kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সংসদে প্রধানমন্ত্রী

খাদিজার ওপর হামলাকারী শাস্তি পাবেই

যুদ্ধাপরাধীদের যারা মন্ত্রী বানিয়েছে তাদেরও বিচার হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



খাদিজার ওপর হামলাকারী শাস্তি পাবেই

‘যুদ্ধাপরাধী’দের যারা মন্ত্রী বানিয়েছে তাদেরও বিচার হবে বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে।

একইভাবে তাদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছে তাদেরকেও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। কারণ তারাও সমান অপরাধী। ’ গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।

কলেজ ছাত্রী খাদিজা হত্যাচেষ্টার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কে কোন দল করে, সেটি বিষয় নয়, যে অপরাধী তাকে শাস্তি পেতেই হবে। ’

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে সংসদ নেতা বলেন, ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আমাদের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল। আর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে নিজেকে নিজে রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করে জিয়াউর রহমান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বন্ধ করে দেন। যুদ্ধাপরাধীদের ছেড়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী-মন্ত্রী-উপদেষ্টা বানিয়ে পুনর্বাসন করেন। আর তাঁর স্ত্রী খালেদা জিয়া যেসব যুদ্ধাপরাধী

 সর্বোচ্চ আদালতে দণ্ডিত হয়েছে, দণ্ড কার্যকর হয়েছে, সেসব যুদ্ধাপরাধীকে মন্ত্রী বানিয়ে তাদের হাতে লাখো শহীদের রক্তস্নাত জাতীয় পতাকা তুলে দিয়েছিল। ’ তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘যারা যুদ্ধাপরাধীদের মন্ত্রী বানিয়েছিল তাদের কি বিচার হবে না? তাদেরও বিচার হওয়া উচিত। কেননা যে অপরাধ করে, আর যে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ও সমর্থন দেয় তারাও সমান অপরাধী। তাই বাংলার মাটিতে একদিন তাদেরও বিচার হবে। তাদের শাস্তি পেতে হবে। ’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জঙ্গি-সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থান নিয়েছি। জড়িতদের বিরুদ্ধে অবশ্যই কঠোর হতে হবে। ’ এ ব্যাপারে দেশবাসীকে সজাগ ও সতর্ক থাকার পাশাপাশি অভিভাবক ও শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সবাই নিজের ছেলেমেয়ে ও ছাত্রছাত্রীদের দিকে খেয়াল রাখুন। কে কী করছে, কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে তা নজরে রাখুন। ’

সমাপনী বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সিলেটে কলেজ ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসকে কুপিয়ে আহত করার ঘটনা উল্লেখ করে হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রকাশ্যে একটি মেয়েকে কোপানো হচ্ছে, পাশে দাঁড়িয়ে থেকে অনেকে ভিডিও করলেও ওই মেয়েটির জীবন বাঁচাতে এগিয়ে যায়নি! পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেদের হাতের কাছে কিছুই ছিল না? কেন সবাই মিলে একজোট হয়ে মেয়েটিকে রক্ষা করতে গেল না? কেন মানবিক মূল্যবোধ এভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে?’ তিনি আরো বলেন, ‘অপরাধীদের দল হিসেবে আমরা প্রশ্রয় দিচ্ছি না। অপরাধী অপরাধীই, সে যে দলেরই হোক। যে অপরাধী তাকে শাস্তি পেতেই হবে, কেউ রেহাই পাবে না। ’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কিছু পত্রিকা ও মানুষ এটাকে দলীয় হিসেবে প্রচারের চেষ্টা করছে। এটা কি রাজনৈতিক বা দলীয় কোন্দল ছিল? এটা কী কারণে হয়েছে তা সবাই জানে, পত্রপত্রিকায়ও এসেছে। প্রেম প্রত্যাখ্যাত হওয়ায় এই হামলার ঘটনা ঘটেছে। তার পরও এ বিষয়ে দলীয় রং লাগানো হচ্ছে। ’ বিএনপির সমালোচনার জবাবে সংসদ নেতা বলেন, ‘আন্দোলনের নামে বিএনপি-জামায়াত জোট প্রকাশ্যে মানুষের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করেছে। প্রকাশ্য মানুষ হত্যা, নৃশংসতা ও কুপিয়ে আহত করার পশুত্বের পথ তো এই বিএনপি-জামায়াত জোটই শিখিয়ে দিয়ে গেছে। তাদের দেখানো অমানবিকতার ঘটনার রেশই তো এখনো চলছে। ’

যারা মানুষ পুড়িয়ে মেরেছে তাদের অবশ্যই বিচার হবে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তাঁরা (বিএনপি-জামায়াত নেতারা) মামলার কথা বলেন। তাঁরা যে নির্বিচারে মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করলেন, জীবন্ত মানুষের গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করলেন, তার কি কোনো বিচার হবে না? যারা মানুষকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে, নাশকতা চালিয়ে দেশের সম্পদ বিনষ্ট করেছে তাদের অবশ্যই বিচার হবে, শাস্তি তাদের পেতেই হবে। ’ বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধ-হরতালের নামে নির্বিচারে পুড়িয়ে মানুষ হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া প্রতিজ্ঞা করেছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন না ঘটিয়ে তিনি ঘরে ফিরে যাবেন না। এ জন্য তিনি প্রকাশ্যে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে শত মানুষকে হত্যা করলেন, দেশের কোটি কোটি টাকার সম্পদ ধ্বংস করলেন। ’

ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান : ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি বজায় থাকুক—এটাই আমরা চাই। কোনো রকম সংঘাত বা উত্তেজনা হোক—এটা আমরা চাই না। যেকোনো দেশই হোক, কোনো দেশের মধ্যে সংঘাত হলে বাংলাদেশও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ’ ভারত ও পাকিস্তান সরকারের প্রতি উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি উভয় দেশকে আহ্বান জানাব, তারা যেন সংযত আচরণ করে, কোনো উত্তেজনা যেন সৃষ্টি না হয়। ’

বাংলাদেশের উন্নয়ন বিশ্বের কাছে বিস্ময় : সরকারের উন্নয়ন ও সফলতা তুলে ধরতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ সবদিক থেকে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, তা প্রমাণিত। অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থাও তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। সারা বিশ্বের কাছে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেয়েছে। বিশ্ববরেণ্য অনেক নেতাও বাংলাদেশের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। উন্নয়নে বিস্ময় প্রকাশ করে অনেকে কী ম্যাজিকে এটা সম্ভব হলো তাও জানতে চেয়েছে। আমি তাদের বলেছি, কোনো ম্যাজিক নয়, বরং দেশের মানুষের কল্যাণ ও উন্নয়নের চিন্তা নিয়ে কাজ করেছি বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। ’

অধিবেশন সমাপ্ত : প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশন সমাপ্তি-সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির আদেশ পড়ে শোনান। ওই সময় তিনি বলেন, ‘মাত্র ১০ কার্যদিবসের এই অধিবেশন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অধিবেশনে মোট ছয়টি বিল পাস হয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধাপরাধ ও জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। ’ তিনি আরো বলেন, এই অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তরের জন্য ১৫৬টি প্রশ্ন পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২৮টি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আর মন্ত্রীদের জন্য পাওয়া দুই হাজার ৬৭টি প্রশ্নের মধ্যে এক হাজার ৬৬৮টি প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৭১ বিধিতে ১৫৬টি মনোযোগ আকর্ষণীয় নোটিশ পাওয়া যায়। তিনি সংসদীয় কার্যক্রমে আগামী দিনে আরো বেশি সক্রিয় হওয়ার জন্য সংসদ সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান।


মন্তব্য