kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


একনেকে আট প্রকল্প অনুমোদন

আট ফুট পানির ওপর কৃষি কলেজের প্রস্তাব

ক্ষুব্ধ হয়ে ফেরত পাঠালেন প্রধানমন্ত্রী

আরিফুর রহমান   

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আট ফুট পানির ওপর কৃষি কলেজের প্রস্তাব

প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায় নির্দেশনা দিয়ে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জলাধার রক্ষায় আইনও প্রণয়ন করা হয়েছে।

কিন্তু খোদ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই তা আমলে নেয়নি। খুলনার পাইকগাছা উপজেলায় আট ফুট পানির ওপর একটি কৃষি কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব করেছিল তারা। গতকাল মঙ্গলবার সেটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের জন্য উত্থাপনও করে মন্ত্রণালয়। কিন্তু জলাধার ভরাট করে পানির ওপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের এই প্রস্তাব দেখে খেপে যান প্রধানমন্ত্রী। প্রকল্পটি অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠান তিনি। কৃষি কলেজের জন্য খুলনায় নতুন করে উঁচু জায়গার খোঁজ করে স্থান চূড়ান্ত করার পর প্রকল্পটি পুনরায় একনেক সভায় নিয়ে আসার নির্দেশ দেন তিনি। বৈঠকে উপস্থিত সরকারের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

রাজধানীর শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভাপতিত্ব করেন। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, পাইকগাছায় ২৫ একর জমির ওপর কৃষি কলেজ নির্মাণ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১০১ কোটি টাকা। কৃষি কলেজটি যেখানে হবে প্রজেক্টরের মাধ্যমে সে জায়গার ছবি দেখানো হচ্ছিল। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী থামতে বলেন। ছবিতে দেখানো হয়, যে জায়গায় কৃষি কলেজ নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে, তার পুরো এলাকায় পানি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়, জায়গাটি বছরজুড়েই পানির নিচে থাকে। এখনো সেটি আট ফুট পানির নিচে। সেখানে মাটি ভরাট করে কৃষি কলেজ নির্মাণ করা হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ প্রস্তাব শুনে প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হন। তিনি বলেন, ‘জলাধার রক্ষায় আমি অনেক আগেই নির্দেশ দিয়েছি। এ ধরনের জলাধার ভরাট করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ করা উচিত হবে না। এমনকি অন্য কিছুও নয়। বরং সেখানে জলাধার ঠিক রেখে মৎস্য ও কৃষির জন্য বিকল্প কোনো প্রকল্প হাতে নেওয়া যেতে পারে। ’ প্রস্তাবিত কৃষি কলেজের জন্য বিকল্প জায়গা খুঁজে দ্রুততার সঙ্গে প্রকল্পটি সংশোধন করে পুনরায় একনেক সভায় উত্থাপন করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।

বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, ঈদুল আজহায় সড়ক দুর্ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির বিষয়টি গতকালের সভায় আলোচনায় উঠে আসে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জেলা শহরে যেসব স্থানে বিপজ্জনক মোড় রয়েছে, সেগুলো যেন সংস্কার করে সোজা করা হয়। এতে সড়ক দুর্ঘটনা অনেক কমে আসবে। শ্যামগঞ্জ-জারিয়া-বিরিশিরি-দুর্গাপুর জেলা মহাসড়ককে জাতীয় মহাসড়কে উন্নীতকরণ শিরোনামের প্রকল্পটি অনুমোদনের সময় এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বৈঠক সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী ঢাকার আজিমপুরের সব পুরনো সরকারি আবাসিক ভবন ভেঙে আধুনিক একটি ভবন তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। বৈঠকে তিনি বলেছেন, এসব ভবন পাকিস্তান আমলে তৈরি। এরই মধ্যে সেগুলো জরাজীর্ণ হয়ে গেছে। তাই ভেঙে ফেলা জরুরি। আলাদা ভবন না করে একটি বিশাল ভবন হলে ফাঁকা জায়গায় খেলার মাঠ, বড়দের হাঁটার জায়গা এবং শিশু পার্ক তৈরি করা যাবে। সোলার প্যানেলগুলোকে ভবিষ্যতে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার নির্দেশও দেন প্রধানমন্ত্রী।

৩,৪৮৮ কোটি টাকার আট প্রকল্প অনুমোদন : গতকালের সভায় তিন হাজার ৪৮৮ কোটি টাকার আটটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে খরচ হবে এক হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণ পাওয়া যাবে দুই হাজার ২৮ কোটি টাকা। আর বাস্তবায়নকারী সংস্থার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেওয়া হবে ২০ কোটি টাকা।

বৈঠক শেষে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এ সময় অন্যদের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, পরিকল্পনাসচিব তারিক-উল-ইসলাম, কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য সামসুদ্দিন আজাদ চৌধুরীসহ পরিকল্পনা কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

গতকালের সভায় অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চীনের অর্থায়নে রেলের জন্য ২০০টি মিটার গেজ বগি কেনা। এতে ব্যয় হবে ৯২৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন সরকার ঋণ দেবে ৭১৪ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকারি তহবিল থেকে ব্যয় হবে। অন্য প্রকল্পগুলো হলো, এক হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা ব্যয়ে রুরাল ইলেকট্রিফিকেশন আপগ্রেডেশন প্রজেক্ট (রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগ), (তৃতীয়বারের মতো সংশোধিত), ৩১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্যামগঞ্জ-জারিয়া-বিরিশিরি-দুর্গাপুর জেলা মহাসড়ককে জাতীয় মহাসড়ক মানে উন্নয়ন, ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার আজিমপুরে জুডিশিয়াল কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ, ৫৮৪ কোটি টাকা ব্যয়ে পটুয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন, ৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে সুরেশ্বর খাল পুনঃখনন ও নিষ্কাশন, ৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ে কুড়িগ্রামে তিস্তা নদীর তীর রক্ষা সংক্রান্ত প্রকল্প এবং ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রতিবন্ধীদের জন্য ঢাকা সেনানিবাসে অবস্থিত প্রয়াস কেন্দ্রের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প।

সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, যাত্রীদের উত্তম সেবা নিশ্চিত করতে রেলের কোচ কেনা হচ্ছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে নিরাপদ, আধুনিক ও উন্নত কোচ সংযোজন করা যাবে। এতে কোচের স্বল্পতা পূরণ হবে, যাত্রীদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মিটবে এবং রেলের রাজস্ব আয় বাড়বে।

গত সোমবার প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন প্রসঙ্গে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি সব সময়ই জিডিপির প্রবৃদ্ধি নিয়ে রক্ষণমূলক প্রক্ষেপণ করে। কিন্তু দেখা যায়, বাস্তবে তার চেয়ে জিডিপির প্রবৃদ্ধি বেশি অর্জিত হয়। তবে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। সরকার দক্ষ মানবসম্পদ তৈরিতে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।


মন্তব্য