কেন্দ্র থেকে দুই কিলোমিটার দূরে বাড়িতে গিয়ে কথা হয় এমএলএসএস আনোয়ারুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে অবস্থান করে বাড়ি ফিরেছি। ভিজিটর (এফডাব্লিউএ) হাসিনা বেগম চাকরি থেকে গত বছর অবসর নেওয়ার পর এ কেন্দ্রে আর কাউকে পোস্টিং দেওয়া হয়নি। আলমবিদিতর ইউনিয়ন কেন্দ্রের ভিজিটর ডলি রানীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি সপ্তাহে দুই দিন আসেন। বড়বিল ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারকে (এসএসিএমও) এ কেন্দ্রের অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহে তাঁরও তিন দিন আসার কথা। তবে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র না থাকায় লোকজন তেমন একটা সেবা নিতে আসে না এখানে। এ কেন্দ্রে মূলত আমি ও আয়া নার্গিসকে সারা দিন বসে থাকতে হয়। ’

গঙ্গাচড়া পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার দায়িত্বে থাকা ডা. মুনাফ চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, আসলে ওই কেন্দ্রে জনবল সংকট রয়েছে। অন্য এলাকার লোক দিয়ে কোনো রকমে চালানো হচ্ছে। তবে এ সমস্যা বেশি দিন থাকবে না। ওষুধপত্রের সংকট রয়েছে বলেও জানান তিনি। আগের চেয়ে উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র ভালো চলছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, কর্মস্থলে থাকার কথা থাকলেও বেশির ভাগ এলাকায় সেটি হচ্ছে না।

পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ রংপুরের উপপরিচালক সাইদুল ইসলাম জানান, জেলার ৮২টি ইউনিয়নের মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র আছে ৬৭টিতে। আট উপজেলার প্রতিটিতে তিনটি করে পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে অবকাঠামোসহ সব ধরনের সেবা পাচ্ছে লোকজন। বাকিগুলোও চলছে, তবে জনবল সংকট প্রকট হওয়ায় সেবা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

জনবল সংকটে হিমশিম : ময়মনসিংহ থেকে নিয়ামুল কবীর সজল ও আলম ফরাজী জানান, ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মুসুল্লী ইউনিয়নের চকই বাজারের কাছেই ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো কেন্দ্রটিই নিষ্প্রাণ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী জানান, এখানে যাঁরা চাকরি করেন তাঁরা সবাই আসেন দূর থেকে। এ ছাড়া লোকবল সংকটও আছে। নেই কোনো ওষুধপত্র। তাই এ কেন্দ্রে সেবা নিতে লোকজন আসেই না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলায় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে ১৪৪টি। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন ৪২টি এবং পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের আওতাধীন ১০২টি। জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিস সূত্রে জানা যায়, এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্র সম্প্রতি তিনটি ক্যাটাগরিতে বিভাজন করা হয়েছে। এগুলো হলো—‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরি। যেসব কেন্দ্রে পরিবার কল্যাণ পরিদর্শক, সহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারসহ অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা রয়েছে এগুলোকে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে ফেলা হয়েছে। পুরো জেলায় ‘এ’ ক্যাটাগরির কেন্দ্র রয়েছে মাত্র সাতটি। মোটামুটি ভালো কেন্দ্রের (‘বি’ ক্যাটাগরি) সংখ্যা ৭৩। আর বলতে গেলে অচল এমন কেন্দ্রের সংখ্যা ৬৪। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ৪৪ শতাংশ কেন্দ্রে বিদ্যুৎ সুবিধা রয়েছে। পানির সুবিধা রয়েছে মাত্র ২২ শতাংশ কেন্দ্রে।

জেলা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ডা. আবদুর রউফ বলেন, অনেক কেন্দ্রেই জনবল কম। বেশ কিছু কর্মচারী অবসরে যাওয়ায় আগামী বছর জনবল সংকট আরো প্রকট হবে।

মেডিক্যাল অফিসারের কক্ষ তালাবদ্ধ : বরিশাল থেকে রফিকুল ইসলাম জানান, বরিশালের উজিরপুর উপজেলার গুঠিয়া ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিক্যাল অফিসারের কক্ষটি কয়েক মাস ধরেই তালাবদ্ধ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কেন্দ্রের এক কর্মী এ তথ্য দিয়েছেন। স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানান, এ কেন্দ্রে রোগীর তেমন একটা চাপ কখনো দেখা যায় না।

ওই কেন্দ্রের স্যাকমো সমর সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখান থেকে বরিশাল নগরী কাছে এবং যোগাযোগব্যবস্থা খুবই ভালো হওয়ায় এখানে কেউ ডেলিভারির জন্য আসে না। সবাই বরিশালেই চলে যায়। তবে মাঝেমধ্যে কিছু পরামর্শ ও উপকরণ নিতে এবং জন্মনিয়ন্ত্রণের কিছু পদ্ধতি জানতে কেউ কেউ আসে। ’ সমর সরকার আরো বলেন, এখানকার ডাক্তারকে কয়েক মাস আগে উপজেলা সদর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেছে। ফলে এ পদে এখন কেউ নেই।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বাসিন্দা জানায়, এখানে নিয়মিত ডাক্তার পাওয়া গেলে রোগীও আসে। কিন্তু ডাক্তার থাকে না বলে অনেকেই স্যাকমোর কাছে চিকিৎসা নিতে আসে না, বরং বরিশালে গিয়ে ডাক্তার দেখায়।


মন্তব্য