kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চট্টগ্রামের সেই নবজাতক মারা গেছে

২ চিকিৎসককে অব্যাহতি

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



চট্টগ্রামের সেই নবজাতক মারা গেছে

হাসপাতাল থেকে সন্তানের মরদেহ কোলে নিয়ে বেরিয়ে আসছেন মা ডা. রিদওয়ানা কাউসার। পাশে বাবা ডা. নুরুল আজম। ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রামে বেসরকারি বিশেষায়িত সিএসসিআর হাসপাতালে মৃত ঘোষণা করা জীবিত নবজাতক ৩৬ ঘণ্টা পর গতকাল বুধবার দুপুর পৌনে ২টায় ম্যাক্স প্রাইভেট হাসপাতালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।

এদিকে জীবিত নবজাতককে ‘মৃত’ উল্লেখ করে সনদ প্রদানকারী সিএসসিআর হাসপাতালের প্রসূতি বিভাগের চিকিৎসক রুমা আক্তার ও এনআইসিইউর চিকিৎসক ইকবাল হোসাইনকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

গতকাল বুধবার বিকেলে হাসপাতাল প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নেয়। এ ছাড়া প্রফেসর ডা. ইমরান বিন ইউনূসকে প্রধান করে তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে সিএসসিআর। এ কমিটির অন্য দুজন হলেন ডা. সানাউল্লাহ শেলি ও ডা. সালাউদ্দিন মাহমুদ।

বিষয়টি নিশ্চিত করে সিএসসিআর হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. সালাউদ্দিন মাহমুদ গত রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সিভিল সার্জন কার্যালয় ও আমরা আলাদাভাবে এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। মঙ্গলবার গঠন করা এক সদস্যের তদন্ত কমিটি আজকে (গতকাল) প্রতিবেদন দেয়নি। আরো সময় চেয়েছে। বুধবার গঠন করা তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দেবে। তাদের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসক ইকবাল হোসাইন ও রুমা আক্তারের  সব ধরনের কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে। ’

ম্যাক্স হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলী খান বলেন, ‘আজ দুপুর পৌনে ২টার দিকে এনআইসিইউতে শিশুটি মারা গেছে। আমরা শিশুটিকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। মেডিক্যাল বোর্ড করেছি। সব চেষ্টা ব্যর্থ করে সে মারা গেছে। মরদেহটি তার মা-বাবাকে হস্তান্তর করা হয়েছে। ’

চট্টগ্রামের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. অজয় কুমার দে বলেন, ‘আমরা আজকে (বুধবার) দুপুর ২টা থেকে তদন্তকাজ শুরু করেছি। আগামী রবিবার প্রতিবেদন দাখিল করব। আমাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সিভিল সার্জন মহোদয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে জমা দেবেন। ’

অভিযোগ উঠেছে, মৃত্যুর সনদ লেখা চিকিৎসক রুমা বৈধ চিকিৎসক নন। তিনি চট্টগ্রামের বেসরকারি বিজিসি ট্রাস্ট মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে বর্তমানে ইন্টার্নি করছেন। নিয়ম অনুযায়ী, ইন্টার্নি করার পর বিএমডিসির সার্টিফিকেট পেলে তারপর রোগী দেখার কথা। তা না মেনেই চট্টগ্রামের বেসরকারি সেন্টার ফর স্পেশালাইজড কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ (সিএসসিআর) হাসপাতালে অবাধে রোগী দেখা শুরু করেন রুমা।

এ হাসপাতালের পরিচালক ও পরিচালক (মার্কেটিং) হলেন বিজিসি ট্রাস্ট মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এস এম তারেক। রুমা চিকিৎসক না হলেও তাঁকে গাইনি ডাক্তার হিসেবে পাশে রেখেই ডেলিভারি করান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. শাহেনা আক্তার; ডা. রিদওয়ানা কাউসারের অপরিণত শিশু অপারেশন করান। ডা. শাহেনা চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজের গাইনি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি হাসপাতালের একটি ওয়ার্ডেও কাজ করেন।

নিয়ম অনুযায়ী, অপরিণত শিশু (২৭ সপ্তাহ) ডেলিভারির সময় শিশু ও নবজাতক বিশেষজ্ঞ রাখার পাশাপাশি ডেলিভারি-পরবর্তী ব্যবস্থাগুলো ওই হাসপাতালে আছে কি না তা নিশ্চিত করা কথা ডা. শাহেনা আক্তারের। কারণ তাঁর অধীনে ডা. রিদওয়ানা কাউসার প্রসবের জন্য ভর্তি হন সিএসসিআরে। কিন্তু সিএসসিআর এ এনআইসিইউ-আইসিইউ দুটি বিভাগ থাকলেও সেখানে রাত্রিকালীন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিল না। অদক্ষ চিকিৎসক ও কর্মচারী দিয়ে চলছে এনআইসিইউ।

রুমার বিষয়ে জানতে চাইলে গতকাল বুধবার সিএসসিআর হাসপাতালের পরিচালক ও বিজিসি ট্রাস্ট মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এস এম তারেক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ বিষয়ে খবর নিতে হবে। খবর না নিয়ে কিছু বলতে পারব না। ’

সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহেনা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। সিএসসিআর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার তানভীর জাফর গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘রুমা বিজিসি ট্রাস্ট মেডিক্যাল থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। তিনি ইন্টার্ন নন। তাঁর ডাক্তারি সার্টিফিকেট আছে। আমাদের এখানে কোনো ইন্টার্ন চিকিৎসক নেই। ’

এ সময় রুমার বিষয়ে একাধিক প্রশ্ন করা হলে তিনি তা এড়িয়ে গেছেন। বলেন, ‘আমি মিটিংয়ে ব্যস্ত, পরে কথা বলব। ’

উল্লেখ্য, প্রসব বেদনা নিয়ে বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডেন্টাল সার্জন ডা. রিদওয়ানা কাউসার গত সোমবার রাতে সিএসসিআর হাসপাতালে ভর্তি হন। রিদওয়ানার স্বামী কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার নুরুল আজম। ওই রাত ১টার দিকে রিদওয়ানা কন্যাসন্তান প্রসব করেন। এটি চিকিৎসক দম্পতির প্রথম সন্তান। ডেলিভারিতে কনসালট্যান্ট ছিলেন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শাহেনা আক্তার। ডা. শাহেনা নবজাতককে এনআইসিইউতে ভর্তি করার পরামর্শ দিলে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর মা ডা. রিদওয়ানা কাউসারের ৬১২ নম্বর কেবিনে তাঁর প্রসব করা কন্যাসন্তান মারা গিয়েছে জানিয়ে ‘প্যাকেটবন্দি মরদেহ’ এবং মৃত্যু সনদ নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর নবজাতককে বাঁচানোর জন্য রাত সাড়ে ৩টার দিকে প্রবর্তক মোড়ে চাইল্ড কেয়ার নামক একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার পর আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য মেহেদীবাগের ম্যাক্স হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। মঙ্গলবার ভোর ৫টার দিকে বেসরকারি ওই হাসপাতালে ভর্তির পর গতকাল দুপুর পৌনে ২টায় মারা যায় নবজাতক কন্যাসন্তানটি।


মন্তব্য