kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলাদেশের চোখ ভারতের বিদ্যুতের খোলাবাজারে

আরিফুজ্জামান তুহিন   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশের চোখ ভারতের বিদ্যুতের খোলাবাজারে

ভারতের খোলাবাজারে বিদ্যুৎ বিক্রি হয়। ঘণ্টা ভিত্তিতে সর্বনিম্ন এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এ খোলাবাজার থেকে কেনা যেতে পারে।

বিদ্যুতের এ বাজার থেকে বাংলাদেশ চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ কিনতে পারে—এমন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আর এর দাম পড়বে ইউনিটপ্রতি দুই টাকা ২০ পয়সা থেকে দুই টাকা ৫০ পয়সা। দেশটির খোলাবাজার থেকে বাংলাদেশের কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন ভারতের নীতিনির্ধারকরা। এ বিষয়ে আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সিদ্ধান্ত জানাবে ভারত।  

ভুটানের জলবিদ্যুৎ খাতে বাংলাদেশ বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আনার জন্য ভারত তাদের সঞ্চালন লাইন ব্যবহারে সম্মতি দিয়েছে। যদি ভুটান ও ভারতের পূর্বাঞ্চল থেকে জলবিদ্যুৎ বাংলাদেশ আনতে পারে তাহলে বিদ্যুতের দামও কমে যাবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি  ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের নেতৃত্বে গত ২ অক্টোবর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগের দুই সচিবসহ ১৯ কর্মকর্তা ভারত সফর করেন। ওই সফরে ভারতের পেট্রোলিয়াম, প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, দেশটির কয়লা ও বিদ্যুৎ বিষয়ক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী পিউস গয়াল ও ভারতের সংশ্লিষ্ট উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন নসরুল হামিদ। এ সময় দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সহযোগিতার বেশ কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ হয়। বৈঠকে ভারতের মাটি ব্যবহার করে ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানি, ভারতের খোলাবাজার থেকে বিদ্যুৎ কেনা ও বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহার করে ভারতকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে ভারত ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ গতকাল রবিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এবারের সফরে আমরা বেশ কয়েকটি বিষয়ে সফল আলোচনা করেছি। এর মধ্যে অন্যতম হলো ক্রসবর্ডার পাওয়ার পারচেজের ব্যাপারটি। ভারতের খোলাবাজার থেকে দরপত্রের মাধ্যমে যদি আমরা বিদ্যুৎ কিনতে পারি তাহলে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি দাম দুই টাকা ২০ পয়সার মতো পড়বে। বিষয়টি আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে জানা যাবে। ’

নসরুল হামিদ আরো বলেন, ‘ভুটানের জলবিদ্যুতে আমরা বিনিয়োগ করতে চাই। এ জন্য ভারতের মাটি ব্যবহার করতে পারলে ভুটানের বিদ্যুৎ বাংলাদেশে আনা সম্ভব। এ বিষয়ে ভারত সম্মত হয়েছে। তাদের সঞ্চালন লাইন আমরা ব্যবহার করব, বিনিময়ে সঞ্চালন মাসুল দেব তাদের।

বাংলাদেশকে যেসব সুবিধা দিতে হবে : ভারতের এসব সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশকেও দিতে হবে বেশ কিছু সুবিধা। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারতকে একটি বিদ্যুতের করিডর দিতে হবে। করিডরটি ভারতের আসাম থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুর হয়ে পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে যুক্ত হবে। বিদ্যুতের করিডরের পাশাপাশি একটি লিকুফায়েড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) করিডর চায় ভারত। এটি বাংলাদেশের চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে ভারতের ত্রিপুরায় গিয়ে যুক্ত হবে। এ জন্য চট্টগ্রামে বাংলাদেশি সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) ও ভারতের সরকারি সংস্থা ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশন লিমিটেড (আইওসিএল) যৌথভাবে একটি এলপিজি প্লান্ট নির্মাণ করবে। গত এপ্রিলে এ বিষয়ে বিপিসি ও আইওসিএলের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। এই এলপিজি প্লান্টের মালিকানা বিপিসি ও আওসিএলের সমান সমান থাকবে। ভারতের ত্রিপুরায় এই এলপিজি প্লান্ট থেকে পাইপলাইনে গ্যাস পাঠানো ছাড়াও বাংলাদেশের বাজারে এলপিজি বিক্রি করবে তারা। ত্রিপুরায় এলপিজি পাঠানোর জন্য প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করতে হবে।

এ ছাড়া ভারত একটি তরলায়িত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি বা লিকুফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস) করিডর চায়। এলএনজির এই করিডর ভারতের হলদিয়া থেকে বাংলাদেশের খুলনা-রংপুর হয়ে শিলিগুড়ির সঙ্গে যুক্ত হবে। বাংলাদেশ ভারতকে এলএনজি করিডর দেওয়ার ব্যাপারেও নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

যা পাবে বাংলাদেশ : ভারত ২০০২ সালে দেশটির বিদ্যুত্সংক্রান্ত আইন সংশোধন করে। এতে কোনো ক্রেতা সর্বনিম্ন এক মেগাওয়াট (প্রতি ঘণ্টায়) বিদ্যুৎ কিনতে পারবে খোলাবাজার থেকে। ওই ক্রেতাকে নিরবচ্ছিন্নভাবে বিদ্যমান সরবরাহ লাইন থেকে ওই বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে দেশটির সংশ্লিষ্ট বিতরণ প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশও এ পদ্ধতিতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ কিনতে চায়। দরপত্রের মাধ্যমে ভারতের খোলাবাজার থেকে বিদ্যুৎ কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে বাংলাদেশ। এ প্রক্রিয়ায় বিদ্যুৎ কিনতে পারলে বাংলাদেশ দরকষাকষি করে বিদ্যুৎ কিনতে পারবে। বর্তমানে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বাংলাদেশ ভারত থেকে আমদানি করছে। এ বিদ্যুতের বড় অংশই দুই সরকারের মধ্যকার (জিটুজি) বৈঠকে নির্ধারিত হয়েছে। ফলে এখানে দরকষাকষির খুব সুযোগ ছিল না। দরপত্রের মাধ্যমে ভারতের খোলাবাজার থেকে বিদ্যুৎ কিনতে পারলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে দুই টাকা ২০ পয়সা থেকে দুই টাকা ৫০ পয়সা। অথচ বর্তমানে বাংলাদেশে গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ সাড়ে ছয়টারও বেশি।

বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে ভারত বিদ্যুতের করিডর নেওয়ার বিনিময়ে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চেয়েছে বাংলাদেশ। ভারত দুটি বিদ্যুতের করিডর চেয়েছে। তবে এই মুহূর্তে ভারত একটি বিদ্যুতের করিডর নির্মাণে মনোযোগ দিয়েছে—এটি হলো ভারতের আসাম হয়ে দিনাজপুর হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। তিন হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এ করিডর দিয়ে ভারত নিতে চায়। বাংলাদেশ এখান থেকে এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ চেয়েছে।

ভুটানের জলবিদ্যুতে বিনিয়োগ করতে চায় বাংলাদেশ। কিন্তু ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আনতে হলে ভারতের ভূমি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়বে। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা ভারতকে জানিয়েছে, ভারতের বিদ্যমান বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ আনতে চায়। এ জন্য ভারতকে বিদ্যুতের সঞ্চালন মাসুল বা হুইলিং চার্জ দেবে বাংলাদেশ। এ বিষয়েও রাজি হয়েছে ভারত।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়ায় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ করছে ভারত। এখান থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের খুলনা-রংপুর হয়ে ভারতের শিলিগুড়িতে গিয়ে উঠবে এলপিজি পাইপলাইনের এ করিডর। এলএনজির এ করিডর থেকে বাংলাদেশের খুলনায় ৭৮০ মেগাওয়াটের একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস দেবে ভারত।

বাংলাদেশের এলপিজি ব্যবসায়ীদের ভারতের পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে এলপিজি ব্যবসায় বিনিয়োগ সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশি এলপিজি উদ্যোক্তাদের ভারতে এলপিজিতে বিনিয়োগের বিষয়েও দেশটির পক্ষে ইতিবাচক মনোভাব দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শিলিগুড়ির নোমালিগড় থেকে বছরে ১০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করবে বাংলাদেশ। এ জন্য ১৩০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করবে ভারত। এই পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশের দিনাজপুরে আসবে ডিজেল। বিদেশ থেকে আমদানি করা ডিজেলের তুলনায় পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে ডিজেল আনলে পরিবহন ব্যয় প্রায় অর্ধেক কমে যাবে বলেও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী জানান।

আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়বে : দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ব্যবহারে আঞ্চলিক সহযোহিতা বাড়ছে। ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে এক দেশের বিদ্যুৎ অন্য দেশে ব্যবহার আরো বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে ভারত ভুটান থেকে আনা দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে। ভারত পাকিস্তানে ৫০০ মেগাওয়াট, বাংলাদেশে ৬০০ মেগাওয়াট এবং নেপালে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করে থাকে। ২০১৭-২২ সালের মধ্যে ভারত ভুটান থেকে আট হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি করতে চায়।

ভারতের সরকারি রির্সাচ সংস্থা ‘ইন্ডিয়া এনার্জি সিকিউরিটি সিনারিও’র তথ্য মতে, ২০২৭ সাল নাগাদ নেপাল ও ভুটানের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে কম করে হলেও এক লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এই বিদ্যুতের ৯৫ শতাংশই এই দুটি দেশ রপ্তানি করবে। আর সে ক্ষেত্রে বড় বাজার হলো ভারত। তবে বাংলাদেশ এই বিশাল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে চায়। আর সেখান থেকে স্বল্প দামে বিদ্যুৎও আনতে চায় দেশে।

বাংলাদেশ থেকেও বিদ্যুৎ যাবে ভারতে : বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা গড়ে ১০ শতাংশ করে বাড়ছে। কিন্তু বিদ্যুতের এ চাহিদার বড় অংশই বাসাবাড়ির সংযোগ। দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ৬০ শতাংশের ওপরে বাসাবাড়িতে ব্যবহৃত হয়। বাকি ৪০ শতাংশ শিল্প-কারখানায় ব্যবহৃত হয়। ফলে রাত ১১টা থেকে বাসাবাড়িতে বিদ্যুতের চাহিদা কমে যায়। কিন্তু বড় বেইজড লোড বিদ্যুৎকেন্দ্র এ সময় বন্ধ রাখা সম্ভব হয় না। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে বড় বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে আসবে। এর মধ্যে রূপপুর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল, পায়রা ও মাতারবাড়ীতে এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াটের তিনটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রও উৎপাদনে আসার কথা। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্র হুটহাট করে বন্ধ করা যায় না। আবার একবার বন্ধ হলে হুট করে চালুও করা যায় না। ফলে রাতে যখন বিদ্যুতের চাহিদা কমে যাবে তখন উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ ভারতে বিক্রি করতে চায় বাংলাদেশ। এ জন্য এরই মধ্যে বিদ্যুতের শত বছরের পুরনো আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ।

এ প্রসঙ্গে নসরুল হামিদ বলেন, ‘আমাদের যখন চাহিদা কমে যাবে তখন আমরা সেটি রপ্তানি করতে পারি। এতে আমাদের উৎপাদন ব্যয় কমে যাবে। ভবিষ্যতের এ লক্ষ্য নিয়ে কাজ হচ্ছে। ’


মন্তব্য