kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বখাটে ছাত্রলীগ নেতার আক্রোশ

এখনো জ্ঞান ফেরেনি তবে অনুভূতি ফিরছে খাদিজার

নিজস্ব প্রতিবেদক ও সিলেট অফিস   

৯ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এখনো জ্ঞান ফেরেনি তবে অনুভূতি ফিরছে খাদিজার

দীর্ঘ ৭২ ঘণ্টার উৎকণ্ঠা আর অপেক্ষার পালা শেষ করে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে চিকিৎসাধীন সিলেটের কলেজ ছাত্রী খাদিজার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে কিছুটা আশার আলো দেখিয়েছেন চিকিৎসকরা।

তাঁরা জানিয়েছেন, খাদিজার জ্ঞান না ফিরলেও কিছুটা অনুভূতি ফিরছে।

ব্যথা টের পাচ্ছেন। এক হাত ও এক পা কিছুটা নাড়াচ্ছেন। এমনকি ব্যথার অনুভূতি থেকে চোখও খুলছেন। এ থেকে বলা যায়, খাদিজার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

এদিকে খাদিজার ওপর হামলার প্রতিবাদে গতকালও সিলেটে বিভিন্ন সংগঠন সভা-সমাবেশ ও মানববন্ধন করেছে। এসব কর্মসূচিতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী অভিভাবকসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নিয়েছে।

গতকাল শনিবার দুপুর ১২টায় স্কয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রেস ব্রিফিং করে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এখনই খাদিজার অবস্থা নিয়ে শেষ কথা বলার সময় হয়নি। খাদিজা কবে নাগাদ কিংবা কতটা সুস্থ হবেন, কবে নাগাদ লাইফ সাপোর্ট থেকে তাঁকে বের করা হতে পারে তাও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়। এর আগে গত মঙ্গলবার দুপুরের দিকে খাদিজাকে ওই হাসপাতালে নিয়ে আসার পর বিকেল নাগাদ এক দফা অপারেশন শেষে তাঁকে ৭২ ঘণ্টার জন্য বিশেষ পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। ওই সময় থেকেই তাঁকে লাইফ সাপোর্টে সংযুক্ত করা হয়। এর পর থেকেই চিকিৎসকরা বলে আসছিলেন ৭২ ঘণ্টার আগে খাদিজার অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলা যাবে না। ওই সময়সীমা শেষ হয় গত শুক্রবার বিকেলে। চিকিৎসকরা তাঁর অবস্থা পর্যালোচনা করে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমের সামনে আসেন।

এ সময় ওই হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মির্জা নাজিম উদ্দীন জানান, খাদিজার অবস্থা অবশ্যই আগের চেয়ে ভালো। তবে এখনো তাঁর স্নায়ুতান্ত্রিক অবস্থার তেমন উন্নতি ঘটেনি। বলা যায় মুমূর্ষু অবস্থায় আছেন। ঠিক কত ঘণ্টা বা কত দিনে এই অবস্থা কাটবে তা বলা যাচ্ছে না।

একই সময় ওই হাসপাতালের নিউরো সার্জারি বিভাগের আরেক চিকিৎসক রেজাউস সাত্তার বলেন, ঘটনার পর গোল্ডেন আওয়ার পার করে অনেক দেরিতে খাদিজাকে আমাদের কাছে আনা হয়েছে। এর আগে সিলেটে তাঁর প্রাথমিক চিকিৎসা হয়েছে। তাঁর আঘাতের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে বাঁচবেন কি না তা নিয়েই সংশয়ে ছিলাম। কিন্তু এখন যে তাঁর টিকে থাকার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে এবং অনুভূতির মাত্রা বাড়ছে এটা আমাদের জন্য খুবই আশার কথা।

তিনি জানান, স্বাভাবিকভাবে খাদিজার জ্ঞান ফেরেনি এবং নিজ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়াও নেই। তবে ব্যথা দিয়ে দেখেছি—তিনি ব্যথা টের পাচ্ছেন, ডান হাত ও ডান পা কিছুটা নাড়াচ্ছেন এবং চোখ খুলছেন। এটা ইতিবাচক দিক।

ওই চিকিৎসকরা জানান, এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। এখন দেখতে হবে কবে নাগাদ তাঁর জ্ঞান ফেরে। তাঁর অবস্থার আরো উন্নতি হলে এবং জ্ঞান ফিরলে লাইফ সাপোর্ট থেকে বের করা হবে। পরে তাঁর আরো সার্জারি ও অর্থোপেডিক্স চিকিৎসার দরকার হবে। তবে আরো দুই-তিন সপ্তাহ পর হয়তো তাঁর অবস্থা সম্পর্কে আরো ভালো করে বলা যাবে—তিনি বেঁচে থাকলেও আগের মতো আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারবেন কি পারবেন না তখন তা বলা যাবে।

সিলেটে প্রতিবাদ অব্যাহত খাদিজার বাবা কাঁদলেন। তাঁর কান্না স্পর্শ করল সমাবেশে উপস্থিত হাজারো মানুষকে। কান্নাভেজা কণ্ঠে মাসুক মিয়ার একটাই আকুতি, ‘আমার মেয়ের মতো আর কোনো মেয়েকে যেন এ রকম বর্বরতার শিকার হতে না হয়। ’

কলেজ ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসের ওপর হামলার প্রতিবাদে এবং হামলাকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে চতুর্থ দিনেও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। চতুর্থ দিনে মহানগর বিএনপিসহ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি পালন করেছে।

গতকাল শনিবার বিকেলে সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কের তেমুখিতে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে সদর উপজেলার সচেতন নাগরিক সমাজ। সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আশফাক আহমদ, সাবেক সাংসদ সৈয়দা জেবুন্নেছা হক, মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদউদ্দিন আহমদ, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ প্রমুখ।

সমাবেশে গুরুতর আহত খাদিজা আক্তার নার্গিসের বাবা তাঁর মেয়ের সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চান।

একই সময় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে ঘণ্টাব্যাপী মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে সিলেট মহানগর বিএনপি। মহানগর বিএনপির সভাপতি নাসিম হুসাইনের সভাপতিত্বে বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতা সিদ্দিকী, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল হাসান কয়েস লোদী, হুমায়ূন কবির শাহীন প্রমুখ।

সমাবেশে বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতির ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। অন্যায়ের বিচার হলে, শাস্তি হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটত না। বক্তারা খাদিজার ওপর হামলাকারীর ফাঁসি দাবির পাশাপাশি দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করার আহ্বান জানান।

এর আগে সকাল ১০টায় কলেজ ছাত্রী খাদিজার ওপর বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে এবং হামলাকারী বদরুলের শাস্তির দাবিতে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে যৌন হয়রানি নির্মূলকরণ নেটওয়ার্ক সিলেট জেলা শাখা। সংগঠনের আহ্বায়ক ফারুক মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে ও কার্যনির্বাহী সদস্য মিজানুর রহমানের পরিচালনায় মানববন্ধনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সিলেট জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি এ কে এম সমিউল আলম বলেন, সন্ত্রাসীর কোনো দল নেই। যারা মানুষ ও মানবতার ওপর বর্বরোচিত হামলা চালায় তারা কখনোই দলের হতে পারে না। খাদিজার ওপর হামলাকারী বদরুল একজন সন্ত্রাসী। তাকে দ্রুত বিচার আইনের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করতে হবে। কোনোভাবেই যেন আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে আসতে না পারে সে ব্যাপারে আমাদের সবাইকে সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) সিলেটের সভাপতি অ্যাডভোকেট ইরফানুজ্জামান চৌধুরী, জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরিন আক্তার, বেলার সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট শাহ শাহেদা, টেলিভিশন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি কামকামুর রাজ্জাক রুনু প্রমুখ।

এ ছাড়া সিলেটের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ করেছে আলোকবর্তিকা সিলেট জেলা শাখা, জাতীয়তাবাদী ছাত্র ঐক্য কল্যাণ পরিষদ, জামেয়া মাদানিয়া ইলামীয়া কাজির বাজার মাদ্রাসা, মুসলিম ঐক্য পরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন।


মন্তব্য