kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মা প্যাকেট খুলতেই নড়ে উঠল ‘মৃত’ নবজাতক

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



মা প্যাকেট খুলতেই নড়ে উঠল ‘মৃত’ নবজাতক

চট্টগ্রামে চিকিৎসক দম্পতির কন্যাসন্তান জন্মের পর প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার জন্য নবজাতকের বিশেষ সেবা ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। অভিযোগ উঠেছে, চিকিৎসা না করেই নবজাতককে মৃত ঘোষণা করা হয়।

শুধু তা-ই নয়, মৃত উল্লেখ করে মৃত্যুর সনদও তৈরি করে নবজাতককে প্যাকেটে মোড়ানো হয়। প্রায় দুই ঘণ্টা পর প্যাকেটবন্দি নবজাতককে মায়ের কেবিনে পাঠানো হয়। মৃত্যুর সনদসহ ‘মৃতদেহ’ যখন মায়ের কাছে দেওয়া হয় তখন মা হতভম্ব হয়ে অঝোরে কেঁদে প্যাকেট খোলেন। দেখেন, তাঁর নাড়িছেঁড়া ধন সন্তানটি নড়াচড়া করছে। তাৎক্ষণিক নিয়ে যাওয়া হয় অন্য হাসপাতালে। বর্তমানে নবজাতকটি একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

ঘটনাটি ঘটেছে বন্দরনগরীর বেসরকারি সিএসসিআর হাসপাতালে। সোমবার মধ্যরাতে এ ঘটনার পর চট্টগ্রামে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।

এ ঘটনা প্রসঙ্গে সিএসসিআর  হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ডা. সালাউদ্দিন মাহমুদ গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনাটি আমরা গুরুত্বসহকারে নিয়েছি। তদন্ত করতে হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার তানভীর জাফরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আশা করি বুধবার প্রতিবেদন পাব। ’ তিনি বলেন, ‘প্রসূতির (ডা. রিদওয়ানা কাউসার) স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে। ২৭ সপ্তাহের মতো ছিল নবজাতক। প্রসবের পর এনআইসিইউতে নেওয়া হয়। এরপর কী কারণে নবজাতককে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে, তা উচ্চপর্যা য়ে তদন্ত করা হচ্ছে। ’

জানা যায়, প্রসব বেদনা নিয়ে বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডেন্টাল সার্জন ডা. রিদওয়ানা কাউসার গত সোমবার রাতে সিএসসিআর হাসপাতালে ভর্তি হন। রিদওয়ানার স্বামী কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার নুরুল আজম। রাত ১টার দিকে রিদওয়ানা কন্যাসন্তান প্রসব করেন। এটি চিকিৎসক দম্পতির প্রথম সন্তান। কনসালট্যান্ট ছিলেন গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শাহেনা আক্তার। ডা. শাহেনা নবজাতককে এনআইসিইউতে ভর্তি করার পরামর্শ দিলে সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রায় দুই ঘণ্টা পর মা ডা. রিদওয়ানা কাউসারের ৬১২ নম্বর কেবিনে নিয়ে গিয়ে তাঁর প্রসব করা কন্যাসন্তান মারা গেছে জানিয়ে ‘প্যাকেটবন্দি মরদেহ’ এবং মৃত্যু সনদ নিয়ে যাওয়া হয়। সিএসসিআর হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তা বলার পর মৃতের বিষয়টি কিছুতেই মেনে না নিয়ে মা রিদওয়ানা প্যাকেটটি খুলতে চাইলে ওই সময়ও কর্মকর্তারা বাধা দেন। কিন্তু তা না মেনে মা একপর্যা য়ে নিজেই প্যাকেটটি খুলে মৃত সন্তানকে দেখতে চাইলে দেখেন নড়াচড়া আছে। এরপর নবজাতককে বাঁচানোর জন্য রাত ৩টার দিকে প্রবর্তক মোড়ে চাইল্ড কেয়ার নামক একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার পর আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য মেহেদীবাগের ম্যাক্স হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। গতকাল ভোর ৫টার দিকে বেসরকারি ওই হাসপাতালে ভর্তির পর গত রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নবজাতক সুস্থ আছে।

এ ব্যাপারে ডা. শাহেনা আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, “এটাকে আমরা ‘অ্যাবরশন’ বলি। সাধারণত মাতৃগর্ভে নবজাতকের ২৮ সপ্তাহ পূর্ণ না হলে তা অ্যাবরশন। সোমবার রাত সোয়া ১টার দিকে অ্যাবরশন হয়। নবজাতকের ২৫ সপ্তাহ পর ২৬ সপ্তাহে পড়েছে। ওজন আধা কেজির মতো হবে। আমি ওই সময় তাৎক্ষণিকভাবে নবজাতককে এনআইসিইউতে স্থানান্তরের জন্য বলি। নড়াচড়া কম থাকলেও হার্টবিট ছিল, তবে কিছুটা কম। এরপর কী হয়েছে তা আমি রাতে জানিনি। ”

গাইনি চিকিৎসক রুমা নবজাতককে মৃত ঘোষণা করেছেন। এ অভিযোগ প্রসঙ্গে ডা. শাহেনা আক্তার বলেন, “রুমা গাইনির চিকিৎসক। সে ডেথ সার্টিফিকেট দেয়নি। এনআইসিইউর চিকিৎসকরাই ‘ডেথ’ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। ”

সিএসসিআরের এনআইসিইউর ইনচার্জ ডা. ওয়াজির আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নবজাতকের ওজন ৫০০ গ্রাম ছিল। নবজাতককে এনআইসিইউতে পাঠানো হয়েছিল চিকিৎসার জন্য। কিন্তু কী অবহেলা হয়েছে তার প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই ওই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনাটি তদন্ত করা হচ্ছে। ’

সিএসসিআর হাসপাতালের এনআইসিইউতে (শিশুদের নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র) দায়িত্বরতদের অবহেলার কারণেই এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে অভিযোগ করে বান্দরবান জেলার আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডেন্টাল সার্জন ডা. রিদওয়ানা কাউসার সাংবাদিকদের বলেন, ‘এনআইসিইউতে নেওয়া হলেও সেখানে বাচ্চার কোনো পরিচর্যা  করা হয়নি। কারণ তার নাক-মুখও পরিষ্কার করা হয়নি। ’

ডা. রিদওয়ানা কাউসার বলেন, ‘বাচ্চা ডেলিভারি হওয়ার পর গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শাহেনা আক্তারকে বলতে শুনলাম বাচ্চা শ্বাস নিচ্ছে। তাকে দ্রুত এনআইসিইউতে নিয়ে যাওয়া হোক। ডাক্তারের নির্দেশে এনআইসিইউতে নেওয়ার দুই ঘণ্টা পর মৃত্যু সনদ দিয়ে একটি প্যাকেটে ভরে বাচ্চাকে কেবিনে দিয়ে যায়। ’ তিনি বলেন, ‘যেহেতু আমি নিজেও ডাক্তার তাই গাইনি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কথাটি আমার মনে পড়ল। টেপ দিয়ে মোড়ানো প্যাকেটটি খুলে দেখতে চাইলাম। কিন্তু হাসপাতালের দায়িত্বরত লোকজন আমাকে বাধা দিলেন। এর পরও আমি জোর করে প্যাকেট খুলে দেখি বাচ্চা নড়াচড়া করছে। ’

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা নবজাতকটিকে মৃত ঘোষণা করেনি। এ বিষয়ে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার তানভীর জাফর বলেন, ‘আমরা আগেই বলেছিলাম হাসপাতালে ওয়ার্মার খালি নেই। পাশের হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেছিলাম। ’ তবে হাসপাতাল থেকে মৃত্যু সনদ দেওয়া হলেও তা অস্বীকার করেছেন তিনি।

ম্যাক্স হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. লিয়াকত আলী গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজ (মঙ্গলবার) ভোর ৫টার দিকে আমাদের এনআইসিইউতে ভর্তি করা হয় নবজাতককে। এর আগে নবজাতককে চাইল্ড কেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। শ্বাস-প্রশ্বাস স্বাভাবিক আছে। হার্টবিটও আছে। আরো উন্নত চিকিৎসার জন্য এখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিক্যাল বোর্ড করার চেষ্টা চলছে। মা তাঁর সন্তানের পাশে আছেন। ’

সিআরসিআর হাসপাতাল থেকে দেওয়া মৃত্যু সনদে হাসপাতালের মেডিক্যাল অফিসার ডা. রুমার স্বাক্ষর রয়েছে। এ ছাড়া চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্রেও নবজাতককে মৃত উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ডা. রুমার বক্তব্য নেওয়ার জন্য অনেক চেষ্টা করেও তা সম্ভব হয়নি।


মন্তব্য