kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অনার কিলিং

খুনির মুক্তি রোধে আইনি ফাঁক বন্ধ করল পাকিস্তান

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



খুনির মুক্তি রোধে আইনি ফাঁক বন্ধ করল পাকিস্তান

‘অনার কিলিং’ বা ‘পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে হত্যা’-সংক্রান্ত আইনে খুনিদের ছাড় পাওয়ার সুযোগ বন্ধ করতে সর্বসম্মতভাবে বিল পাস করেছে পাকিস্তানের পার্লামেন্ট। এ ধরনের ঘটনায় আইনের যেসব ফাঁক গলে এত দিন খুনিরা বেরিয়ে যেত, নতুন আইনে সেসব ফাঁক বন্ধ করা হয়েছে।

আগের আইনে বলা ছিল, পরিবার ক্ষমা করে দিলে দণ্ড থেকে মুক্তি পাবে আসামি।

বিবিসি জানায়, পুরনো আইন সংশোধন করে বৃহস্পতিবার পাকিস্তানের পার্লামেন্ট হত্যাকারীর মুক্তির পথ বন্ধ করেছে। অপরাধ প্রমাণিত হলে হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড ভোগ করতে হবে। পরিবার ক্ষমা  করে দিলেও তাকে যাবজ্জীবন সাজা খাটতে হবে, মুক্তি মিলবে না।

পরিবারের সম্মান রক্ষার নামে পাকিস্তানে প্রতিবছর আপনজনের হাতে খুন হন শত শত নারী। দেশটির মানবাধিকার কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, কেবল ২০১৫ সালেই অন্তত ১১ শ নারী ‘অনার কিলিংয়ের’ শিকার হয়েছেন। এ হিসাবকেও মোট ঘটনার ‘কিয়দংশ’ বলেছে মানবাধিকার কমিশন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এসব হত্যাকাণ্ডের কোনো হদিস মেলে না বলেও জানিয়েছে তারা।

পারিবারিক দ্বন্দ্ব, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক কিংবা নিজের ইচ্ছামতো বিয়ে করার মতো কারণে খুন করা হয়েছে নারীদের। সাম্প্রতিক সময়ে এ রকম কয়েকটি ঘটনা পাকিস্তানের বাইরেও ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। গত জুলাইয়ে দেশটিতে ‘অনার কিলিং’য়ের শিকার হন ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত নারী সামিয়া শহীদ। সামিয়ার বাবা ও সাবেক স্বামী এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। একই মাসে পাঞ্জাবে ভাইয়ের হাতে খুন হন সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রেটি কান্দিল বেলুচ। তাঁকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে তাঁর ভাই।

নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন রোধে সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি নতুন আইন হয়েছে; যার মধ্যে আছে ধর্ষণ প্রমাণে ডিএনএ পরীক্ষার অনুমতি। প্রথমবারের মতো হওয়া এই আইনে ধর্ষণে অভিযুক্তদের ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে দোষী চিহ্নিত করা যাবে। এর ফলে ধর্ষণ মামলায় আসামিদের ছাড়া পাওয়ার ক্ষেত্রে আইনে যে দুর্বলতা ছিল তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে বলে আইনজ্ঞদের ধারণা।

বছরের পর বছর ধরে ‘অনার কিলিং’ সংক্রান্ত আইনেরও সংশোধনী চেয়ে আসছিল মানবাধিকার ও নারী অধিকারকর্মীরা। আন্দোলনের চাপে ২০০৫ সালে আইনটিতে একদফা সংশোধনী আনা হয়। ওই সংশোধনীতে ‘অনার কিলিং’য়ে জড়িত ব্যক্তিরা খুন হওয়া নারীর ‘উত্তরাধিকার’ দাবি করে নিজেই নিজেকে ক্ষমা করে দেওয়ার যে সুযোগ পেত, তা রহিত করা হয়। আর সর্বশেষ সংশোধনীতে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের ‘পরিবারের সম্মান রক্ষার’ দোহাই দিয়ে খালাস পাওয়ার সুযোগও বন্ধ হলো।

পার্লামেন্টের উভয়কক্ষে বিলটি পাস হওয়ায় তা আইনে পরিণত হতে আর কোনো বাধা নেই। বিলটি আইনে পরিণত হলে অনার কিলিং কমে আসবে এবং প্রেম ও বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

নতুন এ বিলকে স্বাগত জানিয়েছেন পাকিস্তানের অধিকারকর্মী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা শারমিন ওবায়েদ; আইনটির সংশোধনী নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিদের প্রতি তিনি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। ফেসবুকে এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘এটা রাতারাতি পরিস্থিতির বদল ঘটাবে না, কিন্তু এ পদক্ষেপ সঠিক পথে নিয়ে যাবে। বিলটির মাধ্যমে আমরা বেশ খানিকটা দূরত্ব অতিক্রম করতে পেরেছি বলে আমি গর্বিত। ’ অনার কিলিং নিয়ে করা শারমিনের তথ্যচিত্র এ বছর অস্কার পুরস্কার পেয়েছে।

অবশ্য ‘হত্যাকাণ্ডটি অনার কিলিং কি না’ তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা বিচারকদের হাতে থাকায় আইনটি সহিংসতা রোধে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারবে তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। বিবিসির ইসলামাবাদ প্রতিনিধি ইলিয়াস খান বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সামাজিক চাপ কিংবা ঝোঁকের মাথায় এ হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানো হয়। এ ধরনের খুনের সঙ্গে জড়িতদের দায়মুক্তির সংস্কৃতিও পাকিস্তানে দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ‘দায়মুক্তি’ নেওয়ার সুবিধা বন্ধ করলেও পরিবারের সদস্যদের মাধ্যমে এসব খুন হয় বলে খুনিকে চিহ্নিত করা বা তাকে অপরাধী প্রমাণ করা দীর্ঘ মেয়াদে কঠিন হয়ে উঠতে পারে।


মন্তব্য