kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চীনের প্রেসিডেন্টের সফর

প্রস্তাবের পাহাড়, চুক্তি হতে পারে পাঁচটি

আরিফুর রহমান   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



প্রস্তাবের পাহাড়, চুক্তি হতে পারে পাঁচটি

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের আসন্ন সফর ঘিরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো প্রস্তাবের পাহাড় জমেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। সবাই চাইছে তাদের প্রস্তাব আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হোক।

ফলে শেষ পর্যন্ত চীনের প্রেসিডেন্টের সামনে কী কী বিষয় তুলে ধরা হবে তা চূড়ান্ত করতে হিমশিম খাচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। এ নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক চলছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে। তবে সূচিতে কী কী থাকবে তা চূড়ান্ত করতে আরো কয়েক দিন সময় লাগবে বলে জানা গেছে। আগামী ১৪ অক্টোবর বাংলাদেশে আসছেন শি চিনপিং।

সব মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা প্রত্যাশা করছেন, তাঁদের চাহিদা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সব মন্ত্রণালয়ের সব প্রস্তাব আলোচ্যসূচিতে থাকবে না। অনেক কিছুই বাদ পড়বে। এখন চলছে প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের কাজ। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, চীনের প্রেসিডেন্টের সফর নিয়ে এখনো কোনো কিছুই চূড়ান্ত হয়নি। তাই বলারও সময় হয়নি। সব কিছু চূড়ান্ত করতে আরো সময় লাগবে। সফর ঘিরে গতকাল বুধবার বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

জানা যায়, সর্বশেষ গত সোমবার সেতু বিভাগ থেকে একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিনের কাছে। তাতে অনুরোধ জানানো হয়েছে, ‘চীনের প্রেসিডেন্টের সফরের সময় যেন ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও ঢাকা-চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচনায় রাখা হয়। ’ গত রবিবার বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে পাঠানো চিঠিতে বিদ্যুতের গুরুত্বপূর্ণ ২২টি প্রকল্পে দুই হাজার ৭০০ কোটি ডলার (সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা) বিনিয়োগ করতে চীনের কাছে অনুরোধ জানানোর কথা বলা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও নিজের মন্ত্রণালয়ের প্যাডে ২৫টি প্রকল্পের জন্য দেড় লাখ কোটি টাকার বিনিয়োগ প্রস্তাব দিয়ে রেখেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) আশা করছে, শি চিনপিংয়ের সফরে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীনের জন্য প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজের উদ্বোধন করা হবে। চীনের অর্থায়নে ভবিষ্যতে যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে সেগুলোতে ঋণের সুদের হার কমানোর প্রস্তাব তৈরি করে রেখেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। ঋণের শর্ত শিথিলেরও অনুরোধ থাকবে।

এ ছাড়া কোন কোন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে তা নিয়ে কাজ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিনিয়তই সমঝোতা স্মারক সইয়ের জন্য প্রস্তাব যাচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ, রেল ও সড়কের প্রস্তাবই বেশি। যেসব বিষয় এখনো আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং ও মন্ত্রিসভায় অনুমোদনের বাকি আছে, সেগুলো আগামী সপ্তাহের মধ্যে অনুমোদন করতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে গত রবিবার যে ২২টি প্রকল্প পাঠানো হয়েছে সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, পটুয়াখালীর পায়রায় ১৩২০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, কক্সবাজারের পেকুয়ায় ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ও কক্সবাজারের মহেশখালীতে ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব প্রস্তাব নিয়ে ইতিমধ্যে আলোচনা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তারা। গত রবিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, রপ্তানি বাড়ানোসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। এ ছাড়া প্রযুক্তির হস্তান্তর, চীনের জন্য শিল্প এলাকা তৈরি, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পার্ক নির্মাণ নিয়েও আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এখন পর্যন্ত যতটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে তা হলো, শি চিনপিংয়ের সফরে চূড়ান্ত চুক্তি হতে পারে পাঁচটি। বাকি যা হবে তার সবই সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই। দুই দেশের মধ্যে একটি ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট হওয়ারও কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্র বলছে, কর্ণফুলী নদীর তলদেশ দিয়ে টানেল নির্মাণের প্রকল্পের বিষয়ে চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে চুক্তি সই হওয়ার বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। এ প্রকল্পে খরচ হবে সাড়ে আট হাজার কোটি টাকার মতো, যার মধ্যে চীন সরকার ঋণ দেবে সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া পদ্মা নদী থেকে পানি শোধন করে রাজধানীবাসিকে সরবরাহের জন্য নেওয়া পদ্মা জশলদিয়া প্রকল্প ও ছয়টি জাহাজ কেনা প্রকল্পের ঋণ চুক্তিও চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ডিপিডিসি (ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড) ও পিজিসিবি-কে (পাওয়ার গ্রিড কম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেড) শক্তিশালীকরণ প্রকল্পও চূড়ান্ত চুক্তি সই হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।  

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, শি চিনপিংয়ের সফরে তাদের দেওয়া ঋণের সুদের হার কমানোর অনুরোধ জানানো হবে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে। বর্তমানে চীনের ঋণের সুদের হার ২ শতাংশ। এ ছাড়া কমিটমেন্ট ফি ও ম্যানেজমেন্ট ফি আরো ০.৫০ শতাংশ। চীনের ঋণের সুদের হার ১.৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার অনুরোধ করবে সরকার। চীন থেকে ঠিকাদার নিয়োগের যে শর্ত রয়েছে, সেটিও শিথিলের অনুরোধ থাকবে।

তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের এক নীতিনির্ধারক কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে যে উচ্চাশা করা হচ্ছে, তার সবটা পূরণ নাও হতে পারে। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরেও বড় ধরনের প্রত্যাশা ছিল বাংলাদেশের। কিন্তু তা পূরণ হয়নি। ওই সফরে চুক্তির চেয়ে সমঝোতা স্মারকই বেশি হয়েছিল। এবারও তা-ই হতে পারে। অবশ্য সমঝোতা স্মারক হওয়াটাকেও এক ধরনের সফলতা হিসেবে মনে করেন ওই নীতিনির্ধারক। তাঁর ভাষায়, এর মাধ্যমে ভবিষ্যৎ পথচলা সহজ হবে।


মন্তব্য