kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ছাত্রলীগ নেতার হামলায় আহত ছাত্রী সংকটাপন্ন

সিলেট অফিস   

৫ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ছাত্রলীগ নেতার হামলায় আহত ছাত্রী সংকটাপন্ন

সিলেটে ছাত্রলীগ নেতার হামলায় আহত কলেজ ছাত্রী খাদিজা আক্তার নার্গিসের অবস্থা সংকটাপন্ন। গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে তাঁর মস্তিষ্কে জরুরি অস্ত্রোপচারের পর পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ওই হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. মির্জা নিজামউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেয়েটির মাথার আঘাত খুবই গুরুতর। এ ছাড়া হাতও মারাত্মক জখম হয়েছে। ’

অস্ত্রোপচারের পর হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের ডা. এ এম রেজাউস সাত্তার বলেন, ‘এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। ৭২ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে। তবে এতটুকু বলা যায় অবস্থা ভালো নয়। আমরা সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করব। মেয়েটিকে বাঁচানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। ’

জানা গেছে, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রতিশোধ নিতে গত সোমবার বিকেলে সিলেটের এমসি (মুরারী চাঁদ) কলেজ ক্যাম্পাসে খাদিজা আক্তার নার্গিসকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর আহত করেন ছাত্রলীগ নেতা বদরুল আলম। তিনি শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসম্পাদক। এর আগে ২০১২ সালে খাদিজাকে উত্ত্যক্ত করতে গিয়ে গণধোলাইয়ের শিকার হয়েছিলেন বদরুল।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বদরুলকে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটিও করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য আমিনুল হক ভূঁইয়া বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এদিকে কলেজ ছাত্রীর ওপর হামলার প্রতিবাদে উত্তাল সিলেটের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গতকাল নগরে মানববন্ধন, সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ জানায় শিক্ষার্থীরা। এ সময় তিন দফা দাবিতে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করে খাদিজার সহপাঠীরা। তারা হামলাকারী বদরুলের ফাঁসির দাবি জানায়।

খাদিজা আক্তার সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের স্নাতক শ্রেণির ছাত্রী। তিনি সিলেট সদর উপজেলার মোগলগাঁও ইউনিয়নের হাউসা গ্রামের মাসুক মিয়ার মেয়ে। তাঁর বাবা সৌদি আরব প্রবাসী। পরীক্ষা দিতে সোমবার এমসি কলেজে গিয়েছিলেন খাদিজা। বিকেলে পরীক্ষা শেষে ক্যাম্পাসের পুকুর পাড়ে দাঁড়ানো অবস্থায় তাঁর ওপর হামলা চালান বদরুল। চাপাতি দিয়ে খাদিজাকে কোপানোর একপর্যা য়ে অন্য শিক্ষার্থীরা তাঁকে আটক করে গণপিটুনি দিয়ে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে। বর্তমানে পুলিশ হেফাজতে ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বদরুল।

খাদিজাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় প্রথমে ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় সোমবার রাতেই তাঁকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়।

মামলা দায়ের : খাদিজার ওপর হামলার ঘটনায় গতকাল তাঁর চাচা আব্দুল কুদ্দুস হামলাকারী বদরুলকে একমাত্র আসামি করে শাহপরাণ থানায় মামলা করেছেন। থানার ওসি শাহজালাল মুন্সি বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আসামি বদরুল পুলিশ হেফাজতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে জানিয়ে তিনি বলেন, দণ্ডবিধির ৩২৬ ও ৩০৭ ধারায় মামলা হয়েছে। সুস্থ হলেই বদরুলকে আদালতে হাজির করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

কে এই বদরুল : শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষ দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী বদরুল। তাঁর গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার মনিরজ্ঞাতি গ্রামে। তাঁর বাবার নাম সাইদুর রহমান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহপরাণ আবাসিক হলের ছাত্র। পাশাপাশি ছাতকের আলহাজ আয়াজুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন বদরুল।

এলাকাবাসী জানায়, সাত-আট বছর আগে খাদিজাদের বাড়িতে লজিং থাকতেন বদরুল। ২০১২ সালের ১৩ জানুয়ারি জাঙ্গাইল এলাকার সফির উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজে গিয়ে খাদিজাকে উত্ত্যক্ত করার সময় এলাকাবাসী তাঁকে গণপিটুনি দেয়। এর পর থেকে তিনি বিভিন্ন সময়ে খাদিজাকে উত্ত্যক্ত করে আসছিলেন।

সহপাঠীরা জানিয়েছে, বদরুল ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তাঁর সহপাঠীরা পাস করে চলে গেলেও তিনি এখনো কোর্স শেষ করতে পারেননি। বদরুলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও রয়েছে। ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকার কারণে তিনি সব সময় বেপরোয়াভাবে চলাফেরা করতেন।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার: বদরুলকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করার তথ্য নিশ্চিত করে উপাচার্য আমিনুল হক ভূঁইয়া জানান, ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটির প্রধান ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর রাশেদ তালুকদার। অন্য সদস্যরা হলেন শাহপরাণ হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রভোস্ট শাহেদুল হোসাইন ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক মুন্সী নাসের ইবনে আফজাল। যত দ্রুত সম্ভব কমিটিকে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

তিন দিনের কর্মসূচি : খাদিজার ওপর হামলাকারীর ফাঁসিসহ তিন দফা দাবিতে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তাঁর সহপাঠীরা। গতকাল সকালে সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীরা কলেজের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করে। এই কর্মসূচি থেকেই তারা দাবিগুলো উত্থাপন করে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করে। দাবিগুলো হচ্ছে মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর, আসামি বদরুলের ফাঁসি নিশ্চিত করা এবং পরীক্ষার হল ও যাতায়াতের সময় ছাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

ঘোষিত তিন দিনের কর্মসূচির মধ্যে গতকাল মানববন্ধন পালিত হয়েছে। আজ বুধবার কালো ব্যাজ ধারণ এবং আগামীকাল বৃহস্পতিবার বিক্ষোভ সমাবেশ ও জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি রয়েছে।

সকাল সাড়ে ১০টা থেকে কলেজের সামনে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে কলেজের ছাত্রীরা। তারা হামলাকারী বদরুলের ফাঁসি চেয়ে স্লোগান দেয়। এ সময় নগরের চৌহাট্টা থেকে বন্দরবাজার সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।

শিক্ষার্থীরা জানায়, হামলাকারী বদরুলের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে।

সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ ড. নুরুল ইসলাম বলেন, একজন শিক্ষার্থীর ওপর এমন বর্বর ও পৈশাচিক হামলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। তিনি আরো বলেন, যদি এ ধরনের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া না হয়, তবে এর পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা থাকে।

এদিকে দুপুরে এমসি কলেজের শিক্ষার্থীরাও বদরুলের ফাঁসির দাবিতে ক্লাস ছেড়ে ক্যাম্পাসে মিছিল নিয়ে বের হয়। পরে বিক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রীরা নগরের টিলাগড় পয়েন্টে অবস্থান নিয়ে সিলেট-তামাবিল মহাসড়ক অবরোধ করে মানববন্ধন করে। এ সময় তারা বিভিন্ন স্লোগান দিয়ে হামলাকারী বদরুলের ফাঁসির দাবি জানায়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগকর্মীরাও বিক্ষোভে যোগ দেয়।

শাবি ছাত্রলীগের বক্তব্য : হামলাকারী বদরুল আলমের সঙ্গে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি) ছাত্রলীগের কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছে শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ। গতকাল সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক মুশতাক আহমদের পাঠানো এবং সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ ও সাধারণ সম্পাদক ইমরান খান স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ দাবি জানানো হয়। তবে গত ৮ মে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসাইন স্বাক্ষরে যে বর্ধিত কমিটি অনুমোদন দেওয়া হয় সেখানে প্রথম সহসম্পাদক হিসেবে নাম রয়েছে বদরুলের।

গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানানোর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতা খাদিজা আক্তার ও তাঁর পরিবারের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সঙ্গে সন্ত্রাসী বদরুল আলমের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি তাঁরা আহ্বান জানান।

বদরুল আলম সুনামগঞ্জের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছে বলে উল্লেখ করে ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মিত ছাত্ররাই সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করতে পারে, কোনো চাকরীজীবী নয়। সাংগঠনিক নিয়মেই কর্মক্ষেত্রে যোগদানের সঙ্গে সঙ্গেই বদরুলের সদস্যপদ বাতিল হয়েছে বলে তাঁরা উল্লেখ করেন।

শাবি ছাত্রলীগ জানায়, এমসি কলেজে সংঘটিত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড একান্তই বদরুলের ব্যক্তিগত নৃশংসতা; কারও ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায়ভার কোনো অবস্থাতেই সংগঠনের ওপর বর্তায় না।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি রাজধানীর উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রী রিশাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির কাছে এক বখাটে ছুরিকাঘাত করে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় পরে অষ্টম শ্রেণির এই ছাত্রীর মৃত্যু হয়। এরপর মাদারীপুরে এক স্কুলছাত্রীকে কুপিয়ে হত্যা করে বখাটে। দিনাজপুরে ঘরে ঢুকে কুপিয়ে জখম করা হয় আরেক স্কুলছাত্রীকে।


মন্তব্য