kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফার্ক শান্তিচুক্তি গণভোটে প্রত্যাখ্যান

তবু শান্তির নোবেল জয় কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের

সাব্বির রহমান খান, সুইডেন থেকে   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



তবু শান্তির নোবেল জয় কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্টের

দীর্ঘ ৫০ বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসানে ফার্ক গেরিলাদের সঙ্গে কলম্বিয়া সরকারের করা ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে গণভোটে, তবু শান্তি প্রতিষ্ঠা চেষ্টার কারিগর হিসেবে এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস। গতকাল শুক্রবার নরওয়ের রাজধানী অসলোতে এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয় নোবেল কমিটি।

কলম্বিয়ায় প্রায় পাঁচ দশক ধরে গৃহযুদ্ধ চলছে। অতি বামপন্থী ফার্ক গেরিলারা দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে এই সংগ্রামে লিপ্ত।

 এতে প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার মানুষের প্রাণ গেছে। বাস্তুচ্যুত হয়েছে ৬০ লাখের বেশি মানুষ। এরই মধ্যে বিভিন্ন সময় ফার্ক গেরিলাদের  সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু হলেও ফলপ্রসূ হয়নি।

সর্বশেষ চার বছরের আলোচনার পর গত ২৩ সেপ্টেম্বর দ্য রেভল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়ার (ফার্ক) নেতা টিমোশেনকো ও কলম্বিয়ার মধ্য ডানপন্থী সরকারের প্রধান হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস ওই শান্তিচুক্তিতে সই করেন। পরে সেই চুক্তি নিয়ে জনগণের মতামত চেয়ে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন সান্তোস। গত রবিবার অনুষ্ঠেয় গণভোটে সেই চুক্তি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ফলে শান্তিপ্রক্রিয়ার বিষয়টি আবার মুখ থুবড়ে পড়ল।  

নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান কাচি কুলম্যান ফাইভ বলেন, এই পুরস্কারটি কলম্বিয়ার সেই মানুষদের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্যস্বরূপ, যারা অসহ্য নির্যাতনের শিকার হয়েও শান্তির আশা ছেড়ে দেয়নি এবং যারা এই শান্তিপ্রক্রিয়ায় বিশেষ অবদান রেখেছে। দীর্ঘ এই গৃহযুদ্ধে যাঁরা নিহত হয়েছেন, পুরস্কারটি তাঁদের  আত্মার প্রতিও শ্রদ্ধাস্বরূপ।

নোবেল কমিটি বলেছে, শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে ভোট, শান্তির বিরুদ্ধে ভোট নয়। কলম্বিয়ায় শান্তিচুক্তির ধরনটিকে অনেকে অপছন্দ করেছে। কারণ কলম্বিয়ার মতো দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে আক্রান্ত দেশের পক্ষে খুব সহজে সমাধানে পৌঁছানো হয়তো সম্ভবও নয়। বিশেষ করে এই গৃহযুদ্ধে যাঁরা অত্যাচারের শিকার হয়েছেন, তাঁরাও শান্তিপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। সাহস করে এগিয়ে এসে তাঁরা অত্যাচারের কথা শুনিয়েছেন, জানিয়েছেন। এই শান্তিচুক্তিতে তাঁদেরও ন্যায়বিচার জরুরি। তাই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল। এবারের পুরস্কারের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট সান্তোস ও কলম্বিয়ার জনগণের এই সাহসী প্রচেষ্টাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। কমিটির আশা, এই পুরস্কার শান্তিপ্রক্রিয়াকে আরো জোরালো করে তুলবে। শান্তির ভিত তৈরি হয়েছে। ভোটের ফলাফলে আশাহত না হয়ে বরং পুনর্মিলনের দিকেই এগিয়ে যাবে কলম্বিয়া।

যদিও শান্তির নোবেল পাওয়ার পরে আবার যুদ্ধ শুরু হওয়ার উদাহরণও রয়েছে। ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে অসলো শান্তিচুক্তির জন্য ১৯৯৪ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন ইয়াসির আরাফাত, সদ্য প্রয়াত শিমন পেরেজ ও আইজ্যাক রবিন। কিন্তু তার পরে সেই শান্তি তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। ইরাক থেকে সেনা ফিরিয়ে এনে ২০০৯ সালে শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। কিন্তু সেই ইরাক এখন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) লীলাভূমি।

প্রেসিডেন্ট হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস শান্তির নোবেল পাওয়ায় গত বছরের শান্তি পুরস্কারজয়ী ভারতের কৈলাশ সত্যার্থী তাৎক্ষণিক এক টুইটবার্তায় সান্তোসকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। কৈলাশ বলেন, ‘নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সহকর্মী হিসেবে আমি আপনার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করছি। বিশ্বের অবহেলিত শিশুদের জন্য আপনার অধিকতর সহযোগিতা আশা করছি। ’

সুইডেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কার্ল বিল্ডট বলেন, কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট অবশ্যই এই শান্তি পুরস্কারের যোগ্য এবং শান্তি রক্ষায় নিশ্চয়ই তাঁর আরো অনেক কিছু করার আছে।

তবে সান্তোসের এই পুরস্কার জয় নিয়ে বিভিন্ন মহলে বিতর্কও শুরু হয়েছে। সুইডিশ পিস অ্যান্ড আরবিট্রেশন অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান বলেন, একটি শান্তিচুক্তি প্রক্রিয়ায় সব সময়ই পক্ষ থাকে দুটি, অথচ পুরস্কৃত করা হলো শুধু এক পক্ষকে, যা আগামীতে শান্তিপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে পারে। এই পুরস্কার শান্তির জন্য হলেও অশান্তিকেই উৎসাহিত করবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

হুয়ান ম্যানুয়েল সান্তোস ১৯৫১ সালে কলম্বিয়ার বোগোটায় জন্মগ্রহণ করেন। আগামী ১০ ডিসেম্বর নোবেল পুরস্কারের জনক বিজ্ঞানী আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে অসলোতে এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এই বিজয়ীকে ৮০ লাখ সুইডিশ ক্রাউন, একটি মানপত্র ও স্বর্ণপদক প্রদান করা হবে। আগামী সোমবার সুইডেনের রাজধানী স্টকহোম থেকে দ্য ব্যাংক অব সুইডেন কর্তৃক দেওয়া ‘বিকল্প নোবেল হিসেবে খ্যাত’ অর্থনীতির পুরস্কার ঘোষণা করা হবে।


মন্তব্য