kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নতুন খসড়া নীতিমালা

নতুন বিধিনিষেধ চাপছে কমিউনিটি রেডিওর ঘাড়ে

পার্থ সারথি দাস   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



নতুন বিধিনিষেধ চাপছে কমিউনিটি রেডিওর ঘাড়ে

অপরাধ রোধ, অনুসন্ধান, তদন্ত ও অপরাধীকে দণ্ডদানের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রতি কটাক্ষ, বিদ্রূপ কিংবা তাঁদের পেশাগত ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে পারে—এমন কোনো বক্তব্য সম্প্রচার করা যাবে না। এ ধরনের নানা বিধিনিষেধ যোগ করে কমিউনিটি রেডিও স্থাপন, সম্প্রচার ও পরিচালনা নীতিমালা ২০১৬-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে।

২০০৮ সালে এ বিষয়ক নীতিমালা করা হয়েছিল। ওই নীতিমালার সঙ্গে বিভিন্ন অংশ যোগ-বিয়োগ করে নীতিমালার নতুন খসড়া তৈরি করা হয়েছে। সেটি তথ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে সব পক্ষের মতামত নেওয়ার জন্য।

তথ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন স্থানে দুই দফায় সরকার ৩২টি কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচারের লাইসেন্স দিয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি কমিউনিটি রেডিও সম্প্রচারে আছে। বাকিগুলো যন্ত্রপাতি আমদানি ও তরঙ্গ বরাদ্দ নেওয়াসহ অন্যান্য প্রস্তুতি নিয়ে সম্প্রচারে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।

জাতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিভিন্ন বেসরকারি টেলিভিশনের সম্প্রচার ও সংবাদপত্র পাওয়া থেকে বঞ্চিত প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বড় অবলম্বন হয়ে উঠেছে এই কমিউনিটি রেডিও। চরবাসী, উপকূলবাসী, চা শ্রমিক, দলিত সম্প্রদায়—এ ধরনের বিশেষ গোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি এবং সরকারি সেবা-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এসব রেডিও। কমিউনিটি রেডিও স্টেশনের ব্যাপ্তি তার অবস্থানের চারদিকে ১৭ কিলোমিটার। নতুন নীতিমালায় তা বাড়িয়ে ২৫ কিলোমিটার করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এসব রেডিও শুধু উন্নয়ন বিজ্ঞাপন সম্প্রচার করতে পারে। তবে খসড়া নীতিমালায় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় নির্বাহের জন্য দৈনিক মোট সম্প্রচার সময়ের সর্বোচ্চ শতকরা ১০ ভাগ সময় বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন সম্প্রচারের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নতুন খসড়া নীতিমালার বিষয়ে তথ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (বেতার) আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ২০০৮ সালে প্রণীত নীতিমালা যুগোপযোগী করতে খসড়া তৈরি করা হয়েছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর তা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হয়েছে। ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মতামত দিতে হবে। তৃণমূল মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে কমিউনিটি রেডিওর বিকাশের জন্যই নীতিমালা উপযোগী করা হচ্ছে।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে—এমন সামরিক, বেসামরিক বা সরকারি তথ্য সম্প্রচার করা যাবে না। পাশাপাশি কোনো অনুষ্ঠান বা বিজ্ঞাপনে সশস্ত্র বাহিনী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত কোনো সংস্থা এবং অপরাধ রোধ, অনুসন্ধান, তদন্ত ও অপরাধীকে দণ্ডদানের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের প্রতি কটাক্ষ, বিদ্রূপ কিংবা তাঁদের পেশাগত ভাবমূর্তি বিনষ্ট করতে পারে—এমন কোনো বক্তব্য সম্প্রচার করা যাবে না।

এতে বলা হয়েছে, বিচ্ছিন্নতা বা অসন্তোষ সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতি বা শ্রেণিবিদ্বেষ প্রচার, কোনো ধর্মের প্রতি বিদ্রূপ, অবমাননা বা আক্রমণ, বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়, বর্ণ বা মতাবলম্বীদের মধ্যে বিদ্বেষ বা বিভেদ সৃষ্টি করতে পারে—এমন তথ্য সম্প্রচার করা যাবে না। এ ছাড়া জাতীয় আদর্শ বা উদ্দেশ্যের প্রতি কোনো প্রকার ব্যঙ্গ বা বিদ্রূপ, বাংলাদেশের জনগণের অবমাননা অথবা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অখণ্ডতা বা সংহতি ক্ষুণ্ন করে—এমন বিষয় সম্প্রচার করা যাবে না।

২০০৮ সালে প্রণীত নীতিমালায় গবেষণা ও উন্নয়নকাজ পরিচালনাকারীরা লাইসেন্স পাওয়ার জন্য আবেদন করতে পারবে বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। নতুন খসড়া অনুযায়ী শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানও আবেদন করতে পারবে। বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ এইচ এম বজলুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, নতুন নীতিমালায় বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন সম্প্রচার ও ক্যাম্পাসভিত্তিক কমিউনিটি রেডিও স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক।

এ ধরনের রেডিওর লাইসেন্স পেতে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট কমিউনিটি পর্যায়ে দারিদ্র্য বিমোচন, গণমাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি সম্পর্কিত ও উন্নয়নমূলক কাজে কমপক্ষে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। খসড়া নীতিমালা অনুসারে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের আইনগত বৈধতা থাকতে হবে বা এনজিও ব্যুরোর নিবন্ধন থাকতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ধ্যান-ধারণার প্রতিফলনসমৃদ্ধ পরিচালনা পর্ষদ থাকতে হবে। ব্যক্তিগত বা যৌথ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে লাইসেন্সের আবেদন করা যাবে না। রাজনৈতিক দল বা তাদের অঙ্গ কিংবা সহযোগী সংগঠন, দেশি-বিদেশি কম্পানি ও প্রতিষ্ঠান, যারা মালিক বা শেয়ারহোল্ডারকে লভ্যাংশ দেয় তারা আবেদন করতে পারবে না। এ ছাড়া বিদেশি সংস্থা বা সম্প্রচার সংস্থা, আদালত থেকে দেউলিয়া ঘোষিত বা ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা কমিউনিটি রেডিও পরিচালনার অযোগ্য বিবেচিত হবে।

খসড়া নীতিমালায় বলা হয়েছে, লাইসেন্সের জন্য আবেদনকারীকে সম্প্রচারিতব্য অনুষ্ঠানের রূপরেখা, উদ্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিবরণ, প্রস্তাবিত রেডিও স্টেশনের অবৈতনিক ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং সম্প্রচার নীতিমালা সংযুক্ত করে দিতে হবে; যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশ নেওয়ার মাত্রার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে। তহবিলের উৎসও জানাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি সংস্থার এনজিও ব্যুরো থেকে নেওয়া নিবন্ধনের প্রমাণপত্র দিতে হবে। কারিগরি উপকমিটি আবেদনপত্রগুলো যাছাই-বাছাই করে জাতীয় রেগুলেটরি কমিটির কাছে পাঠাবে। জাতীয় রেগুলেটরি কমিটি নির্বাচিত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা ছাড়পত্র নেবে। অনুমোদন দেওয়ার আগে তথ্য মন্ত্রণালয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) থেকে ফ্রিকোয়েন্সি প্রাপ্যতার প্রতিবেদন নেবে। যোগ্য বিবেচিত হলে প্রাথমিক পর্যায়ে কেবল একটি কমিউনিটি রেডিও স্টেশন স্থাপনের জন্য সরকার সাময়িক লাইসেন্স দেবে। সাময়িক লাইসেন্স পাওয়ার এক বছরের মধ্যে কমিউনিটি রেডিও স্টেশন স্থাপনের কাজ শেষ করতে হবে। না হলে লাইসেন্স বাতিল করা হবে। রেডিও স্টেশন স্থাপনের এক বছরের মধ্যে পরীক্ষামূলক সম্প্রচার চালু করতে হবে। না হলে সরকার জামানত বাজেয়াপ্তসহ লাইসেন্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরু করতে পারবে। পরীক্ষামূলক সম্প্রচারের মেয়াদ হবে এক বছর। এ সময়ের মধ্যে সম্প্রচার সরকারের কাছে সন্তোষজনক মনে হলে নির্ধারিত শর্তাদি মানা সাপেক্ষে চূড়ান্ত লাইসেন্স দেওয়া হবে। তা পাওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা সরকারের অনুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ তিনটি কমিউনিটি রেডিও স্টেশন স্থাপন ও পরিচালনা করতে পারবে। চূড়ান্ত লাইসেন্স পাওয়ার পর কোনো প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত নিয়মে একই অনুষ্ঠানমালা অনলাইনে সম্প্রচার করতে পারবে।

সাময়িক লাইসেন্স ফি গ্রহণকালে অনুমোদন পাওয়া প্রাতিষ্ঠানকে জামানত বাবদ এক লাখ টাকা ও প্রতিটি স্টেশনের জন্য লাইসেন্স ফি বাবদ ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। পরীক্ষামূলক সম্প্রচার কার্যক্রমের পর চূড়ান্ত লাইসেন্স গ্রহণকালে লাইসেন্স ফি দিতে হবে ১০ হাজার টাকা। প্রতি অর্থবছরে লাইসেন্স নবায়ন ফি ১০ হাজার টাকা। লাইসেন্স চুক্তি সংক্রান্ত সরকারি পাওনা পরিশোধে ব্যর্থ হলে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিল হবে।

আগের নীতিমালায় সর্বোচ্চ ১০০ ওয়াট সম্প্রচার শক্তির ট্রান্সমিটারের বদলে নতুন খসড়া নীতিমালায় ২৫০ ওয়াটের প্রস্তাব করা হয়েছে।

খসড়া নীতিমালা অনুসারে কমিউনিটি রেডিও পরিচালনা করতে হলে সাতটি মৌলিক নীতি বা শর্ত মানতে হবে। প্রথম শর্ত হলো, এটি অলাভজনক ভিত্তিতে কোনো সংস্থা, প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠী পরিচালনা করবে। সম্প্রচার অনুষ্ঠানসূচিতে কমিউনিটি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সমাজ, নারীর অধিকার, গ্রামীণ ও এলাকাভিত্তিক উন্নয়ন, পরিবেশ, আবহাওয়া, সাংস্কৃতিক ও অন্যান্য উন্নয়ন বিষয় এবং সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও মাদকবিরোধী প্রচার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এতে সংশ্লিষ্ট কমিউনিটিভুক্ত জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা থাকবে। সম্প্রচার কার্যক্রমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী অগ্রাধিকার পাবে। মূল ধারার গণমাধ্যমের সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী কমিউনিটি রেডিও স্থাপনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবে। প্রতিটি জেলায় দুটি করে কমিউনিটি রেডিও স্থাপনের অনুমোদন দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।


মন্তব্য