kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিতর্ক আর বৃষ্টির মধ্যেও সিরিজ জেতার প্রত্যয়

নোমান মোহাম্মদ, চট্টগ্রাম থেকে   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিতর্ক আর বৃষ্টির মধ্যেও সিরিজ জেতার প্রত্যয়

আজ আকাশ ভেঙে বৃষ্টি ঝরবে—এমন পূর্বাভাস দিচ্ছে আবহাওয়া বিভাগ। সেসব ছাপিয়ে সিরিজ জয়ের পূর্বাভাসই কি দিচ্ছেন প্রত্যয়ী দুই ক্রিকেটার মাহমুদ উল্লাহ ও নাসির। ছবি : মীর ফরিদ, চট্টগ্রাম থেকে

খুলে গেছে স্বর্গের দুয়ার! চট্টগ্রামের আকাশ চুইয়ে বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই। অক্লান্ত।

অবিরাম। ক্রিকেটের জন্য খুব উপযুক্ত আবহ নয়, তবে বৃহত্তর ক্যানভাসে এমন দিন আসলে সবার। তা আবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে বেশি করে বোধহয় আর কারো নয়। সে কারণেই হয়তো সেই কবে এই মহর্ষি লিখে গেছেন, ‘এমন দিনে মন খোলা যায়। ’

তবু বাংলাদেশ-ইংল্যান্ড তৃতীয় ওয়ানডের আগের দিন ‘মন খুললেন’ না স্বাগতিক অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা! প্রথম ওয়ানডেতে মুঠো ফসকে বেরিয়ে যায় জয়। জেতা ম্যাচ হেরে আসার পর স্তব্ধ হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু নিস্তব্ধ হয়ে না থেকে পরের ম্যাচে প্রবল ঝংকারে প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত জয়ে সিরিজে ফেরায় সমতা। কিন্তু ঢাকার সেই খেলার রেশ তো কাটছে না কিছুতেই! বৃষ্টির পাশাপাশি বিতর্কও তাই যেন চট্টগ্রামের সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচের আবহসংগীত। যদিও মাশরাফি ব্যাপারটিকে খুব গুরুত্ব দিতে চাইলেন না। কে জানে, হয়তো ওই ‘মন খুললেন’ না আর কি!

দিন দুয়েক আগের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে জস বাটলারের উইকেট পাওয়ার পর বুনো উদ্‌যাপন করে বাংলাদেশ, যা পছন্দ হয়নি ইংল্যান্ডের। এর ঝাঁজ তাই টেনে নিয়ে যায় খেলা শেষেও। যেখানে জনি বেয়ারস্টোর সঙ্গে তামিম ইকবালের হাত মেলানোর সময় হয়ে যায় আরেক চোট। পেছন থেকে বেন স্টোকস এসে ধাক্কা মারেন বাংলাদেশ ওপেনারকে। সাকিব আল হাসান এসে শান্তির সাদা পতাকা না ওড়ালে তা গড়াতে পারত আরো অনেক দূর।

কাল চট্টগ্রামের জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে এসে ইংল্যান্ডের মঈন আলী বলে যান, দ্বিতীয় ওয়ানডের ঘটনা শেষ ম্যাচে তাতিয়ে রাখবে দুই দলকে। ম্যাচটি সবাই জিততে চাইবে আরো বেশি করে। কিন্তু ঘণ্টা দেড়েক পর গণমাধ্যমের মুখোমুখি হওয়া মাশরাফির মত অবশ্য ভিন্ন। ঘটনাটিকে সিরিজ নির্ধারণী ওয়ানডেতে টেনে আনছেন না বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘আমরা পুরোপুরি স্বাভাবিক আছি। শতভাগ নিশ্চিত যে আমাদের দল ওটা নিয়ে ভাবছে না। ভাবছি, কিভাবে ভালো খেলা যায়। আমি নিশ্চিত, ছেলেরা সবাই চেষ্টা করবে সুস্থির থাকতে এবং সেরা খেলাটা খেলতে। ’ ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিনিধি হয়ে থাকা স্কাই স্পোর্টসের সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবেও ভিন্ন কিছু বের হয়নি তাঁর মুখ থেকে, ‘দেখুন, আমরা উইকেট পাওয়ার পর স্রেফ উদ্‌যাপন করছিলাম। এটাকে স্বাভাবিকভাবেই নেওয়া উচিত। সব দলই উইকেট পেলে উদ্‌যাপন করে। তবে ম্যাচ রেফারি হয়তো ভেবেছেন, উদ্‌যাপনটা কোড অব কন্ডাক্টের বাইরে হয়ে গেছে। কিন্তু আমরা তা বোঝাতে চাইনি। এখন যা হয়েছে, হয়ে গেছে। আমরা কালকের ম্যাচে মন দিচ্ছি। ’ প্রতিপক্ষের কাছে দুঃখ প্রকাশ করা কিংবা ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নে কণ্ঠে দৃঢ়তা ঢেলে যোগ করেন, ‘আমরা তো কোনো ভুল করিনি। দুঃখ প্রকাশ করার তাই কিছু নেই। ’ তাঁর ও সাব্বির রহমানের ম্যাচ ফি কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্ত তাহলে মেনে নিচ্ছেন কি না—এমন খোঁচানো প্রশ্নেও মাশরাফির শান্ত জবাব, ‘এখন সেটি মেনে নেওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প তো নেই। ’

এভাবেই বিতর্ককে এক পাশে সরিয়ে রাখেন মাশরাফি। একবার, শুধু দুটি বাক্যে মন খোলেন কিছুটা, ‘পেছন ফিরে তাকালে, ১৬ বছরে অনেক কথা শুনে খেলেছি। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা অনেক সময়ই অনেক কিছু শুনেছে। ’ রবি ঠাকুরের ‘নামাতে পারি যদি মনোভার’-এর প্রতিধ্বনি তাঁর ওই দুই বাক্যে। মনের কোণে আলগোছে পড়ে থাকা গত দেড় দশকের তাচ্ছিল্য-উপেক্ষার কথা যেন মনে করিয়ে দেন অধিনায়ক। পাশাপাশি এ দেশের ক্রিকেট যে সেই হাঁটি হাঁটি পা পা যুগ পেরিয়ে এসেছে, তার অনুরণনও স্পষ্ট। এখন লাল-সবুজের ক্রিকেট সৈনিকরা মাঠে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে জানে। পরাক্রম প্রতিপক্ষের চোখে চোখ রেখে পারে কথা বলতে। তবে ক্রিকেটের মূল স্পিরিট থেকে আবার বিচ্যুত হয় না। সে কারণেই মাশরাফি পরক্ষণে বলতে পারেন, ‘এখানে আমি অন্যায় কিছু দেখি না। সাময়িক উত্তেজনায় অনেক কিছু হতে পারে। তবে তা নিয়ে বাড়াবাড়ির মানে দেখি না। সব কিছুর ওপরে ক্রিকেট ভদ্রলোকের খেলা। আমরা চেষ্টা করব মাঠের খেলা ঠিকমতো খেলতে। ’

মাঠের সেই খেলায় বৃষ্টির চোখরাঙানি প্রবলভাবে। দুই দিন ধরেই চট্টগ্রাম ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টিতে। যে কারণে এ দুই দিন স্টেডিয়ামের পিচ কাভারও সরানো যায়নি। কাল বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পক্ষ থেকে ইংল্যান্ড অ্যান্ড ওয়েলস ক্রিকেট বোর্ডের (ইসিবি) কাছে প্রস্তাব পর্যন্ত পাঠানো হয় রিজার্ভ ডের। কিন্তু তাতে সায় দেয়নি ইসিবি। টানা বৃষ্টিতে কাল খোলা স্টেডিয়ামে অনুশীলন করতে পারেনি কোনো দল। ইনডোরে সারতে হয় শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। তৃতীয় ওয়ানডের সামনে তাই বড় প্রশ্নবোধক চিহ্ন। প্রকৃতি নিয়ে চিন্তিত না হয়ে উপায় কী মাশরাফির, ‘বৃষ্টি অবশ্যই চিন্তার ব্যাপার। কাল আবহাওয়া কেমন থাকবে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। বৃষ্টি হলে টস একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। খেলা চলার সময় বৃষ্টি হতে থাকলে নানা সমীকরণ করতে হয়। এটা দুই দলের জন্যই বিরক্তিকর। অমন হলে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে যারা ঠিক সিদ্ধান্ত নেবে, ম্যাচ তাদের দিকে হেলে পড়বে। ’ সিরিজের আবহে ইংল্যান্ড অধিনায়ক ফেভারিটের সিংহাসন ছেড়ে দেন বাংলাদেশের জন্য। যদিও তা সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান বাংলাদেশ অধিনায়কের। শেষ ম্যাচের আগেও সুর বদলায় না মাশরাফির কণ্ঠে, ‘আমরা নিজেদের ফেভারিট ভাবছি না। সিরিজ শুরুর আগেই বলেছিলাম, ইংল্যান্ড ভালো খেলছে। গত দুই ম্যাচেও ওরা ভালো খেলেছে। আমরা বরং নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খেলতে পারিনি। ’

তা পারেনি বাংলাদেশ। তবু দ্বিতীয় ওয়ানডেতে ফেরে প্রবল বিক্রমে। ব্যাটে-বলে অধিনায়কের পারফরম্যান্সে সেখানে বাঘের হুংকার। আজ যদি মাশরাফির দেখানো পথ অনুসরণ করতে পারেন সতীর্থরা, তাহলে? টানা সাত ওয়ানডে সিরিজ জয়ের আনন্দে ভাসবে বাংলাদেশ।

এই সিরিজের আবহসংগীত ছিল নিরাপত্তা। দ্বিতীয় ম্যাচ শেষে দুই দলের বিতর্ক। এর সহাবস্থানে তৃতীয় ওয়ানডের আবহে প্রকৃতি। সব ছাপিয়ে এটিই হয়ে যেতে পারে আজকের দ্বৈরথের মূল সুর। অভিমানী কিশোরীর মতো যে গাল ফুলিয়ে রেখেছে চট্টগ্রামের আকাশ! সেখানে সূর্যের হাসিতে খুশির টোল পড়ছে না কিছুতেই।

এ পক্ষে মাশরাফি-তামিম-সাব্বির, প্রতিপক্ষে বাটলার-বেয়ারস্টো-স্টোকসের ওপর আজ নিশ্চিতভাবেই থাকবে অযুত-নিযুত চোখ। তবে এর চেয়েও বেশি করে চট্টগ্রামের ওই আকাশের দিকে। খেলাটা আগে মাঠে গড়াতে হবে তো!


মন্তব্য