kalerkantho


জেতা ম্যাচ এভাবে হারা যায়!

ইংল্যান্ড : ৫০ ওভারে ৩০৯/৮
বাংলাদেশ : ৪৭.৫ ওভারে ২৮৮
ফল : ইংল্যান্ড ২১ রানে জয়ী

সামীউর রহমান   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জেতা ম্যাচ এভাবে হারা যায়!

তখনো যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের। জয়ের এত কাছে গিয়েও ২১ রানে হারার হতাশা তাঁদের অভিব্যক্তিতে। ছবি : মীর ফরিদ

নিয়তি যে কত নিষ্ঠুর হতে পারে, স্বপ্নের খুব কাছে এসেও স্বপ্নভাঙার বেদনা কতটা গাঢ় হতে পারে, সেই দুঃসহ অনুভূতির সঙ্গে পরিচয় আছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়দের, সমর্থকদের। বেঙ্গালুরুতে ৩ বলে ৩ উইকেট হারিয়ে ভারতের কাছে হেরে যাওয়ার স্মৃতিটা যখনই মস্তিষ্কের ধূসর কোষ থেকে বিলুপ্ত হতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই ততটাই বিস্ময়ে বিমূঢ় করে দেওয়া আরেকটি হার। এবারে সেই দুঃস্বপ্ন সাফল্যের রুপালি রাতকে অমাবস্যার নিকষ কালো অন্ধকারে বদলে দিল ইংল্যান্ডের চেহারা নিয়ে। আনন্দরজনীকে বিষাদরাত্রিতে বদলে দিলেন জেক বল নামের বছর পঁচিশের এক তরুণ, ইংল্যান্ডের ওয়ানডে দলে কালই যার অভিষেক হলো। চিল যেমন হাত থেকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় তেলেভাজার ঠোঙা, তেমনি শেষ সময়ে বলের হাত থেকে ছোড়া বলগুলোও একে একে ছোঁ মেরে নিয়ে গেল বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন। তাই তো জয়ের রাজপথে সাঁইসাঁই করে ৪০ ওভার চলা স্বপগাড়িটা শেষ পর্যন্ত মুখ থুবড়ে পড়ল হারের খাদে।

টসজয়ী ইংল্যান্ড ফিল্ডারদের বদান্যতায় করেছিল ৮ উইকেটে ৩০৯ রান। ক্যাচ পড়েছে গোটা পাঁচেক, বেন স্টোকসই ৫ বল আর ২ রানের ব্যবধানে জীবন পেয়েছেন দুইবার। একাই দুটো ক্যাচ ছেড়েছেন মোশাররফ হোসেন। এত সুযোগ কাজে লাগিয়ে অভিষিক্ত বেন ডাকেট করেছেন ৬০, স্টোকস ক্যারিয়ারের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি তুলে নিয়ে করেছেন ১০১ রান আর এ সময়ের ক্রিকেটে অন্যতম সেরা ‘ফিনিশার’ হয়ে ওঠা বাটলার ৩৮ বলে ৬৩ রান করে ইংল্যান্ডের সংগ্রহটাকে পৌঁছে দিয়েছেন ৩০৯ রানে।

দাগ থেকে যদি দারুণ কিছু হয় তাহলে দাগই ভালো! জনপ্রিয় একটি ডিটারজেন্টের বিজ্ঞাপনের কথা মেনে, শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের দর্শকদের মাথার ওপর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের লোগোর নিচে নতুন যে দাগটা তৈরি হয়েছে, সেটা না সারিয়ে রেখে দিতে পারেন কর্তৃপক্ষ।

কারণ ওই দাগটাই যে ইমরুল কায়েসের প্রতিবাদের স্বাক্ষর, উপেক্ষার জবাব আর কীর্তির স্বাক্ষর। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ওয়ানডেতে জয়ের স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের বেদনার মাঝে প্রাপ্তি ইমরুলের অমন ব্যাটিং।

রিপ্লেতে দেখিয়েছে, ইমরুলের ব্যাটের গতি ছিল ঘণ্টায় ১৩৯ কিলোমিটার! ৩১০ রান তাড়ায় ইনিংসের তৃতীয় বলে, ক্রিস ওকসের অফস্টাম্পের বাইরে করা ডেলিভারিটা সেভাবে ডিপ স্কোয়ারলেগ দিয়ে রকেটের বেগে উড়িয়ে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের ছাদে লাগালেন, তাতেই সপষ্ট হয়ে উঠল একটা বার্তা। ছাড় দেবে না বাংলাদেশ, ছাড় দেবেন না ইমরুল। প্রতিভা না প্রয়োগ, নান্দনিকতা না কার্যকারিতা—এই বিতর্ক চিরন্তন। আর এই বিতর্কই এখন বাংলাদেশ দলের একাদশ নির্বাচনে রূপ নিয়েছে সৌম্য সরকার আর ইমরুল কায়েসের চেহারায়। সৌম্য তরুণ, সৌম্য সাহসী এবং সৌম্য প্রতিভাবান। তাই বছর পুরনো হলেও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তাঁর দুটো ইনিংস গুনতির খাতায়। ইমরুলের জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হাফ সেঞ্চুরি তাই হালে পানি পায় না। আফগানিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ওয়ানডেতে নড়বড়ে ৩৭ রানের পর তাই আর একাদশে সুযোগ পান না ইমরুল। অথচ শূন্য রানে আউট হয়েও টিকে যান সৌম্য। এসব দেখে হয়তো আপন মনেই ফুঁসতে থাকেন সাগর, পোশাকি নামের আড়ালে ইমরুলের যে ডাকনামটা হারিয়ে গেছে গণমাধ্যম থেকে।

ফুঁসতে থাকা সাগর কতটা প্রলয়ংকরী হয়, সেটা দেখা গেল কাল। ১০৫ বলে, ১১ বাউন্ডারি আর ২ ছক্কায় আসে ইমরুলের ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় শতরান; তবে এক অদ্ভুত ভঙ্গিমায়! ইমরুলের শর্ট আর্ম জ্যাব থেকে ফলো থ্রু-তে বল কুড়িয়ে এগিয়ে আসা ব্যাটসম্যানকে রানআউট করার জন্য ছুড়েছিলেন ডেভিড উইলি। সেটা তো স্টাম্পে লাগেইনি, বরং উইকেটরক্ষকের অনেক দূর দিয়ে চলে যায় মাঠের বাইরে। ওভার থ্রো থেকে পাওয়া এই বাউন্ডারিই ইমরুলকে পৌঁছে দেয় তিন অঙ্কের জাদুকরী সংখ্যায়! ফতুলায় প্রস্তুতি ম্যাচে শতরানের পর বলেছিলেন, জাতীয় দলের একাদশে ফেরার জন্য এক্সট্রা অর্ডিনারি কিছু করার তাড়না ছিল তাঁর মনে। সেটা করে একাদশে ফিরেও ‘এক্সট্রা অর্ডিনারি’ ইনিংস খেললেন ইমরুল, ৬ বছর ৫ মাস পর পাওয়া দ্বিতীয় ওয়ানডে সেঞ্চুরিটাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের রকেটের মূল জ্বালানি!

সাকিব বরাবর নায়কের ভূমিকা নিতেই অভ্যস্ত। তবে কাল বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডার পার্শ্বনায়কের চরিত্রে। ৪ ওভারের ভেতর আদিল রশিদের বলে মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকের দ্রুত বিদায়ের পর যখন ক্রিজে আসেন, তখন বাংলাদেশ খেই হারানোর শঙ্কায়। সেখান থেকেই ইমরুলের সঙ্গে পঞ্চম উইকেটে ১১৮ রানের জুটি সাকিবের। ৩৯ বলে ৫ বাউন্ডারি আর ২ ছক্কায় করেন ৫০ রান, ৫৫ বলে ১০ বাউন্ডারি আর ১ ছক্কায় ৭৯ রান করে যখন আউট হলেন, জয় তখন হাত ছোঁয়া দূরত্বে। মড়কের শুরু এখানেই।

পুল করতে গিয়ে জেক বলের বলে উইলির হাতে ক্যাচ দিলেন সাকিব। পরের বলে প্লেইড অন মোসাদ্দেক হোসেন। মুহূর্তেই নিস্তব্ধ শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের ২২ হাজার দর্শক। দুই বাঁহাতির বিদায়ে ফের লেগস্পিনার আদিল রশিদকে আক্রমণে আনলেন বাটলার। মাশরাফি তাঁর বলেই ক্যাচ দিলেন উইকেটের পেছনে। ক্লান্ত ইমরুল সেই আদিল রশিদেরই ওয়াইড বলে ক্রিজ ছেড়ে বেড়িয়ে মারতে এসে স্টাম্পড। মাঝে একবার মাঠের আম্পায়ার আউট দিলেও রিভিউ নিয়ে বেঁচে গেছেন মোশাররফ রুবেল। ২০১১ বিশ্বকাপে চট্টগ্রামে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ের নায়ক শফিউলও রানআউট কোনো রান না করেই। ৪ উইকেটে ২৭১ থেকে চোখের নিমিষেই ২৮৮ রানে অলআউট। আত্মাহুতির পালায় ১৭ রান তুলতে পড়ল শেষ ৬ উইকেট। জয়ের সম্ভাবনা নিয়ে জ্বলতে থাকা সূর্যে রাহুর গ্রাস। একটা করে উইকেট পড়ছে আর উইকেটের পেছনে বাটলারের বিধ্বস্ত চেহারা একটু একটু করে আলোকিত হচ্ছে। হাসিটা চওড়া হচ্ছে। ২৮৮ রানে বাংলাদেশকে অলআউট করে ২১ রানে জয়ের পর স্টাম্প তুলে নেওয়া আর বাঁধভাঙা উদ্যাপনই বলে দেয়, কতটা কোণঠাসা অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এই ম্যাচটা জিততে হয়েছে ইংল্যান্ডকে।

আফগানিস্তানের বিপক্ষে সিরিজেও শেষের ব্যাটিংটা ভালো হয়নি। ভালো হয়নি প্রস্তুতি ম্যাচেও। ৪২তম ওভারের তৃতীয় বলে সাকিব যখন আউট তখন জয়ের জন্য দরকার ছিল ৫১ বলে ৩৯ রান। সেই সহজ সমীকরণটা মেলানো গেল না। ড্রেসিংরুম থেকে মোসাদ্দেককে বলে পাঠানো হয়েছিল ইমরুলকে সঙ্গ দিতে, ক্ষণিকের অতিথি হয়ে এই তরুণ পারেননি কথা রাখতে। মাশরাফি নিজেও কেটে বের হতে পারেননি লেগস্পিনারের ঘূর্ণিফাঁদ। এরপর আর যাই হোক, দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অনভ্যস্ত দুই ক্রিকেটার মোশাররফ রুবেল আর শফিউল ম্যাচ জেতাবেন এমন ভাবনাটা অলৌকিকই হয়ে ওঠে। তেমনটা হয়নি, বরং দুঃস্বপ্ন ততক্ষণে ঘোর বাস্তব। তাই ম্যাচের ১৩ বল আগেই ২১ রানে বাংলাদেশের হারটা হৃদকম্প বাড়ায় না বরং আক্ষেপ বাড়ায়।

কখনো প্রতিপক্ষের কোনো ক্রিকেটারের অতিমানবীয় পারফরম্যান্স, কখনো আম্পায়ারের বিমাতাসুলভ আচরণ তো কখনো আত্মাহুতির মিছিল; বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন তো এভাবে কতবারই মিলিয়েছে হারের অমানিশায়। এভাবে হারতে হারতেই তো জিততে শিখে একশ জয়ের মালাও গেঁথেছে বাংলাদেশ। আর এই নাটকীয়তাটুকু আছে বলেই না খেলাটা গৌরবময় অনিশ্চয়তার!


মন্তব্য