kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


খালেদার আশ্বাসে ভরসা নেই সংস্কারপন্থীদের

এনাম আবেদীন   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



খালেদার আশ্বাসে ভরসা নেই সংস্কারপন্থীদের

দলে ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস পেয়েছেন বিএনপির সংস্কারপন্থী বলে পরিচিত নেতারা। সম্প্রতি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার এ সম্পর্কিত বার্তা বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ শাহজাহান তাঁদের পৌঁছে দিয়েছেন বলে সংস্কারপন্থী অন্তত পাঁচ নেতা কালের কণ্ঠকে নিশ্চিত করেছেন।

যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে মুখ খুলতে রাজি হননি তাঁরা। কারণ বিষয়টি বিএনপির পক্ষ থেকে ‘গোপন’ রাখতে অনুরোধ করা হয়েছে বলে ওই নেতারা জানিয়েছেন।

তবে সংস্কারপন্থী নেতারা এও জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার আশ্বাসের ওপর তাঁরা ঠিক ভরসা রাখতে পারছেন না। কারণ এর আগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও ভোটে অংশগ্রহণ না করার শর্তে তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, যা পরে আর কার্যকর হয়নি।

জানা যায়, নির্বাচনের আগে গুলশানে সাদেক হোসেন খোকার বাসায় অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ অংশের ১৮ জন সাবেক সংসদ সদস্য লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেন যে তাঁরা খালেদার নেতৃত্বে বিএনপির সঙ্গেই থাকতে চান। ওই অঙ্গীকারনামা খালেদা জিয়ার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় এবং তিনি সংস্কারপন্থী নেতাদের পরবর্তী সময় অনুষ্ঠিত উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া অনেক পৌরসভায় প্রার্থী মনোনয়নে সংস্কারপন্থীদের পরামর্শও নেওয়া হয়।

খালেদার নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁরা বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজও করেন। কিন্তু সর্বশেষ অনুষ্ঠিত কাউন্সিলের পরে গত ৩ আগস্ট ঘোষিত কমিটিতে নাম না দেখে হতাশ হয়ে পড়েন সংস্কারপন্থীরা।

অবশ্য ৯ বছর ধরে বিএনপির বাইরে থাকা ওই নেতারা বিচ্ছিন্নভাবে দলে ফিরতেও রাজি নন। সম্মিলিতভাবে ফিরে দলে অবদান রাখার পক্ষে তাঁরা। কিন্তু সম্প্রতি বিএনপির পক্ষ থেকে নজির হোসেন, জহিরউদ্দিন স্বপন, মফিকুল হাসান তৃপ্তি, সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল ও ডা. জিয়াউল হক মোল্লাসহ অল্প কয়েকজন নেতার সঙ্গে বিএনপির যোগাযোগের কথা জানা গেছে।

জানতে চাইলে সাবেক সংসদ সদস্য নজির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, বিএনপি মহাসচিবের সঙ্গে প্রায়ই কথা হয়। শুনি আমাদের ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে; কিন্তু কবে তা হবে জানি না। তিনি জানান, সংস্কারপন্থীদের মধ্যে যোগাযোগ এবং ঐক্য অটুট আছে। ফিরে গেলে সবার একসঙ্গে যাওয়াই ভালো।

সংস্কারপন্থীদের বিএনপিতে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে বিএনপির সঙ্গে যোগাযোগ আছে বলে স্বীকার করেন জহিরউদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, যোগাযোগ আগেও হয়েছে। আমাদের ফিরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে চলছে এবং আমরা আশাবাদী যে যথাযথভাবেই এটি সম্পন্ন হবে। কেননা, অতীতের ভুল সংশোধন করে জাতীয়তাবাদী শক্তির বৃহত্তর ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া বিএনপির আর কোনো বিকল্প নেই।

ডা. জিয়াউল হক মোল্লার মতে, একজন-দুজন বা বিচ্ছিন্নভাবে ফিরে লাভ নেই। সবাই সম্মিলিতভাবে ফিরলে বরং বিষয়টির রাজনৈতিক সমাধান হয়। কারণ সংস্কারপন্থী একটি বিশেষ রাজনৈতিক ধারা বা ট্রেন্ড। সেখানে কয়েকজন নেতা ফিরে গেলে সেই ধারার বিলুপ্তি হবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অনেক ঘটনাপ্রবাহের পরেও কাউন্সিলের পরে ঘোষিত কমিটির দিকে নজর ছিল বিএনপির সংস্কারপন্থী নেতাদের। আশা ছিল, ওই কমিটিতে তাঁদের নাম থাকবে। কিন্তু ঘোষিত ৫০২ সদস্যের কমিটিতে কারো নাম না থাকায় প্রচণ্ড হতাশ হয়ে ওই নেতাদের কেউ কেউ গণমাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কালের কণ্ঠসহ বেশ কয়েকটি পত্রিকায় সংস্কারপন্থীদের তৎপরতা নিয়েও খবর প্রকাশিত হয়। বলা হয়; পদবঞ্চিত নেতাদের পাশাপাশি দলের বাইরে থাকা সংস্কারপন্থীরা সময় হলে একজোট হয়ে পৃথক রাজনৈতিক অবস্থান নেবেন।

সূত্র জানায়, ওই ঘটনার সূত্র ধরে বিএনপির বেশ কয়েকজন সিনিয়র নেতা বিষয়টি খালেদা জিয়ার নজরে আনেন। তাঁরা এও স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির অনুরোধেই সংস্কারপন্থী অন্তত অর্ধশতাধিক সাবেক সংসদ সদস্য নির্বাচনের বাইরে ছিলেন। চেয়ারপারসনকে তাঁরা এও বলেন যে বিএনপিতে ফিরিয়ে নেওয়া না হলে সরকার আগামী নির্বাচনে সংস্কারপন্থীদের কাজে লাগাতে পারে। সূত্র মতে, সিনিয়র নেতাদের ওই মতামতের পরিপ্রেক্ষিতে মির্জা ফখরুল ও মোহাম্মদ শাহজাহানকে সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে কথা বলার দায়িত্ব দেন খালেদা।

জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, সংস্কারপন্থীদের সঙ্গে কথা কাউন্সিলের আগেও হয়েছে, পরেও হয়েছে। তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনাও আছে। তবে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দেশনেত্রী খালেদা জিয়া জাতীয়তাবাদী ঐক্যের জন্যই যেখানে কাজ করছেন, সেখানে সংস্কারপন্থীরা কেন বাইরে থাকবেন? কারণ তাঁরা তো বিএনপিরই প্রতিনিধিত্ব করেন।

মোহাম্মদ শাহজাহানের মতে, দলের সর্বস্তরে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে চেয়ারপারসন আন্তরিক। পাশাপাশি তিনি নিজেই জাতীয়তাবাদী শক্তির ঐক্যের প্রতীক। ফলে সবাইকে নিয়ে তিনি কাজ করবেন এটাই স্বাভাবিক। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সংস্কারপন্থীদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা আছে। দেখা যাক কী হয়!

২০০৭ সালের ২৬ জুন ১৫ দফা সংস্কার প্রস্তাব দিয়ে তৎকালীন মহাসচিব আবদুল মান্নান ভূঁইয়া এবং তাঁকে সমর্থনকারী নেতারা সংস্কারপন্থী বলে বিএনপিতে পরিচিতি পান। ওই বছরেরই ৩ সেপ্টেম্বর মান্নান ভূঁইয়াকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলে সংস্কারপন্থীরা তাঁর নেতৃত্বে তৎপরতা চালাতে থাকেন। কার্যত তখন থেকেই সংস্কার ও অসংস্কারপন্থী বলে দুটি অংশ তৈরি হয় বিএনপিতে। খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন মহাসচিব হওয়ার পর বিভেদ আরো বাড়ে। কারণ তিনি ঢাকা মহানগরীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কমিটি গঠনের নামে সংস্কারপন্থীদের বিতাড়িত করেন।

তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে বিএনপির প্রয়োজন এবং দু-একটি ক্ষেত্রে লবিং ছাড়াই সংস্কারপন্থীদের মধ্যে লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ, সাদেক হোসেন খোকা, ড. ওসমান ফারুক, আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়াম, শাহ মোহাম্মদ আবু জাফর, আসাদুল হাবিব দুলু, মাসুদ অরুণ, মোশাররফ হোসেন মঙ্গু, শামসুল আলম প্রামাণিক, রেজা আহমেদ বাচ্চু, শহিদুজ্জামান বেল্টু, মোজাহের হোসেন, নাসিরুল হক সাবু, ড. সালেক চৌধুরী ও কাজী রফিকসহ অনেকেই বিএনপিতে ফিরেছেন।

আবার মেজর জে. (অব.) জেড এ খান, মোফাজ্জল করিম, আশরাফ হোসেন, শাহ মো. আবুল হোসাইন, শহিদুল হক জামাল, জহিরউদ্দিন স্বপন, মফিকুল হাসান তৃপ্তি, নজির হোসেন, সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল, জি এম সিরাজ, ডা. জিয়াউল হক মোল্লা, এস এ সুলতান টিটু, ইঞ্জিনিয়ার শহিদুজ্জামান, নুরুল ইসলাম মনি, শামীম কায়সার লিঙ্কন, ইলেন ভুট্টো, আলমগীর কবীর, আবু হেনা, আবদুল গণি (মেহেরপুর), দেলোয়ার হোসেন খান দুলু (ময়মনসিংহ), আতাউর রহমান আঙ্গুর (নারায়ণগঞ্জ), আবদুল করিম আব্বাসী (নেত্রকোনা), আবু ইউসুফ খলিলুর রহমান (জয়পুরহাট), মেজর জে. (অব.) আনোয়ারুল কবীর তালুকদার (জামালপুর), এম এম শাহীন (মৌলভীবাজার), ফজলে আজিম (নোয়াখালী), শাম্মী শের (মুন্সীগঞ্জ), এ কে এম আনোয়ারুল হক (ময়মনসিংহ), শাহরিয়ার আক্তার বুলুসহ অর্ধশতাধিক সাবেক এমপি এখনো বিএনপির বাইরে রয়ে গেছেন।

 


মন্তব্য