kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দ্বিতীয় বিতর্কেও ট্রাম্পকে ছাড়িয়ে হিলারি

নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি   

১১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



দ্বিতীয় বিতর্কেও ট্রাম্পকে ছাড়িয়ে হিলারি

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইসে ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে দ্বিতীয় দফা বিতর্কে হিলারি ক্লিনটন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী ইতিহাসে এমন বিতর্ক আগে কখনো দেখা যায়নি। পুরো ৯০ মিনিট প্রার্থীরা একে অপরকে মিথ্যুক, শয়তান, অবিশ্বস্ত, অযোগ্য বলে অভিহিত করে গেছেন।

যেন নীতি, আদর্শ বা পরিকল্পনা নয়, ব্যক্তিগত আক্রমণ করতেই মঞ্চে উঠেছেন তাঁরা। রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প একপর্যায়ে তাঁর ডেমোক্র্যাট প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে জেলে পাঠাবেন বলেও হুমকি দেন। হিলারি পাল্টা জবাব দেন, মূল প্রচার থেকে মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন ট্রাম্প।

মিসৌরির সেন্ট লুইসের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানীয় সময় রবিবার সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় সোমবার সকাল ৭টায়) এ বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। সঞ্চালনায় ছিলেন এবিসি টিভির মার্থা রাডেজ এবং সিএনএনের অ্যান্ডারসন কুপার্স। দর্শক সারিতে দুই প্রার্থীর পরিবার এবং কাকে ভোট দেবেন সিদ্ধান্ত নেননি এমন ভোটাররা উপস্থিত ছিলেন।

বিতর্কজুড়ে চলে ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং পরস্পরকে অগ্রহণযোগ্য অভিধায় ভূষিত করার প্রতিযোগিতা। এমনকি বিতর্ক শুরুর আগে রীতি মেনে হাতও মেলাননি তাঁরা। অস্থিরচিত্ত ট্রাম্প অধৈর্যভাবে পুরো মঞ্চে হেঁটে বেড়ান, যেন শারীরিকভাবেও হিলারিকে কোণঠাসা করতে চাইছেন তিনি। যদিও বিতর্কের ৪৮ ঘণ্টা আগে প্রকাশিত ভিডিওর কারণে ট্রাম্প নিজেই তীব্র চাপের মধ্যে ছিলেন। এক দশক আগের এই ভিডিওতে ট্রাম্পকে নারীদের সম্পর্কে অশ্লীল মন্তব্য করতে শোনা যায়। ট্রাম্প বলেন, তাঁর মতো তারকারা যেকোনো নারীর সঙ্গে যা ইচ্ছা তাই করতে পারেন এবং নারীরাও এতে বাধা দেন না। এই ভিডিও প্রকাশের পর বহু রিপাবলিকান নেতা তাঁকে প্রার্থিতা ছেড়ে দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁদের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জন ম্যাককেইন ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিৎসা রাইসও রয়েছেন।

বিতর্কে ভিডিও প্রসঙ্গে ক্ষমা চান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ওগুলো ছিল নেহাতই কথার কথা। খেলোয়াড়রা যেমন লকার রুমে বলে থাকেন। তিনি এমন মানুষ নন। তবে ভিডিও প্রসঙ্গ এত সহজেই ইতি টানতে দেননি হিলারি। তিনি বলেন, ‘নারীদের সম্পর্কে ট্রাম্পকে আমরা যেভাবে কথা বলতে দেখলাম ও শুনলাম, এ প্রসঙ্গে তাঁর যে ভাবনা বা যা তিনি করেন, এরপর তাঁর এই দাবি (ট্রাম্প এমন নন) অবান্তর। আমি মনে করি, তিনি কী তা সবার কাছেই স্পষ্ট। আর এটাই শুরু নয় প্রথম বিতর্কের পর তিনি প্রায় এক সপ্তাহ পার করেছেন এক সাবেক বিশ্বসুন্দরীকে আক্রমণ করে। রাত ৩টায় উঠেও তাঁকে নিয়ে টুইট করেছেন তিনি। ’ হিলারি বলেন, এবারের নির্বাচন ডেমোক্রেটিক ও রিপাবলিকান পার্টির আর যেকোনো নির্বাচনের মতো নয়। ‘আমি কখনো কোনো প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলিনি। তাঁদের সঙ্গে আমার আদর্শ বা নীতিগত মতভেদ থাকতে পারে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিষয়টি ভিন্ন। তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট ও কমান্ডার ইন চিফ হওয়ার যোগ্য নন। ’

ট্রাম্প ভিডিও প্রসঙ্গে ক্ষমা চাইলেও হিলারির স্বামী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রসঙ্গ টানেন। তিনি বলেন, ‘আমি তো শুধুই কিছু শব্দ বলেছি, ক্লিনটন এসব করে দেখিয়েছেন। ’ জবাবে হিলারি বলেন, ‘এ ধরনের কথা শুনলে আমি বরাবরই আমার বন্ধু মিশেল ওবামার (ফার্স্ট লেডি) একটি মন্তব্যের কথা মনে পড়ে। তিনি বলেছেন, যখন তাঁরা নিচে নামবেন, আমরা উপরে উঠব। ’

এই বিতর্কে ক্লিনটনের সাবেক চার ‘বান্ধবী’ উপস্থিত ছিলেন। ট্রাম্প ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের দাওয়াত দিয়ে নিয়ে আসেন। শুধু তাই নয়, বিতর্ক শুরুর আগে তাঁদের নিয়ে একটি সংবাদ সম্মেলনেরও আয়োজন করেন তিনি। যেখানে ক্লিনটন এই চার নারীর সঙ্গে অতীতে কী আচরণ করেছেন তা তুলে ধরা হয়।

হিলারি বলেন, ট্রাম্পের উচিত আমেরিকানদের কাছে ক্ষমা চাওয়া। শুধু জনগণ নয়, প্রেসিডেন্ট ওবামা, নিহত সেনা পরিবার এবং অন্যদের কাছেও তাঁর ক্ষমা চাওয়া উচিত। ‘তিনি যা বলেছেন, তার দায়িত্ব তাঁকেই নিতে হবে। ’ তবে সে পথে হাঁটেননি ট্রাম্প। উল্টো তিনি বলেন, নির্বাচিত হলে তিনি হিলারির ই-মেইল বিতর্ক তদন্তে বিশেষ আইনজীবী নিয়োগ করে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে জেলে পাঠাবেন। এ সময় তিনি হিলারিকে ‘শয়তান’ বলেও সম্বোধন করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘এই নারী শুধুই কথা বলেন, কোনো কাজ করেন না। ’

নীতি বা পরিকল্পনাসংক্রান্ত আলোচনায় ফেরাতে রীতিমতো গলদঘর্ম হয় সঞ্চালকদের। তবে বিতর্কে ট্রাম্প স্বীকার করেন যে বহু বছর আয়কর দেননি তিনি। নিজেকে বুদ্ধিমান দাবি করে তিনি বলেন, আইনের বৈধ সুবিধাই তিনি নিয়েছেন। সিরিয়া প্রসঙ্গে ট্রাম্পের কাছে জানতে চাওয়া হয়। এ সময় তাঁর রানিংমেট মাইক পেন্সের একটি মন্তব্যও টানেন মার্থা রাডেজ। তবে সবাইকে বিস্মিত করে ট্রাম্প বলেন, এ নিয়ে তাঁর (মাইক পেন্স) সঙ্গে আমার কথা হয়নি। আমি একমত নই। ’ এরপর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বেশ কয়েকটি প্রসঙ্গেও ট্রাম্পকে ইতস্তত করতে দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে তাঁর প্রস্তুতিহীনতাও স্পষ্ট হয়ে যায়।

তবে বিতর্কের একপর্যায়ে ধৈর্যহারা হতে দেখা যায় হিলারিকেও। ট্রাম্পের বারবার আক্রমণে অসহিষ্ণুতা দেখান তিনি। ট্রাম্পকে বলেন, আপনি বড় সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন আমি জানি। এ কারণেই প্রচার বা আপনাকে যেসব রিপাবলিকান ছেড়ে যাচ্ছেন তাঁদের নিয়ে কথা বলতে চাইছেন না।

বিতর্কের একপর্যায়ে প্রশ্নের জবাব কাকে দিয়ে শুরু করা যায় এ নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তি তৈরি হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি ভদ্রলোক। হিলারি, আপনি বলুন। ’ তবে মুখে এটুকু বলা ছাড়া ট্রাম্প আর কোথাও তাঁর ভদ্রতা রক্ষার দায় অনুভব করেননি। ট্রাম্প তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রসঙ্গে বলেন, ‘তাঁর নৈতিকতায় সমস্যা আছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হওয়ার যোগ্য নন। তিনি মিথ্যাবাদী। ’ ট্রাম্প হুমকি দেন নির্বাচনের যে এক মাস বাকি এই সময়টিকে তিনি হিলারির জন্য নরক বানিয়ে ছাড়বেন।

শেষের আধাঘণ্টায় ট্রাম্পকে হতাশাগ্রস্তদের মতো আচরণ করতে দেখা যায়। সঞ্চালকদের পক্ষপাত নিয়ে অভিযোগ করেন। ট্রাম্প বলেন, সঞ্চালকরা তাঁকে কথা বলতে দিচ্ছেন না। হিলারি প্রশ্নের জবাব দেওয়ার জন্য বেশি সময় পাচ্ছেন।

বিতর্কজুড়ে দুই প্রার্থী যেন নর্দমার কাদা ঘেঁটে গেছেন। আলোর একটি মাত্র ঝলক দেখা গেছে বিতর্কের একেবারে শেষ পর্যায়ে। এ সময় এক দর্শক দুই প্রার্থীকে পরস্পর সম্পর্কে একটি ইতিবাচক মন্তব্য করার আহ্বান জানান। জবাবে হিলারি ট্রাম্পের সন্তানদের প্রশংসা করেন। আর ট্রাম্প বলেন হিলারির হাল না ছাড়া চরিত্রের কথা। তিনি হিলারিকে যোদ্ধা বলে মন্তব্য করেন। এরপর শুরুতে তাঁরা যা করেননি তা করে বিতর্কের মঞ্চ ছাড়েন। হাত মেলান হিলারি ও ট্রাম্প। বিতর্ক শেষে জরিপগুলো বলছে, পাল্লা এবারও হিলারির দিকে ভারী। যদিও প্রথম বিতর্কের তুলনায় তাঁকে অনুজ্জ্বল দেখাচ্ছিল। আর এই বিতর্ক থেকে ট্রাম্প যা চেয়েছিলেন, পেয়েছেন। নির্বাচনের লড়াইয়ে টিকে থাকলেন তিনি। ভিডিও বিতর্কের পর এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন।

ইউগভ ও সিএনএন/ওআরসি এ নিয়ে জরিপ চালিয়েছে। ইউগভের অনলাইন জরিপে দেখা যায়, নিবন্ধিত ভোটারদের দৃষ্টিতে দ্বিতীয় দিনের বিতর্কে অল্পের জন্যই জয় পেয়েছেন হিলারি। ৪৭ শতাংশ ভোটার মনে করেন হিলারিই ভালো করেছেন। আর ৪২ শতাংশ ভোটার মনে করেন ট্রাম্প বিতর্কে এগিয়ে ছিলেন।

অবশ্য সিএনএন/ওআরসির জরিপে বলা হয়েছে এবারের বিতর্কেও হিলারি বেশ ভালো ব্যবধানেই জয়ী হয়েছেন। জরিপ অনুযায়ী, ৫৭ শতাংশ মনে করেন, হিলারি জয়ী হয়েছেন। ৩৪ শতাংশ মনে করেন, ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন।

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলার শুনানি তারিখ ধার্য : ১৯৯৪ সালে ১৩ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে করা মামলার শুনানির তারিখ ধার্য করেছেন আদালত। ফেডারেল আদালতের বিচারক রনি আব্রামস আগামী ১৬ ডিসেম্বর শুনানির দিন ধার্য করেন। এ বছরের শুরুর দিকে নিউ ইয়র্কের ফেডারেল আদালতে ওই অভিযোগ দাখিল করা হয়েছিল। গত ৩০ সেপ্টেম্বর সেটি পুনর্দাখিল করা হয়েছে।

এর আগে ট্রাম্পের সাবেক স্ত্রী ইভানা তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদের সময় ১৯৯১ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ‘ধর্ষণের’ অভিযোগ তুলেছিলেন।


মন্তব্য