kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


১০ টাকার চালে চালিয়াতি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



১০ টাকার চালে চালিয়াতি

দিনমজুর কাঞ্চন (৪৩)। কাজ না পেলে সংসার চলে না।

কাজের সন্ধানে অনেকবার ঢাকায়ও এসেছেন। সেই কাঞ্চনের কপালে সরকারের ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির’ ১০ টাকার চালের কার্ড জোটেনি। তবে এই ‘খাদ্যবান্ধব কার্ড’ জুটেছে আকমল হোসেনের, যিনি বিদ্যুৎ বিভাগে ভালো বেতনে চাকরি করেন, যাঁর আছে আধাপাকা বাড়ি, সহায় সম্পত্তি। কাঞ্চন ও আকমল—দুজনের বাড়িই লালমনিরহাটে। এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে বিভিন্ন জেলায়।

শুধু এই অভিযোগই নয়; জনপ্রতিনিধি, খাদ্য কর্মকর্তা ও ডিলারের যোগসাজশে চাল আত্মসাৎ; মৃত বক্তি ও একজনের নামে একাধিক কার্ড বরাদ্দ; অসহায় মানুষকে বাদ দিয়ে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের আত্মীয়স্বজন, ক্ষমতাসীন দলের সচ্ছল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নামে কার্ড বিতরণ; টাকার বিনিময়ে কার্ড বিতরণ এবং দলীয় কোন্দলে তালিকা পরিবর্তনের অভিযোগও পাওয়া গেছে। কোথাও কার্ড পেয়েছেন স্বয়ং ডিলার। অনেক স্থানে গত সেপ্টেম্বর মাসের বরাদ্দকৃত চাল এখনো বিতরণ করা হয়নি। এ ছাড়া ডিলার নিয়োগে দলীয় চাপ এবং খাদ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে তালা দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কুড়িগ্রামে গত ৭ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে এই খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি উদ্বোধন করেছিলেন। কর্মসূচি অনুযায়ী ক্ষেতখামারে কাজ থাকবে না—এমন মৌসুমে দিনমজুর, অসহায়, দুস্থ, প্রতিবন্ধী, বিধবা ও বিবাহবিচ্ছেদের শিকার নারীদের মধ্যে প্রত্যেককে ১০ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি চাল দেওয়া হবে। কর্মসূচির লক্ষ্য ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী সেদিন ঘোষণা করেছিলেন, একজন মানুষও যেন না খেয়ে না থাকে। দুস্থ শব্দটি তিনি চিরতরে বিদায় করার ইচ্ছার কথাও ব্যক্ত করেন।

কার্ড ও চাল বিতরণে অনিয়ম : কার্ড বিতরণে অনিয়মের সব অভিযোগ ছাপিয়ে গেছে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার টংভাঙ্গা ইউনিয়ন। স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের টানাপড়েনে পড়ে তালিকা প্রণয়ন কমিটির ১৩৮২ জনের তালিকা বাছাই কমিটির কাছে যেতে না যেতেই প্রায় পুরো তালিকাটিই পরিবর্তনের অভিযোগ উঠেছে। এ কাজ করে দলটির প্রভাবশালী পক্ষের লোকজনের নামে কার্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো অভিযোগ করেছে। বিষয়টি নিয়ে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানসহ অধিকাংশ সদস্য গত বুধবার স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ ২০ জনকে অভিযুক্ত করে লালমনিরহাটের আদালতে মামলা করেন। তবে পরদিন আদালত সেটি খারিজ করে দেন।

ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আতিয়ার রহমান আতি অভিযোগ করে বলেন, ‘আমরা বিধি মেনে তালিকা জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু তা অন্যায়ভাবে বাতিল করে হাতে লেখা তালিকা তৈরি করে অপেক্ষাকৃত বিত্তবানদেন কার্ড দেওয়াসহ নানা অনিয়ম করা হয়েছে। ’ চেয়ারম্যানের অভিযোগের সত্যতাও মিলেছে। যেমন ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হেলাল উদ্দিনের ছেলে সাজু ইসলামের নাম রয়েছে হাতে লেখা তালিকায় (ক্রমিক নম্বর ৫৩)। তাঁদের রয়েছে চালের আড়ত, মুদি দোকান। আছে দুটি ট্রাক, পাকা বাড়িসহ আরো সম্পত্তি।

কার্ড বিতরণে দুস্থদের পরিবর্তে সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম রয়েছে আদিতমারীর বিভিন্ন উপজেলায়। এর মধ্যে কালীগঞ্জ উপজেলার চলবলা ইউনিয়নের বান্দেরকুড়া (গোয়ালটারী) গ্রামের দিনমজুর কাঞ্চন (৪৩) কার্ড পাননি। তবে কার্ড পেয়েছেন পাশের উপজেলা আদিতমারীর সারপুকুর ইউনিয়নের বিভার গ্রামের বাসিন্দা আকমল হোসেন। যিনি লালমনিরহাট বিদ্যুৎ বিভাগে সুইস বোর্ড অ্যাটেনডেন্ট (এসবিএ) হিসেবে ভালো বেতনে চাকরি করেন। আছে আধাপাকা বাড়িসহ আরো সহায় সম্পত্তি। একই গ্রামের কার্ডবঞ্চিত কয়েকজন দুস্থ অভিযোগ করেন, ‘শুধু আকমলই নয়, এখানকার সাবেক ইউপি সদস্য মমতাজ উদ্দিন, গত নির্বাচনে অংশ নিয়ে হেরে যাওয়া চেয়ারম্যান প্রার্থী আজিজুল ইসলাম, দেলা মিয়াসহ অনেকেই ১০ টাকায় চাল পাচ্ছেন অথচ আমরা পাচ্ছি না। ’

নতুন তালিকায় একই ওয়ার্ডের (ক্রমিক নম্বর-৪৪) মোকছেদুলের ছেলে ওবায়দুলেরও নাম হয়েছে সেখানে। তিনি কার্ড পাওয়ার কিছুটা যোগ্য হলেও তালিকার ৯৭ নম্বর ক্রমিকে নামের বানান আংশিক পরিবর্তন (‘ওবায়দার’ ও বাবার নাম ‘মকছুল’) করে তাঁর নামে আরেকটি কার্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দুটি কার্ডেরই জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর (৫২১৩৩৯৫৭৬৭৮৮৯) এক। এ ব্যাপারে তালিকা প্রণয়ন কমিটির সভাপতি ও হাতীবান্ধা উপজেলা পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা আবদুল করিম সন্তোষজনক জবাব দিতে পারেননি।

কার্ড বিতরণ নিয়ে শুরুতেই অভিযোগ ওঠে আদিতমারী উপজেলার পলাশী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত চেয়ারম্যান শওকত আলীর ছোট ভাই শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে। তিনি কার্ডপ্রতি ১৮০ টাকা করে আদায় করছেন বলে অভিযোগ। এ নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন কার্ডপ্রাপ্তদের অনেকে। অভিযোগ পেয়ে মন্ত্রী দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন ইউএনওকে।

কুড়িগ্রামের উজিরপুর উপজেলায় পান্ডুল ইউনিয়নে দলীয় সুবিধাভোগীকে কার্ড দেওয়ার জন্য উপজেলা খাদ্য অফিস থেকে কাগজপত্র ফিরিয়ে আনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ। পরে পুনরায় তালিকা তৈরি করা হয়। ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল জব্বার মঙ্গা সরকার দলের চাপের কথা স্বীকার করে বলেন, ‘হতদরিদ্র না হলে কাউকে কার্ড দেওয়া হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে সমন্বয় করা হচ্ছে। ’ দুর্গাপুর ইউনিয়নসহ কয়েকটি ইউনিয়নে একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলার হরিণচড়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শালমারা গ্রাম। ওই ওয়ার্ডে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণের ১১৫ কার্ডের বিপরীতে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। বুধবার দুপুরে সরেজমিনে ওই গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের শালমারা গ্রামে নরেশ চন্দ্র রায়ের ছেলে বনমালী রায়ের (৩৫) পাকা সড়কের ধারে তাঁর সুনসান আধাপাকা বাড়ি। বাড়ির বাইরে দাঁড় করানো ছিল তাঁর ব্যহূত মোটরসাইকেল। ১০ টাকা কেজি দরে চালের তালিকায় সেই বনমালী রায়ের নাম পাওয়া যায় ওই ওয়ার্ডের ১২২৯ নম্বর ক্রমিকে।

ডোমারের হরিণচড়া ইউনিয়নের একই ওয়ার্ডের নীলাহাটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেছে অনেক বড় এলাকা নিয়ে রশিদুল ইসলামের (৬৫) রাইস মিল ও চাতালের সঙ্গে লাগোয়া বাড়ি। বুধবার দুপুরে সেখানে কাজ চলছিল ধান শুকানোর। তালিকার ১২১৮ ক্রমিকে রয়েছে তাঁর নাম। এ সময় রশিদুল ইসলাম স্বল্পমূল্যের চাল বিতরণের তালিকায় তাঁর নাম থাকার কথা স্বীকার করে বলেন, ‘আমি কখনো ওই কার্ড চাইনি। হঠাৎ তালিকায় নাম দেখে চমকে উঠেছি। ’ এ সময় তাঁর ছেলে মনোয়ার হোসেন (৩৫) বলেন, ‘কার্ড দেখে প্রথমে জানছিলাম তেল, চিনি পাব। এখন দেখছি চাল দিচ্ছে। ’

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নে একই অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই ইউনিয়নের এ তালিকায় হতদরিদ্রদের নাম বাদ দিয়ে এলাকার ‘বড়লোক’ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে তাঁদের কাছে চাল বিক্রি করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রামনগর ইউনিয়নের এক হাজার দুইজন সুবিধাভোগীর মধ্যে রামনগর গ্রামের মনোরঞ্জন দাস, মোসলেম কারিকর, হারুন কারিকর, বকুল প্রামানিক, কুঞ্জনগর গ্রামের সেফার মাতবর, রাধানগর গ্রামের সামাদ সিকদার, গজগা গ্রামের ফারুক মণ্ডলসহ এলাকার শতাধিক স্বচ্ছল ব্যক্তির নাম তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এঁদের কারো বাড়িতে বড় পাকা ভবন রয়েছে। আবার কেউ বড় ব্যবসায়ী, কয়েকজন অনেক জমির মালিক এবং কোনো কোনো পরিবারের সদস্যরা প্রবাসী।

কুমিল্লার বুড়িচংয়ে ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্যদের পরিচিতরা কার্ড পেলেও অনেক অসহায় মানুষ কার্ড পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর ডিলাররা জনবহুল বাজারে চাল বিক্রির কথা থাকলেও তা করছেন নিজেদের পছন্দের এলাকায়। জেলার বুড়িচংয়ের কয়েকজন ভুক্তভোগী জানায়, প্রত্যেক ইউনিয়নের ডিলাররা এলাকার জনবহুল স্থান বাজারে এই চাল বিতরণের নিয়ম থাকলেও ডিলাররা সেখানে বিক্রি না করে তাঁদের ইচ্ছেমতো স্থান নির্ধারণ করে দেয়। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ ভোগান্তির শিকার হয়।

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল পাওয়ার কার্ড পেয়েছেন একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য। এই কার্ডের বিপরীতে ইতিমধ্যে তিনি সেপ্টেম্বর মাসের বরাদ্দের ৩০ কেজি চাল উত্তোলন করেছেন। উপজেলার ভাটগ্রাম ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) আবু সালাম এ কার্ড পেয়েছেন। ইউপি সদস্য আবু সালাম নিজের নামে কার্ড বরাদ্দ নেওয়া এবং প্রথম কিস্তিতে ৩০ কেজি চাল উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ‘সামান্য কিছু জমিজমা থাকলেও আমি অভাবে আছি। অভাবের কারণেই নিজের নামে একটা কার্ড বরাদ্দ নিয়েছিলাম। ’

মারা যাওয়ার দুই বছর পরও ১০ টাকা কেজির চাল উত্তোলন করেছেন বগুড়ার শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের সাধুবাড়ী গ্রামের জিয়ারুন বিবি। তবে ১০ টাকা কেজির চালের তালিকায় জিয়ারুন বিবির নাম থাকলেও তিনি কিংবা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্য এই চাল পাননি। স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট এই চাল উত্তোলন করে কালোবাজারে বিক্রি করেছে। শুধু মৃত ব্যক্তি নন, এই উপজেলার তালিকায় ব্যবসায়ী, সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উত্তোলন করছে স্বল্পমূল্যের এই চাল। এর কারণে দুই দিনেই বিক্রি শেষ হয়ে গেছে বরাদ্দ দেওয়া চলতি মাসের ৩৩৬ টন চাল।

অনুসন্ধানকালে দেখা গেছে, বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলায় ফেয়ার প্রাইস কার্ডের চাল কালোবাজারি সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই সিন্ডিকেট পরিচালিত করছে ক্ষমতাসিন দল আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।

ডিলার নিয়োগে দলীয় চাপ ও অনিয়ম : লালমনিরহাটের আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের জন্য নির্ধারিত দুজন ডিলারের একজন হচ্ছেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মিজানুর রহমান মিজানের বাবা ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম এবং ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি আব্দুল মান্নান সাজুর বাবা আব্দুস সামাদ। তাঁদের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজেরাই সুবিধাভোগীর তালিকা তৈরি করেছেন দুই ডিলারের স্বজনরা, যেগুলোতে রয়েছে নানা অসংগতি।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায় ডিলার নিয়োগে পছন্দের প্রার্থী বাদ পড়ায় গত সোমবার উপজেলা খাদ্য বিভাগের কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় ইউপি চেয়ারম্যানের সমর্থকরা। এ সময় লাঞ্ছিত হন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা চেয়ারম্যান আলী সরদার বলেন, ‘আমরা সাত চেয়ারম্যান একটি করে ডিলার নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিলাম। কিন্তু কমিটি তা বিবেচনা করেনি। এ জন্য আমি বিক্ষুব্ধ হয়ে তালা লাগিয়ে দিয়েছি। ’

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলায় ২৫ জন ডিলারের স্থলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে মাত্র ১২ জনকে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের তদবির সমন্বয় করতে না পারায় এ বিলম্ব হয়। ফুলবাড়ী উপজেলায় ১৮ জন ডিলার নিয়োগ না দিয়ে দেওয়া হয়েছে ২০১১ সালের পল্লী রেশনিং ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুসরণ করে ১২ জনকে। ডিলার চূড়ান্ত হয়নি রাজারহাট ও উলিপুর উপজেলায়ও।

বগুড়ার শাজাহানপুর উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে দুটি করে মোট ৯টি ইউনিয়নে ১৮ জন ডিলার নিয়োগ করা হয়েছে। নিয়োগ হওয়া ডিলাররা সবাই সরকারি দলের নেতাকর্মী। ডিলার নিয়োগপ্রাপ্ত অন্য নেতারা হলেন আড়িয়া ইউনিয়নে উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আলমগীর হোসেন স্বপন, চোপীনগর ইউনিয়নে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মোল্লা, মাঝিড়া ইউনিয়নে উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি রুবেল সরকার, মাদলা ইউনিয়নে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল বারী মণ্ডল, আশেকপুর ইউনিয়নে জেলা ছাত্রলীগের সাবেক উপবিভাগীয় সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, আমরুল ইউনিয়নে উপজেলা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান লিটন, খরনা ইউনিয়নে ইউনিয়ন ছাত্রলীগ সভাপতি বাহারাম বাদশা, খোট্রাপাড়া ইউনিয়নে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আবুল বাশার ও গোহাইল ইউনিয়নে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুর রহমানের ছেলে আব্দুল হাকিম, আড়িয়া ইউনিয়নে উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আলমগীর হোসেন স্বপন। উপজেলা হতদরিদ্র তালিকা যাচাই কমিটির সদস্যসচিব ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ওমর ফারুক জানান, নীতিমালা মেনেই সব ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

এখনো চাল বিতরণ হয়নি : কুড়িগ্রামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির অন্তত ২০ হাজার সুবিধাভোগী সেপ্টেম্বর মাসের জন্য ১০ টাকায় নির্ধারিত চাল ক্রয় করতে পারেনি। পরবর্তী সময়ে সেই চাল পাবে কি না তা নিয়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা।

কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মধ্যে ১৪ টন চাল বিক্রি হলেও তিনটি ইউনিয়নে এখনো ৫০ শতাংশ চাল বিক্রি হয়নি। এদিকে দেবিদ্বার উপজেলার ডিলাররা বস্তাপ্রতি চাল কম পান বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বুড়িচং উপজেলার ৯টি ইউনিয়নের মধ্যে বুড়িচংয়ের ৩ নম্বর সদর ইউনিয়নে সেপ্টেম্বর মাসে আসা ৫০ শতাংশ চালও বিতরণ করা হয়নি বলে জানা গেছে।

চাল আত্মসাৎ, বিক্রি, ট্রাক জব্দ, আটক ৭ : কোনো কোনো ইউনিয়নের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বরাদ্দ পাওয়া পুরো চালই কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাল আত্মসাৎ, কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে গত কয়েক দিনে বিভিন্ন স্থান থেকে সাতজনকে আটক করা হয়েছে।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার রিফায়েতপুর ও মথুরাপুর ইউনিয়নে ১০ টাকা কেজি দামে বিতরণের জন্য খাদ্যগুদাম থেকে উত্তোলন করা ১১ টন চাল ডিলার কর্তৃক আত্মসাৎ করে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রিফায়েতপুর ইউনিয়নে নিযুক্ত ডিলার তরিকুল ইসলাম বিদ্যুৎ ও মথুরাপুর ইউনিয়নে নিযুক্ত ডিলার মাসুদ হোসেন গত ২৯ সেপ্টেম্বর দৌলতপুর খাদ্যগুদাম থেকে নিজ নিজ ইউনিয়নের কার্ডধারী দুস্থদের মধ্যে বিতরণের জন্য উত্তোলন করেন। এরপর তাঁরা ওই চাল এলাকায় না নিয়ে জেলার মিরপুর উপজেলার পোড়াদাহ এলাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে ৩০ টাকা কেজি দরে সাড়ে তিন লাখ টাকায় বিক্রি করে দেন। এ ব্যাপারে দুজন ডিলারের সঙ্গে বহুবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তাঁরা কেউই ফোন ধরেননি।

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১১ বস্তা চালসহ ভটভটিচালককে আটক করেছে নিয়ামতপুর থানার পুলিশ। গতকাল সকাল ৯টার দিকে গোপন সংবাদ পেয়ে নিয়ামতপুর থানার ওসি রফিকুল ইসলাম খানের নেতৃত্বে অভিযান চালিয়ে উপজেলার ছাতড়া বাজার থেকে ৫৫০ কেজি চালসহ ভটভটিচালক উপজেলার চন্দননগর পদ্মপুকুর গ্রামের এছের আলীর ছেলে আশাদুল ইসলামকে (২৫) আটক করে। এ সময় ডিলার চন্দননগর ইউনিয়নের কৃষ্ণপুর গ্রামের আবু তালেবের ছেলে ওয়াহেদুল ইসলাম (৩০) পালিয়ে যান।

বগুড়ার ধুনট উপজেলায় ব্যবসায়ী বাদল সাহার গুদামের সামনে থেকে গুদাম থেকে পাচারকালে সরকারি বরাদ্দ করা ১০ টাকা কেজি দামের চালবোঝাই একটি ট্রাক জব্দ করে পুলিশ। এ ছাড়া চাল কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে বগুড়ার শাজাহানপুরের খোট্রাপাড়া ইউনিয়নের ডিলার আওয়ামী লীগ নেতা আবুল বাশারকে মঙ্গলবার ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানকালে বিভিন্ন দোকান তল্লাশি চালিয়ে আট বস্তা চাল জব্দ এবং ডিলার বাশারের দোকান থেকে হতদরিদ্রদের হাফ ডজন কার্ড উদ্ধার করেন। জেলার শাজাহানপুর উপজেলায় গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ভ্রাম্যমাণ আদালত আমরুল ইউনিয়নের নগরহাট এলাকায় হতদরিদ্রদের কাছ থেকে চাল কেনার অভিযোগে ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি হাফিজার রহমানকে তিন দিনের কারাদণ্ড দেন। এ সময় অর্ধটন চাল জব্দ করা হয়। এর আগে দুপুর দেড়টায় উপজেলার খরনা ইউনিয়নের দাড়িগাছা বন্দরে ভ্রাম্যমাণ আদালত হায়দার আলী নামের এক ব্যক্তির দোকান থেকে ৮১০ কেজি চাল জব্দ করেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে হায়দার আলীকে সাত দিনের কারাদণ্ড দেন। হায়দার আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মী। ওজনে কম দেওয়ার কারণে আটক করা হয় মাঝিড়া ইউনিয়নের ডিলার উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহসভাপতি রুবেল সরকারকে।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জে ১০ টাকা দরের চাল কালোবাজারে বিক্রির সময় গত মঙ্গলবার রাতে ডিলার কামিনী রায় ও ক্রেতা রুস্তম আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল উভয়কে আদালতে তুলে দিয়েছে পুলিশ।

স্থানীয় প্রশাসনের বক্তব্য : খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির অনিয়ম প্রসঙ্গে গতকাল লালমনিরহাট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক গোলাম মওলা কালের কণ্ঠকে বলেন, এসব দেখবে সংশ্লিষ্ট ইউএনও ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকসহ অন্যান্য কমিটি। তবে আদিতমারী উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (টিসিএফ) এ টি এম সাজ্জাদুর রহমান ওই উপজেলার পাশাপাশি রয়েছেন কালীগঞ্জ উপজেলারও দায়িত্বে। গত কয়েক দিন কালীগঞ্জের অফিসে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত গত কয়েক দিনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

কুড়িগ্রাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আশ্রাফুজ্জামান বলেন, নীতিমালা অনুযায়ী শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রেখে কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চাল বিক্রির ক্ষেত্রে এখনো কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

নীলফামারীর ডোমার উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মৃত্যুঞ্জয় রায় বর্ম্মণ সম্পদশালীদের কার্ড পাওয়ার অভিযোগের ব্যাপারে বলেন, অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আবদুল আজিজ জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, মেম্বার ও সংশ্লিষ্টদের তালিকা সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এ প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সংশ্লিষ্ট জেলার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।

 


মন্তব্য