kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ছিমছাম নিউ মার্কেট দিনে দিনে তছনছ

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ছিমছাম নিউ মার্কেট দিনে দিনে তছনছ

দুই সারিতে এক তলার দোকানঘর, মাঝখানে হাঁটাচলার প্রশস্ত জায়গা, ওপরে খোলা আকাশ, মাঝখানে সবুজে মোড়ানো পার্ক, চারপাশে গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গা—সব মিলিয়ে দারুণ ছিমছাম পরিবেশ। একটা সময় পর্যন্ত ঢাকা নিউ মার্কেট তার এই কৌলীন্য ধরে রেখেছিল।

অভিজাত থেকে সাধারণ মানুষ—সবাই ছুটত সেখানে। একই জায়গায় সব ধরনের পণ্যের সমাহার। শপিংয়ের ফাঁকে বই পড়ায় জমাট আড্ডা, ক্ষুধা পেলে গোছানো রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়া, শখ হলে আইসক্রিম পার্লারে ঢুঁ মারা। বদ্ধ নয়, খোলা জায়গায় শপিংকে বিনোদনের আবহে মাতিয়ে তোলার এমন চমৎকার ব্যবস্থা রাজধানীর বুকে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। খোলামেলা পরিবেশ আর পরিকল্পিত মার্কেটের ব্র্যান্ড নেমও তাই নিউ মার্কেট। ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে ৩৫ একর জমিতে গড়ে ওঠা এ শপিং হাব বহু ঘটনার সাক্ষী, একই সঙ্গে ইতিহাস-ঐতিহ্যের ধারকও। কিন্তু এমন চমৎকার পরিবেশকে গলাটিপে মারার নানা আয়োজন চলছে এক দশক ধরে। এরশাদ আমলে আদি মাস্টারপ্ল্যান তছনছ করে দিয়ে পার্ক আর গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে তিনটি তিন তলা ভবন। পার্কিংয়ের জায়গা দখল হয়ে যাওয়ায় শত শত যানবাহন থাকে রাস্তায়। ফলে বিশাল এই মার্কেট ঘিরে যানজট এখন নিত্যদিনের। চাহিদা  থাকায় সিটি করপোরেশনের কতিপয় কর্মকর্তা আর ব্যবসায়ী মিলে শত শত দোকান নির্মাণ করছেন। যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা অবশিষ্ট ছিল, সেখানেই উঠেছে ভবন। খোলা জায়গা ফুরিয়ে যাওয়ার পরও ক্ষান্ত দেননি তাঁরা। এবার তিনটি মার্কেটের ছাদে আরো সাড়ে ছয় শ থেকে সাত শ দোকান নির্মাণের তোড়জোড় শুরু হয়েছে; যদিও ২০০৭ সালে এ ভবনগুলো ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করে আরো দোকান তৈরি করা হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞরা। উচ্চ আদালতও নিউ মার্কেটকে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আর মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতি একে হেরিটেজ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে আবেদন করেছে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) খান মোহাম্মদ বিলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দোকান নির্মাণের একটি পরিকল্পনা রাজস্ব বিভাগ করেছে। তবে আমি বলেছি, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পেলে। এর পরও যদি কেউ ব্যক্তি উদ্যোগে তা করার চেষ্টা চালায়, তাহলে করপোরেশন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ’ তিনি আরো বলেন, ২০০৭ সালে এ মার্কেটের ব্যাপারে বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা একটি পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মূল্যায়ন, মার্কেটটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে নতুন করে দোকান নির্মাণের তৎপরতা সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিউ মার্কেটের ভবনগুলোতে ফ্লোর বাড়ানোর কোনো ফাইল এখনো আমার কাছে আসেনি। তাই এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। তবে জনগণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে কোনো অবৈধ দোকান তৈরি হলে তা উচ্ছেদ করা হবে। ’

ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ওই কমপ্লেক্সে চারটি মার্কেট আছে। এগুলো হলো—নিউ মার্কেট (মূল), নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ), বনলতা মার্কেট ও চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট (উত্তর)। এর মধ্যে প্রথমটি ছাড়া বাকি তিনটি মার্কেট তিন তলা। এবার এ তিনটি মার্কেটেই একটি করে ফ্লোর বাড়িয়ে আরো সাড়ে ছয় শ থেকে সাত শ দোকান তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্রতিটি দোকান ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করা হবে। মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির কতিপয় নেতাকে মৌখিকভাবে দোকান বিক্রির দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ২৯ আগস্ট ডিএসসিসির সভাকক্ষে বৈঠক করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সেখানে প্রধান প্রকৌশলী ও রাজস্ব বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দোকান নির্মাণের ওপর জোর দেন। তবে ২০০৭ সালের বুয়েটের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ উঠলে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ভবনের ফিটনেস যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়।

সভায় উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, যেখানে বুয়েট মতামত দিয়েছে তিনটি মার্কেট ব্যবহার অনুপযোগী এবং সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব ভেঙে ফেলা উচিত হবে, সেখানে ৯ বছর পর নতুন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ভবনের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেওয়ার উদ্যোগ সন্দেহজনক। দোকান তৈরির সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এখন লোকদেখানোর জন্য এ সার্টিফিকেট নেওয়ার আয়োজন। তিনি বলেন, নিউ মার্কেটে একটি দোকান ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। এমন মওকা তাঁরা ছাড়তে নারাজ। এর আগে মূল নিউ মার্কেটের এক তলা ভবনগুলো ভেঙে বহুতল করার পাঁয়তারা চালানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁরা তা বাস্তবায়িত করতে পারেননি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী মো. নূরুল্লাহ বলেন, “২০০৭ সালের বুয়েটের প্রতিবেদনে শুধু ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। দোকান করা যাবে না তা বলা হয়নি। আমরা দোকান করতে চাই। এ বিষয়ে নতুন করে ‘এক্সপার্ট অপিনিয়ন’ নেব। ”

নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বলেন, ‘সরকার যদি মার্কেট নির্মাণ করতে চায় আমরা বাধা দেব না। তবে এ বিষয়ে আমাদের কাছে যতবার প্রস্তাব এসেছে ততবারই বলেছি, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া কিছু করা যাবে না। ’ 

একাধিক ব্যবসায়ী জানান, নিউ মার্কেটের তিনটি ভবনে নকশাবহির্ভূতভাবে দোকান নির্মাণের অভিযোগ অনেক পুরনো। নিউ সুপার মার্কেটে (দক্ষিণ) অবৈধভাবে বেশ কিছু দোকান বানিয়ে বিক্রিও করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, কতিপয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে ডিএসসিসির সম্পত্তি ও রাজস্ব বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এ অবৈধ কাজে জড়িত। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ১৯৮৬ সালে এরশাদের শাসনামলে মাস্টারপ্ল্যান না মেনে নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ), বনলতা মার্কেট ও চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট (উত্তর) নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে নকশা অনুমোদন করায় সিটি করপোরেশন। নিউ মার্কেটের পার্কিং জোন দখল করে মার্কেটগুলো তৈরি করা হয়। ১ নম্বর গেট-সংলগ্ন মার্কেটের ভেতরে একটি পার্ক ছিল। সেখানেও ২০টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। আরেকটি ফাঁকা স্থানে মসজিদ নির্মাণ করে নিচতলায় মার্কেট করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজউক অনুমোদিত নকশায় মার্কেটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় দুই দোকানের মাঝখানে আট ফুট বাই ছয় ফুট আয়তনের ফাঁকা জায়গা রাখা ছিল। কিন্তু এখন সেসব ফাঁকা জায়গায় দোকান তৈরি করা হয়েছে। এসব অবৈধ দোকানের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হয়েও কোনো কাজ হয়নি। নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) অংশের দ্বিতীয় তলায় পূর্ব গেটের প্যাসেজে আটটি, গোলচত্বরে ২৪টি, নিচতলার পূর্ব গেটের পাশে তিনটি, উত্তর পাশে ২৩টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ফুট ওভারব্রিজ থেকে নিউ সুপার মার্কেটের (দক্ষিণ) প্রবেশপথের অর্ধেক অংশ দখল করে নির্মিত হয়েছে আরো বেশ কিছু দোকান। নিউ মার্কেটের মিরপুর রোড ও আজিমপুর রোড অংশে সীমানাপ্রাচীরের বাইরে ফুটপাতের ওপর ২০০ দোকান তৈরির পরিকল্পনা করা হলেও একটি রিট পিটিশনের পর উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা দেন। ফলে সে উদ্যোগ আটকে গেছে। এ ছাড়া চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট (উত্তর) অংশে গণশৌচাগারসংলগ্ন ফাঁকা জায়গা, দোতলা ও তৃতীয় তলায় নকশাবহির্ভূত ১১টি দোকান তৈরি করা হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) ও চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় আরো ১৫ থেকে ২০টি অস্থায়ী দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর কোনো বরাদ্দ নেই ডিএসসিসির। অবৈধ এসব দোকান থেকে সরকারদলীয় লোকজন ও ডিএসসিসির বাজার সার্কেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অর্থ পান। এ ছাড়া দুই ভবনে যাতায়াতের জন্য যে ওভারপাস রয়েছে এর গোড়ায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম বুথ খোলা হয়েছে। ক্রেতাদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদের ব্যাপারে কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) খালিদ আহম্মেদ বলেন, রাজস্ব বিভাগ মার্কেটগুলো দেখভাল করে। এখন তারাই যদি ভক্ষকের ভূমিকায় থাকে, তাহলে আর কী করার আছে।

নিউ মার্কেটের (মূল) একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ডিএসসিসির সাবেক প্রশাসক জিল্লার রহমান সর্বশেষ অবৈধ দোকান নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তিনি মসজিদের চারপাশে দোকান তৈরির উদ্যোগ নিলেও ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে সফল হতে পারেননি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুর প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহম্মদ আনসারী কালের কণ্ঠকে বলেন, যেকোনো ভবনে ফ্লোর বাড়াতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তা পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। তাঁরা ভবনের ফিটনেস দেখে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ছাড়পত্র দেন।

নিউ মার্কেটে আসা লোকজন ও ব্যবসায়ীদের জন্য বিশাল পার্কিং জোন ছিল। কিন্তু সেখানেও ভবন নির্মাণ করায় এখন আর পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত কোনো স্থান নেই। ফলে ১ নম্বর গেট-সংলগ্ন রাস্তার ওপর গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে নীলক্ষেত থেকে পিলখানা গেটের রাস্তাটিতে তীব্র যানজট থাকে। এ ছাড়া নিউ মার্কেটের ১ নম্বর গেট ডিএসসিসি ইজারা দিলেও বাকি তিনটি গেট-সংলগ্ন রাস্তাতেও যানবাহন পার্কিং করিয়ে অর্থ আদায় করেন ইজারাদার। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আজিমপুর থেকে মিরপুর রোডের প্রধান সড়কেও বিপুলসংখ্যক যানবাহন রাখা হয়। ফলে পুরো এলাকায় তীব্র যানজট লেগে থাকে। এ রাস্তার ইজারা না থাকলেও লোকজন টাকা আদায় করে একটি রিসিট ধরিয়ে দেয়।

নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এক নম্বর সমস্যা পার্কিং। মার্কেট তৈরির সময় এর জন্য প্রচুর জায়গা রাখা ছিল। কিন্তু এসব স্থানে দোকান করে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ। এখন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে আছি। ’

 থাকায় সিটি করপোরেশনের কতিপয় কর্মকর্তা আর ব্যবসায়ী মিলে শত শত দোকান নির্মাণ করছেন। যেখানেই একটু ফাঁকা জায়গা অবশিষ্ট ছিল, সেখানেই উঠেছে ভবন। খোলা জায়গা ফুরিয়ে যাওয়ার পরও ক্ষান্ত দেননি তাঁরা। এবার তিনটি মার্কেটের ছাদে আরো সাড়ে ছয় শ থেকে সাত শ দোকান নির্মাণের তোড়জোড় শুরু হয়েছে; যদিও ২০০৭ সালে এ ভবনগুলো ব্যবহার অনুপযোগী ঘোষণা করে আরো দোকান তৈরি করা হলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞরা। উচ্চ আদালতও নিউ মার্কেটকে ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আর মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতি একে হেরিটেজ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরে আবেদন করেছে।

এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (অতিরিক্ত সচিব) খান মোহাম্মদ বিলাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দোকান নির্মাণের একটি পরিকল্পনা রাজস্ব বিভাগ করেছে। তবে আমি বলেছি, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ পেলে। এর পরও যদি কেউ ব্যক্তি উদ্যোগে তা করার চেষ্টা চালায়, তাহলে করপোরেশন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। ’ তিনি আরো বলেন, ২০০৭ সালে এ মার্কেটের ব্যাপারে বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা একটি পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মূল্যায়ন, মার্কেটটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে নতুন করে দোকান নির্মাণের তৎপরতা সম্পর্কে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

ডিএসসিসির মেয়র সাঈদ খোকন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিউ মার্কেটের ভবনগুলোতে ফ্লোর বাড়ানোর কোনো ফাইল এখনো আমার কাছে আসেনি। তাই এ মুহূর্তে কোনো মন্তব্য করতে পারছি না। তবে জনগণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে কোনো অবৈধ দোকান তৈরি হলে তা উচ্ছেদ করা হবে। ’

ডিএসসিসির রাজস্ব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ওই কমপ্লেক্সে চারটি মার্কেট আছে। এগুলো হলো—নিউ মার্কেট (মূল), নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ), বনলতা মার্কেট ও চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট (উত্তর)। এর মধ্যে প্রথমটি ছাড়া বাকি তিনটি মার্কেট তিন তলা। এবার এ তিনটি মার্কেটেই একটি করে ফ্লোর বাড়িয়ে আরো সাড়ে ছয় শ থেকে সাত শ দোকান তৈরির তোড়জোড় শুরু হয়েছে। প্রতিটি দোকান ১০ থেকে ১২ লাখ টাকায় বিক্রি করা হবে। মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির কতিপয় নেতাকে মৌখিকভাবে দোকান বিক্রির দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে গত ২৯ আগস্ট ডিএসসিসির সভাকক্ষে বৈঠক করেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। সেখানে প্রধান প্রকৌশলী ও রাজস্ব বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা দোকান নির্মাণের ওপর জোর দেন। তবে ২০০৭ সালের বুয়েটের প্রতিবেদনের প্রসঙ্গ উঠলে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ভবনের ফিটনেস যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত হয়।

সভায় উপস্থিত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, যেখানে বুয়েট মতামত দিয়েছে তিনটি মার্কেট ব্যবহার অনুপযোগী এবং সেগুলো যত দ্রুত সম্ভব ভেঙে ফেলা উচিত হবে, সেখানে ৯ বছর পর নতুন করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ভবনের ফিটনেস সার্টিফিকেট নেওয়ার উদ্যোগ সন্দেহজনক। দোকান তৈরির সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। এখন লোকদেখানোর জন্য এ সার্টিফিকেট নেওয়ার আয়োজন। তিনি বলেন, নিউ মার্কেটে একটি দোকান ৩০ থেকে ৪০ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। এমন মওকা তাঁরা ছাড়তে নারাজ। এর আগে মূল নিউ মার্কেটের এক তলা ভবনগুলো ভেঙে বহুতল করার পাঁয়তারা চালানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাঁরা তা বাস্তবায়িত করতে পারেননি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী মো. নূরুল্লাহ বলেন, “২০০৭ সালের বুয়েটের প্রতিবেদনে শুধু ঝুঁকিপূর্ণ বলা হয়েছে। দোকান করা যাবে না তা বলা হয়নি। আমরা দোকান করতে চাই। এ বিষয়ে নতুন করে ‘এক্সপার্ট অপিনিয়ন’ নেব। ”

নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বলেন, ‘সরকার যদি মার্কেট নির্মাণ করতে চায় আমরা বাধা দেব না। তবে এ বিষয়ে আমাদের কাছে যতবার প্রস্তাব এসেছে ততবারই বলেছি, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ছাড়া কিছু করা যাবে না। ’ 

একাধিক ব্যবসায়ী জানান, নিউ মার্কেটের তিনটি ভবনে নকশাবহির্ভূতভাবে দোকান নির্মাণের অভিযোগ অনেক পুরনো। নিউ সুপার মার্কেটে (দক্ষিণ) অবৈধভাবে বেশ কিছু দোকান বানিয়ে বিক্রিও করা হয়েছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, কতিপয় ব্যবসায়ীর সঙ্গে ডিএসসিসির সম্পত্তি ও রাজস্ব বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী এ অবৈধ কাজে জড়িত। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ১৯৮৬ সালে এরশাদের শাসনামলে মাস্টারপ্ল্যান না মেনে নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ), বনলতা মার্কেট ও চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট (উত্তর) নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) থেকে নকশা অনুমোদন করায় সিটি করপোরেশন। নিউ মার্কেটের পার্কিং জোন দখল করে মার্কেটগুলো তৈরি করা হয়। ১ নম্বর গেট-সংলগ্ন মার্কেটের ভেতরে একটি পার্ক ছিল। সেখানেও ২০টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। আরেকটি ফাঁকা স্থানে মসজিদ নির্মাণ করে নিচতলায় মার্কেট করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজউক অনুমোদিত নকশায় মার্কেটের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় দুই দোকানের মাঝখানে আট ফুট বাই ছয় ফুট আয়তনের ফাঁকা জায়গা রাখা ছিল। কিন্তু এখন সেসব ফাঁকা জায়গায় দোকান তৈরি করা হয়েছে। এসব অবৈধ দোকানের বিরুদ্ধে আদালতের শরণাপন্ন হয়েও কোনো কাজ হয়নি। নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) অংশের দ্বিতীয় তলায় পূর্ব গেটের প্যাসেজে আটটি, গোলচত্বরে ২৪টি, নিচতলার পূর্ব গেটের পাশে তিনটি, উত্তর পাশে ২৩টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এ ছাড়া ফুট ওভারব্রিজ থেকে নিউ সুপার মার্কেটের (দক্ষিণ) প্রবেশপথের অর্ধেক অংশ দখল করে নির্মিত হয়েছে আরো বেশ কিছু দোকান। নিউ মার্কেটের মিরপুর রোড ও আজিমপুর রোড অংশে সীমানাপ্রাচীরের বাইরে ফুটপাতের ওপর ২০০ দোকান তৈরির পরিকল্পনা করা হলেও একটি রিট পিটিশনের পর উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা দেন। ফলে সে উদ্যোগ আটকে গেছে। এ ছাড়া চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট (উত্তর) অংশে গণশৌচাগারসংলগ্ন ফাঁকা জায়গা, দোতলা ও তৃতীয় তলায় নকশাবহির্ভূত ১১টি দোকান তৈরি করা হয়েছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, নিউ সুপার মার্কেট (দক্ষিণ) ও চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের মাঝখানে ফাঁকা জায়গায় আরো ১৫ থেকে ২০টি অস্থায়ী দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। এগুলোর কোনো বরাদ্দ নেই ডিএসসিসির। অবৈধ এসব দোকান থেকে সরকারদলীয় লোকজন ও ডিএসসিসির বাজার সার্কেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অর্থ পান। এ ছাড়া দুই ভবনে যাতায়াতের জন্য যে ওভারপাস রয়েছে এর গোড়ায় একটি বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম বুথ খোলা হয়েছে। ক্রেতাদের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদের ব্যাপারে কয়েকবার উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপসচিব) খালিদ আহম্মেদ বলেন, রাজস্ব বিভাগ মার্কেটগুলো দেখভাল করে। এখন তারাই যদি ভক্ষকের ভূমিকায় থাকে, তাহলে আর কী করার আছে।

নিউ মার্কেটের (মূল) একাধিক ব্যবসায়ী জানান, ডিএসসিসির সাবেক প্রশাসক জিল্লার রহমান সর্বশেষ অবৈধ দোকান নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তিনি মসজিদের চারপাশে দোকান তৈরির উদ্যোগ নিলেও ব্যবসায়ীদের আপত্তির মুখে সফল হতে পারেননি।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুর প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ও ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ড. মেহেদী আহম্মদ আনসারী কালের কণ্ঠকে বলেন, যেকোনো ভবনে ফ্লোর বাড়াতে হলে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের দিয়ে তা পরীক্ষা করিয়ে নিতে হবে। তাঁরা ভবনের ফিটনেস দেখে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ছাড়পত্র দেন।

নিউ মার্কেটে আসা লোকজন ও ব্যবসায়ীদের জন্য বিশাল পার্কিং জোন ছিল। কিন্তু সেখানেও ভবন নির্মাণ করায় এখন আর পার্কিংয়ের জন্য নির্ধারিত কোনো স্থান নেই। ফলে ১ নম্বর গেট-সংলগ্ন রাস্তার ওপর গাড়ি রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর ফলে নীলক্ষেত থেকে পিলখানা গেটের রাস্তাটিতে তীব্র যানজট থাকে। এ ছাড়া নিউ মার্কেটের ১ নম্বর গেট ডিএসসিসি ইজারা দিলেও বাকি তিনটি গেট-সংলগ্ন রাস্তাতেও যানবাহন পার্কিং করিয়ে অর্থ আদায় করেন ইজারাদার। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, আজিমপুর থেকে মিরপুর রোডের প্রধান সড়কেও বিপুলসংখ্যক যানবাহন রাখা হয়। ফলে পুরো এলাকায় তীব্র যানজট লেগে থাকে। এ রাস্তার ইজারা না থাকলেও লোকজন টাকা আদায় করে একটি রিসিট ধরিয়ে দেয়।

নিউ মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জহির উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের এক নম্বর সমস্যা পার্কিং। মার্কেট তৈরির সময় এর জন্য প্রচুর জায়গা রাখা ছিল। কিন্তু এসব স্থানে দোকান করে ফেলেছে কর্তৃপক্ষ। এখন ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে আছি। ’


মন্তব্য