kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মংলা বন্দর

‘তুষ্ট খাত’ নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



‘তুষ্ট খাত’ নিয়ে ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা

কাজের গতি বাড়াতে যে টাকা ঘুষ হিসেবে খরচ হয় সেটাকে স্পিড মানি বলে আসা হচ্ছে অনেক দিন ধরে। মংলা বন্দরকেন্দ্রিক আমদানিকারকরা কাজের গতি বাড়াতে গিয়ে ঘুষের পেছনে অর্থ খরচ করতে করতে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।

তাঁরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় কথিত এই তুষ্ট খাতে তাঁদের খরচ অনেক বেশি পড়ে যাচ্ছে।

আমদানিকারকরা বলছেন, চট্টগ্রামে যেখানে এ খাতে খরচ মাত্র সাত হাজার টাকা, সেখানে মংলায় খরচ কমপক্ষে লাখ টাকা।

এত খরচ করতে হওয়ায় অসন্তুষ্ট ব্যবসায়ীরা এ অবস্থার নিরসন চেয়ে সরকারের দায়িত্বশীলদের কাছে আবেদন-নিবেদন করেছেন। কেউ কেউ সহনীয় করার বিষয়ে আশ্বাসও দিয়েছেন। সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে ছয় দফা নির্দেশনা জারি করা হয়েছে বলেও ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন।

সম্প্রতি বাংলাদেশ রিকন্ডিশনড ভেহিকলস ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনের (বারভিডা) সভাপতি মো. আব্দুল হামিদ শরীফ খুলনায় এক সংবাদ সম্মেলন করে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। লিখিত বক্তব্যে তিনি মংলা কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের আচরণ ব্যবসাবান্ধব নয় বলে অভিযোগ করেন। এই অসহযোগিতার কারণে তাঁরা মংলা বন্দর পরিত্যাগ করারও হুমকি দেন। তাঁর মতে, আইনি মারপ্যাঁচে

আমদানিকারকদের অহেতুক হয়রানি করা হচ্ছে। উপরন্তু পরিচিত তালিকা (এইচএস কোড) নিয়ে আপত্তি তুলে শুল্কায়ন জটিলতা সৃষ্টি করা হচ্ছে এবং শুল্কায়নসংক্রান্ত কাজে গতি সঞ্চারের নামে পদে পদে অর্থ আদায়ের ফাঁদ পাতা হয়েছে।

এ বিষয়ে মংলা কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মো. মোহন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, তাঁদের কাছে কোনো আমদানিকারক বা মংলা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট এই ঘুষ লেনদেনের ব্যাপারে অভিযোগ দেয়নি। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, ‘এজেন্টরা ঘুষ দেয় কেন? ঘুষ না দিয়েই তো অভিযোগ করতে পারে। ’

নানা হয়রানি-প্রতারণার কারণে একসময় মংলা বন্দর স্থবির হয়ে পড়েছিল। এখানে কোনো জাহাজ ভিড়ত না। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে মংলা বন্দরকে আবারও সচল করার উদ্যোগ নেয়। ২০০৯ সাল থেকে শুরু হয় এই বন্দর দিয়ে রিকন্ডিশন্ড গাড়ি আমদানি। বন্দর সচল হয়ে ওঠে, রাজস্ব আয় বাড়তে থাকে। স্বাভাবিকভাবে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রাও বাড়তে থাকে। পাশাপাশি শুরু হয় শুল্ক কর্মকর্তাদের হয়রানি। তাদের তুষ্ট করার হারও বাড়তে থাকে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এবং মংলা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম বন্দরে এক কনটেইনার পণ্য খালাস করতে রাজস্ব ছাড়া ঘুষ দিতে হয় সাত হাজার টাকা। সেই একই পণ্য খালাসে মংলা শুল্ক কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয় লক্ষাধিক টাকা।

ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রামে পণ্য আসার পর বিল অব এন্ট্রি দাখিল করতে প্রয়োাজন হয় ১২০ টাকা, সেখানে মংলায় প্রয়োজন হয় দুই হাজার টাকা; পণ্য পরীক্ষা করতে শুল্ক কর্মকর্তাদের খুলনা থেকে মংলা বন্দরে নিতে গাড়িভাড়া দিতে হয় চার হাজার টাকা, চট্টগ্রামে এ ক্ষেত্রে কোনো খরচ নেই; কনটেইনার ইনভেন্টিংয়ে চট্টগ্রামে খরচ এক হাজার টাকা, মংলায় খরচ সাড়ে তিন হাজার টাকা; এ কাজে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তাকে চট্টগ্রামে দিতে হয় ৫০০ টাকা, মংলায় দিতে হয় পাঁচ হাজার টাকা; চট্টগ্রামে যেখানে রাজস্ব কর্মকর্তাকে দিতে হয় এক হাজার টাকা, সেখানে মংলায় দিতে হয় ১০ হাজার টাকা; সহকারী কমিশনারকে চট্টগ্রামে দিতে হয় এক হাজার টাকা, মংলায় দিতে হয় ১০ হাজার টাকা; বন্দর খরচ চট্টগ্রামে ৪৫০ টাকা, মংলায় পাঁচ হাজার টাকা; পিয়নের বকশিশ চট্টগ্রামে ৫০০ টাকা, মংলায় পাঁচ হাজার টাকা; আউট পাস চট্টগ্রামে ২৫০ টাকা, মংলায় দুই হাজার টাকা; পণ্য বন্দর ত্যাগকালে চট্টগ্রামে খরচ এক হাজার ২০০ টাকা, মংলায় ১৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে সহকারী বা যুগ্ম কমিশনারের কাছে ফাইল যায় না, মংলায় এই পদের কর্মকর্তার কাছে ফাইল যাওয়া বাধ্যতামূলক, এতে খরচ কমপক্ষে ৫০ হাজার টাকা। এমন আরো কিছু খাতে খরচ করতে হয় আমদানিকারকদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মংলা কাস্টম হাউসের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, “চট্টগ্রাম বন্দরে প্রতিদিন হাজার হাজার ‘বিল অব এন্ট্রি’ দাখিল হয়, সেখানে মংলা বন্দরে সারা বছরেও এক হাজার ‘বিল অব এন্ট্রি’ দাখিল হয় না। ফলে রেট তো একটু বেশিই হবে। ”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আমদানিকারক বলেন, ‘সহকারী কমিশনারের কাছ থেকে পণ্য ছাড় না হলে, ফাইল আরো ওপরে (ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা) যায়। সে ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। ’

জানা যায়, মংলা কাস্টমস ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এসব অনিয়মের বিষয়ে খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কাজী আমিনুল হক বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হয়। খুলনা চেম্বার সভাপতি ব্যবসায়ীদের এই সমস্যা সমাধানের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে লিখিতভাবে জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান নৌপরিবহনমন্ত্রীকে মংলা সমুদ্রবন্দরের বিরাজমান সমস্যা সমাধানে চিঠি দিয়েছেন। ওই চিঠিতে শুল্ককর জটিলতা নিরসনসহ মংলা বন্দরকে গতিশীল করতে ছয় দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এই চিঠিতে বলা হয়, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের সমতা আনতে হবে। এ জন্য মংলা বন্দরকে পণ্য খালাসে চট্টগ্রাম বন্দরের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করার কথা বলা হয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের তুলনায় আমদানীকৃত পণ্য চালানের কনটেইনার ভাড়াও মংলা বন্দরে বেশি। বিষয়টি খতিয়ে দেখা এবং বিরাজমান বৈষম্য নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিবকে প্রধান করে একটি কমিটি করতে বলা হয়েছে। এই কমিটিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), মংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি, দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই বা খুলনা চেম্বারের সভাপতি ও খুলনা বিভাগীয় কমিশনারকে রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ৩০ নভেম্বরের মধ্যে কমিটিকে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।

খুলনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি কাজী আমিনুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি ব্যবসায়ীদের সমস্যা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে চিঠি দিয়েছিলাম। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে চিঠি দিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ’


মন্তব্য