kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

মাশরাফিতেই লণ্ডভণ্ড ইংল্যান্ড

বাঘের মতো ফেরা

মাসুদ পারভেজ   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বাঘের মতো ফেরা

আরেকটি উইকেটের পতন ইংল্যান্ডের। মাশরাফি-তাসকিনদের বাঁধনহারা উচ্ছ্বাস। ছবি : মীর ফরিদ

মাত্র দেড় দিনের পুরনো ভূত না আবার ঘাড় মটকায়! ক্ষণে ক্ষণে সেই শঙ্কা জাগছিলই। প্রথম ওয়ানডেতে তরুণ মোসাদ্দেক হোসেন আর কাল সাব্বির রহমানের আউট হওয়ার ধরন যে কাছাকাছিই।

তাও আবার বোলার সেই জ্যাক বলই। দেড় দিন আগে হারতে হারতেও ইংলিশদের জিতে যাওয়ার নায়কের সামান্য লাফিয়ে ওঠা বল দুই ম্যাচে ভিন্ন দুজনের বিদায়ের কারণ। অবশ্য ব্যাটের নিচে লেগে বল উইকেটে আছড়ে পড়াই আশঙ্কার শেষ লক্ষণ নয়।

আরো আছে। প্রথম ওয়ানডেতে ৭৯ রান করে সাকিব আল হাসান আউট হওয়ার পর বাংলাদেশ তাসের ঘরের মতো ভেঙে না পড়লে জেতারই কথা ছিল। তবে কাল ২০১৫ বিশ্বকাপের অ্যাডিলেড ওভালের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে আনতে ৭৫ রান করে মাহমুদ উল্লাহ আউট হওয়ার সময় স্বাগতিকদের অবস্থা ভীষণ নাজুক। ১৬১ রানে ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে তাঁর বিদায়ে যে তখন স্বাগতিকদের দুই শ পেরোনো নিয়েও সংশয়।

সেই সংশয় উবেই গেল না শুধু, বাংলাদেশ আড়াই শর কাছাকাছিও (২৩৮/৮) গেল। এরপর রান তাড়ার শুরুতে ইংলিশদেরও এমন হাল হলো যে উল্টো তাদের ঘাড় মটকে দিয়েই স্বাগতিকরা সিরিজে ফিরল। আর ব্যাটে-বলে সেই ‘ঘাড় মটকানো ভূত’ হয়ে উঠতে চাইলেন খোদ মাশরাফি বিন মর্তুজাই। দেখা দিতে চাইলেন সেই পুরনো চেহারায়, যে চেহারা বাংলাদেশকে দেখিয়েছে বহু স্মরণীয় জয়ের মুখও। দেখাল কালও। ৩২ বল বাকি থাকতেই ৩৪ রানের অনায়াস জয় বাংলাদেশের আরেকটি সিরিজ জয়ের সম্ভাবনার দ্বারও খুলে রাখল।  

তিন ছক্কা ও দুই বাউন্ডারিতে মাত্র ২৯ বলে ৪৪ রানের ঝোড়ো ইনিংসে লড়াই করার পুঁজি দিয়ে যাওয়া অধিনায়ক তাঁর ৬ ওভারের প্রথম স্পেলেই ইংল্যান্ডের ব্যাটিং লাইনও লণ্ডভণ্ড করে দেন। প্রথম ওয়ানডেতে বাংলাদেশের ফিল্ডারদের সৌজন্যে বারবার জীবন ফিরে পেয়ে সেঞ্চুরি করা মারদাঙ্গা বেন স্টোকসকে (০) কাল যখন বোল্ড করে খালি হাতে ফেরান, তখন জস বাটলারের দল ২৬ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে ধুঁকছে। এর মধ্যে তিনটি শিকারই মাশরাফির আর তাঁর প্রথম স্পেলটিও রীতিমতো বাঁধাই করে রাখার মতো : ৬-০-২১-৩!

ইংলিশদের ব্যাটিং মেরুদণ্ড ভাঙার কাজটিও ততক্ষণে সারা। ‘কুঁজো’ ইংল্যান্ড তবু দাঁড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। জোনাথন বেয়ারস্টো আর বাটলারের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় পঞ্চম উইকেটে ৭৯ রানের পার্টনারশিপও গড়া হয়ে যায়। তাতে শুরুতে চেপে ধরার পর চাপ কিছুটা হালকা হয়ে যাওয়ারও বড় ভূমিকা। এ ক্ষেত্রে কিছুটা দায় তো তাসকিন আহমেদেরও আছে। প্রথম দুই ওভারে খরচ করে বসেন ১৯ রান। অবশ্য খরুচে তাসকিন যদি মুদ্রার এপিঠ হয়ে থাকেন, তাহলে একই ম্যাচে মুদ্রার ওপিঠের সাফল্যের দেখাও ইদানীং মিলছে তাঁর বোলিংয়ে।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেটির কথাই ভাবুন না। নিজের প্রথম ৬ ওভারে ৪৯ রান খরচ করার পর ম্যাচের অন্তিম মুহূর্তে বোলিংয়ে ফিরেই দুই ওভারে ৪ উইকেট! এই তরুণ ফাস্ট বোলারের কালকের বোলিংয়ের চিত্রনাট্যও তাই। প্রথম ২ ওভারের পর অধিনায়ক তাঁকে সরিয়ে নেন। এরপর প্রান্ত বদলে আবার ফিরেই তৃতীয় বলে সাফল্য। ৫ ওভারের দ্বিতীয় স্পেলে ১৮ রান খরচায় ৩ উইকেট তুলে নেওয়া এ তরুণই ইংল্যান্ডের বিপর্যয় সামলে নিতে থাকা জুটি ভেঙেছেন। বেয়ারস্টোকে (৩৫) উইকেটের পেছনে মুশফিকুর রহিমের গ্লাভসে ভরে বিচ্ছিন্ন করেন বাটলারের থেকে। এরপর ৫৭ বলে ৭ বাউন্ডারিতে ৫৭ রানের ইনিংস খেলা ইংলিশ অধিনায়ককেও দেখিয়েছেন সাজঘরের পথ। সেই সিদ্ধান্তের জন্য ‘রিভিউ’ নিয়ে কিছুক্ষণ অপেক্ষায় থাকতে হয়েছে এই যা!

বেয়ারস্টো আর বাটলারের মাঝখানে মঈন আলীকে (৪) তুলে নেওয়া নাসির হোসেনের কথাও না বললেই নয়। ম্যাচের পর ম্যাচ শুধুই পানি টেনে যাওয়া এ ক্রিকেটারকে খেলানোটা গণদাবিতেই রূপ নিতে চলেছিল যেন। কিন্তু আগের রাতেও বাঁহাতি স্পিনার মোশাররফ হোসেনের জায়গায় তাঁর খেলা নিয়ে ধোঁয়াশা ছিল। তবে ১১ মাস পর অবশেষে তিনি ওয়ানডে খেলার সুযোগ পেলেন। সুযোগ পেয়েই ব্যাটে-বলে তাঁর অবদান রাখার কথা উল্লিখিত না হলে বাংলাদেশের সিরিজে ফেরার গল্পও অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

যেমন বলতে হবে ব্যাটিংয়ে অনুজ্জ্বল সাকিবের অন্যভাবে ঔজ্জ্বল্য ছড়ানোর কথাও। নাসিরের অফস্পিনে পুল করতে গিয়েছিলেন মঈন, বল যাওয়ার কথা মিডউইকেটে। কিন্তু ব্যাটের ওপরের কানা নেওয়ায় বল চলে যায় অফসাইডে। শর্ট কাভারে দাঁড়ানো সাকিব সেখান থেকে অনেকটা পেছনে দৌঁড়ে গিয়ে নেন দুর্দান্ত এক ক্যাচ। এর আগে বোলিংও ওপেন করা এ অলরাউন্ডার অধিনায়কের সঙ্গে ইংলিশ ব্যাটিংয়ের ওপর শুরুর চাপও বাড়িয়েছেন। সেই সূত্রে মিলেছে ওয়ানডাউনে ব্যাট করতে নামা বেন ডাকেটের উইকেটও।

শুরুর চাপ বাংলাদেশের ওপরও ছিল। প্রথম ওয়ানডের সেঞ্চুরিয়ান ইমরুল কায়েস (১১) এদিন থিতু হতে পারেননি। তামিম ইকবালও (১৪) নন। ১ রানের মধ্যে দুজনের বিদায়ের ধরনও একই, ইংলিশরা শর্ট বলে এই দুটি শিকার ধরার ফাঁদ পেতে সফলও। নেমেই দুই বাউন্ডারিতে আশা জাগানো মুশফিকুর রহিমের (২১) দ্রুত থেমে যাওয়াও ইদানীং নিয়ম হয়ে উঠতে চলেছে! তবে মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই ক্রিস ওকসকে ফ্লিক করে মারা বাউন্ডারিতে ছন্দটা ধরে নেওয়া মাহমুদ উল্লাহর ব্যাটে অ্যাডিলেড ওভালের পুনরাবৃত্তির আশাও জেগেছিল।

সেই আশা হতাশায় রূপ নিতে নিতেও নেয়নি, কারণ অধিনায়কের সঙ্গে ছিলেন নাসিরও। ২৭ বলে দুই বাউন্ডারিতে ২৭ রান করে তিনি অপরাজিত থাকেন। মাশরাফি অবশ্য তাঁর ওয়ানডে ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় ফিফটির সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ ওভারে রানআউট। ফিফটি তবু একটি হয়েছে তাঁর। তামিম (৬৪) ও মুশফিকের (৫৩) পর তৃতীয় বাংলাদেশি ব্যাটসম্যান হিসেবে ওয়ানডেতে ‘ছক্কার ফিফটি’ করার দিনে বল হাতেও প্রতিপক্ষকে ছিন্নভিন্ন করেছেন মাশরাফি। ঝোড়ো ব্যাটিংয়ের পর ২৯ রানে ৪ শিকার। ১৫৯ রানে নবম উইকেট হারানো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ে তুলির শেষ আঁচড়ও তো অধিনায়কেরই বোলানো। আদিল রশীদ (৩৩*) আর জ্যাক বলের হারের ব্যবধান কমানো জুটিও তো ভেঙেছে তাঁর বোলিংয়েই। ব্যাটে-বলে দুর্দান্ত মাশরাফির এই চেহারাটা অবশ্য পুরনোই। সেটি এক যুগ আগেও যেমন দেখা গেছে, তেমনি অর্ধযুগ আগেও।

কয়েকটি উদাহরণ দিতেই হয়। ২০০৪-এর ডিসেম্বরে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ৩৯ বলে অপরাজিত ৩১ রানের ইনিংস খেলা মাশরাফি ৩৬ রানে ২ উইকেট নিয়ে ভারতের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডে জয় এনে দিয়েছিলেন বাংলাদেশকে। ২০০৭ বিশ্বকাপে ব্যাটিং করা না লাগলেও ৩৮ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ভারতের বিদায়ের পথও খুলেছিলেন তিনিই। আর ২৫ বলে ২২ রানের ইনিংস খেলার পর ৪২ রানে ২ উইকেট নেওয়া মাশরাফির নেতৃত্বেই ২০১০ সালের জুলাইয়ে ব্রিস্টলে আরেকটি ‘প্রথম’-এর সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়েছিল বাংলাদেশের। এই ইংল্যান্ডকে প্রথমবার হারানোর স্মৃতি তো সেটিই। ওই তিনটি ম্যাচের মতো কালও একটি বিষয় নিয়ে প্রশ্নের কোনো অবকাশই ছিল না।  

ম্যাচ সেরা তো ইংল্যান্ডের ঘাড় মটকানো সেই পুরনো মাশরাফি ছাড়া আর কেউ হতেই পারতেন না!


মন্তব্য