kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


৩০ জঙ্গির প্রোফাইল যাচ্ছে ইন্টারপোলে

সরোয়ার আলম   

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



৩০ জঙ্গির প্রোফাইল যাচ্ছে  ইন্টারপোলে

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একের পর এক অভিযানে দিশাহারা হয়ে পড়েছে জঙ্গি সংগঠনগুলোর সদস্যরা। তা সত্ত্বেও আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ জঙ্গিরা নাশকতার ছক কষছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য এসেছে।

তথ্য পাওয়ার পর র‌্যাব-পুলিশকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ইতিমধ্যে পলাতক বেশ কয়েকজন জঙ্গির প্রোফাইল তৈরি করা হয়েছে। তাতে ৩০ জনের নাম রয়েছে। তাদের ধরতে পুলিশের আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। তালিকাটি ইন্টারপোলের সদর দপ্তরে পাঠানো হচ্ছে বলে পুলিশ সূত্র নিশ্চিত করেছে। আর জঙ্গিবাদের সঙ্গে কোনো ধরনের সম্পর্ক আছে কি না তা যাচাই করতে ৪২টি সংগঠন সম্পর্কে বিশদ তথ্য সংগ্রহ করছেন পুলিশ-র‌্যাবসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা।

এ প্রসঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অভিযান শুরু হওয়ায় জঙ্গি সংগঠনগুলোর মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। জঙ্গিদের কোমর ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। মরণ কামড় দেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা সফল হবে না। জঙ্গি সংগঠন ও তাদের সদস্যদের সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আইজিপি আরো বলেন, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের স্থান হবে না। তাদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার চেষ্টা করবে তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবেই।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন,  ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান আরো বেগবান করা হচ্ছে। সম্প্রতি আমাদের অভিযানে জঙ্গিরা দিশাহারা হয়ে পড়েছে। তারা যাতে আর কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য আমরা সতর্ক আছি। ’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২১ জুলাই টঙ্গীর মুক্তারপাড়া সড়কের এ-ব্লকের ৭৪ নম্বর বাড়িতে র‌্যাব বিশেষ অভিযান চালায়। অভিযানে দক্ষিণাঞ্চলে জেএমবির ভারপ্রাপ্ত আমির মাহমুদুল হাসান ওরফে তানভীর, রংপুর অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা আশিকুল আকবর ওরফে আকাশ, শরীয়তউল্লাহ শুভ ও নাজমুস শাকির ওরফে তাহমিদকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে জেএমবিকে সংগঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। পুলিশ একাধিকবার দাবি করেছে, গুলশান ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলার সঙ্গে নব্য জেএমবি জড়িত। তা ছাড়া রংপুরে জাপানের নাগরিক হত্যা, ময়মনসিংহের ত্রিশালে তিন জেএমবি-জঙ্গি ছিনতাই, আশুলিয়ায় ব্যাংক ডাকাতি ও কনস্টেবল হত্যা, দিনাজপুরে এক ইতালীয়কে হত্যার চেষ্টা, রাজধানীতে প্রকাশনা সংস্থায় হামলা ও এক প্রকাশককে হত্যা এবং বগুড়ায় শিয়া মসজিদে গুলি করে মুয়াজ্জিন হত্যাকাণ্ডেও জেএমবি ও এবিটি জড়িত। পুরান ঢাকায় তাজিয়া মিছিলে বোমা হামলায়ও জেএমবি জড়িত।

সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ২ অক্টোবর বর্ধমানের খাগড়াগড়ের পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা নুরুল হাসান চৌধুরীর বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে শাকিল আহমেদ মোল্লা ও সোবহান মণ্ডল নামের দুজন নিহত হয়। ৭ অক্টোবর উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাটের তালপুকুর থেকে তিন বাংলাদেশি ও দুই ভারতীয়কে গ্রেপ্তার করা হয়। শাকিলের স্ত্রী রাজিয়া ও সোবহানের স্ত্রী আলিমা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে বলেন, বিস্ফোরণের ঘটনার আগে বাংলাদেশে নাশকতার জন্য চার দফা বোমা পাঠায় জেএমবির দলটি।

গুলশানের ঘটনার পর ব্যাপক নড়েচড়ে বসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ঢাকাসহ সারা দেশে পুলিশ ও র‌্যাব একের পর এক অভিযান চালায়। অভিযান চালাতে গিয়ে জঙ্গিদের সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। গত তিন মাসে ৩৪ জন জঙ্গি মারা গেছে গোলাগুলিতে। আর গ্রেপ্তার হয়েছে প্রায় দেড় শ জনের মতো।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের প্রধান মনিরুল ইমলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জঙ্গিদের আস্তানাগুলো আমরা ধ্বংস করে দিচ্ছি। হামলা চালানোর সক্ষমতা নেই জঙ্গি সংগঠনগুলোর। তারপর আমরা তাদের ব্যাপারে সতর্ক আছি। পলাতক জঙ্গিদের ধরার চেষ্টা চলছে। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, অভিযানে জঙ্গিরা দিশাহারা হয়ে পড়েছে। অনেক জঙ্গি আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কয়েকজন আত্মসমর্পণ করেছে। পলাতক জঙ্গিরা মরণ কামড় দিতে পারে বলেও তথ্য আছে। এ জন্য আমরা সতর্ক আছি।

ইন্টারপোলে যাচ্ছে ৩০ জঙ্গির প্রোফাইল : আত্মগোপনে থাকা ৩০ জঙ্গিকে ধরতে ইন্টারপোলের কাছে আবেদন করছে পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের মধ্যে রয়েছে—নব্য জেএমবির অন্যতম নেতা চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হক জিয়া, শাহাদত ওরফে মানিক, গুলশান হামলার সমন্বয়ক কমান্ডার নুরুল ইসলাম মারজান, বাদল মিয়া, আজাদুল কবিরাজ, আবদুল খালেক, শরিফুল ইসলাম খালিদ, মামুনুর রশিদ রিপন, সাদ্দাম ওরফে রাহুল, বিপ্লব ওরফে আনসারী, গোলাম রব্বানী, হিমেল, আবদুস সাকিব ওরফে মাস্টার সাকিব, জাহাঙ্গীর ওরফে রাজীব গান্ধী, মাসুদ, অভি, সাব্বির, আতিক, মোত্তামিন, তাপস, সোহাগ, ইমরান, হাসান, মিজান আবদুল্লাহ ওরফে আসিফ ওরফে আজওয়াদ প্রমুখ।

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, জঙ্গিদের প্রোফাইল চলতি সপ্তাহের মধ্যেই ইন্টারপোলের কাছে পাঠাচ্ছি। ৩০ জনের মধ্যে বেশ কয়েকজন দেশে আছে। বাকিরা ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকায় পালিয়ে আছে।

৪২ সংগঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ চলছে : জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে ৪২টি সংগঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের এক কর্মকর্তা। যেসব সংগঠনের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে সেগুলো হলো—খতমে নবুয়ত আন্দোলন, জামিউতুল ফালাহ, ইসলামিক সলিডারিটি ফ্রন্ট, আরাকান রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন, আরাকান পিপলস আর্মি, আরাকান মুজাহিদ পার্টি, মিয়ানমার লিবারেশন ফোর্স, রোহিঙ্গা লিবারেশন ফোর্স, রোহিঙ্গা ইনডিপেনডেন্স পার্টি, রোহিঙ্গা প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্ট, মুসলিম মিল্লাত, আল হারাত-আল-ইসলামিয়া, ওয়ার্ল্ড ইসলামিক ফ্রন্ট, তৌহিদী জনতা, জুমা’আতুল আল সাদাত, তামির উদ দ্বীন বাংলাদেশ, জামাত-আস-সাদাত, আল খিদমত, হিজবুল মাহদি, হিজবুল্লাহ ইসলামী সমাজ, দাওয়াতি কাফেলা, বাংলাদেশ এন্টি টেররিস্ট পার্টি, আল মারকাজুল আল ইসলামী, আল ইসলাম মার্টেনস ব্রিগেড, সত্যবাদ, মুসলিম মিল্লাত, শরিয়া কাউন্সিল, জমিয়ত আহলে হাদিস আন্দোলন, আহলে হাদিস আন্দোলন বাংলাদেশ, তাজির বাংলাদেশ, হায়াতুর ইলাহা, ফোরকান মুভমেন্ট, জামিউতুল এহজিয়া এরতাজ, আনজুমানে তালামিজ ইসলামিয়া, কলেমার জামাত, তাজির বাংলাদেশ, সাহাবা পরিষদ, কাতেল বাহিনী, মুজাহিদীন-ই-তাজিম, এশার বাহিনী, আল ফাহাদ, হরকাতুল মুজাহিদীন ও জাদিদ আল কায়দা।


মন্তব্য