kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রতিযোগিতায় টিকতে নিতে হবে চ্যালেঞ্জ

পার্থ সারথি দাস   

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



প্রতিযোগিতায় টিকতে নিতে হবে চ্যালেঞ্জ

ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার লোকে লোকারণ্য। সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে গত বুধবার সেখানে হাজির ছিলেন দেশের নানা অঙ্গনের বিশিষ্টজনরা।

‘জলেশ্বরীর জাদুকর’কে শেষ বিদায় জানাতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদও এসেছিলেন। বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে সকাল থেকেই সরাসরি সম্প্রচার চলছিল। তবে তাদের ভিড়ে ছিল না বিটিভি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, আমলানির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়াতেই এ কাণ্ড ঘটেছে। সংস্কৃতির শেকড়ের সঙ্গে কর্মকর্তাদের যোগ থাকলে বিটিভি কর্মকর্তারা এ কাজ করতে পারতেন না।

জাপানের এনএইচকে টেলিভিশনের পর এশিয়ায় সবচেয়ে বয়সী টেলিভিশন বিটিভি। এনএইচকের সম্প্রচার শুরু হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। বিটিভির সম্প্রচার শুরু হয়েছে ১৯৬৪ সালে। অন্য দেশের চ্যানেলগুলো যেখানে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের জনপ্রিয়তা ধরে রেখেছে, সেখানে ক্রমেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বিটিভি। দর্শকও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আয়ও কমে গেছে।     

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমলাদের সিন্ডিকেট ভেঙে সৃজনশীল লোকজনকে নেতৃত্বে আনতে পারলে, মানসম্পন্ন সংবাদ ও অনুষ্ঠান নির্মাণ করা হলে, বুকিং রেট কমিয়ে প্যাকেজ নাটক সম্প্রচার বাড়াতে পারলে বিজ্ঞাপন বাড়বে। এতে বিটিভি যেমন দর্শকপ্রিয়তা ফিরে  পাবে, তেমনি লাভের পথও সুগম হবে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দর্শক আজ বিটিভি থেকে চোখ সরিয়ে বেসরকারি টেলিভিশন দেখছে। তাতে মাত্রাতিরিক্ত বিজ্ঞাপন-বিরতিতে তারা বিরক্ত। তাই চোখ রাখছে ভারতের জি বাংলা, স্টার জলসাসহ অন্যান্য বিদেশি চ্যানেলে।  

একসময় বিটিভি ছিল পারিবারিক টিভি। পরিবারের সবাই একসঙ্গে বসে টেলিভিশন দেখত। এখন মানুষের জীবনযাত্রার ধরন পাল্টে গেছে। ব্যস্ত জীবনে একসঙ্গে বসে সবার টিভি দেখা হয় না। যতটুকুও দেখা হয়, তার মধ্যে বিটিভি থাকে না। ঘরে থাকা গৃহিণীরাও অবসরে মেতে থাকে ভারতীয় চ্যানেলের বিভিন্ন সিরিয়াল নিয়ে।  

বিটিভিতে অনুষ্ঠানের ধরন ও মান কিভাবে বদলানো যায় তা নিয়ে কোনো গবেষণা নেই। কেন এ অবস্থা, জানতে চাইলে বিটিভির একাধিক প্রযোজক নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, আমলারা আসেন আর যান। বিটিভির দর্শক কমলে বা বাড়লে তাঁদের কিছু আসে যায় না। বিটিভির জন্য দরদ কেবল বিটিভির নিজস্ব লোকদের। যদিও তাঁদের গুরুত্ব দেওয়া হয় না।   

বিশিষ্ট অভিনেতা তারিক আনাম খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গবেষণা ও উন্নয়নের মধ্য দিয়ে ভারতের বিভিন্ন টেলিভিশন এগিয়ে চলেছে। আমাদের নাটকের ঘোর দর্শকদেরও তারা টেনে নিয়েছে। অথচ আগে তারা আমাদের নাটক নিয়ে ঈর্ষা করত। এখনো বিটিভির সুযোগ রয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর। অনুষ্ঠান বোঝেন, এমন লোকদের কাছে দায়িত্ব দিতে হবে। ’

বিটিভির পুরনো শিল্পী ও কর্মীদের কাছ থেকে জানা গেছে, জাপানের নিপ্পন ইলেকট্রিক কম্পানি এনইসি নিজেরা যন্ত্রপাতি ও কলাকুশলী নিয়ে এসে অনুষ্ঠান পরিচালক হিসেবে কলিম শরাফীকে ও স্টেশন ব্যবস্থাপক হিসেবে জামিল চৌধুরীকে নিয়োগ দিয়ে বিটিভির যাত্রা শুরু করেছিল। চারজন প্রযোজক জোগাড় করে শুরুটা হয়েছিল। তার পরও মান নিয়ে কেউ কোনো প্রশ্ন তোলেনি। প্রথম দিনের সংগীতানুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন ফেরদৌসী রহমান। ওই সময় ৬০ শতাংশ অনুষ্ঠান বাইরে থেকে আনা হতো। দিনে তিন ঘণ্টা অনুষ্ঠান হতো, সপ্তাহের প্রতি সোমবার টিভি বন্ধ থাকত। ওই সময়ে টিভিতে ‘ঘরোয়া’ নামের একটি অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপন করা হতো নাটকের মাধ্যমে। দারুণ জনপ্রিয় ছিল অনুষ্ঠানটি। এভাবে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিটিভির নিজস্ব আয়ের পথ খুলেছিল।  

নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিটিভির বুকিং চার্জ তিন গুণ। যারা স্পন্সর দেবে তারা ভাবে, বিটিভিকে দিয়ে কী লাভ? বিটিভির এই ভাবমূর্তি বিটিভিকেই ফেরাতে হবে। যাঁরা অনুষ্ঠান, নাটক বোঝেন, যাঁরা দক্ষ, তাঁদের দায়িত্ব দিতে হবে। গবেষণার ওপর ভিত্তি করে উন্নয়ন ঘটাতে হবে।  

১৯৭২ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর বিটিভিকে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়। তখন থেকে এটির পরিচালনার ভার দেওয়া হয় তথ্য মন্ত্রণালয়কে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বিটিভি ১৯৯২ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশের একমাত্র টিভি ছিল। ওই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর মার্কিন সংবাদ চ্যানেল সিএনএন বিটিভি চ্যানেল ব্যবহার করে। ওই বছর বিবিসিও একইভাবে সম্প্রচার করে। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানগুলো দেখার জন্য সাধারণ মানুষ ঘরে ঘরে ডিশ অ্যান্টেনা লাগানো শুরু করে। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে ১০টি আন্তর্জাতিক টেলিভিশন দেখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল দেশে। ২০০১ সালে তা ৫০ ছাড়িয়ে যায়। এখন তা ২০০ ছাড়িয়েছে। ১৯৯৭ সালে প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন এটিএন বাংলা সম্প্রচারে আসে। ২০০০ সালের ১৪ এপ্রিল সংবাদ সম্প্রচার করার মূল লক্ষ্য নিয়ে আসে একুশে টেলিভিশন। তার পর থেকে বেসরকারি চ্যানেলের সংখ্যা বাড়ছেই।

বিটিভির সাবেক মহাপরিচালক ম হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০০০ সাল থেকেই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েছে বিটিভি। যোগ্য লোকজন বিটিভি থেকে বেসরকারি টেলিভিশনে গিয়ে দক্ষতার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করে। বেসরকারি চ্যানেলগুলোর বেশির ভাগই ব্রেকিং নিউজ, লাইভ নিউজ সম্প্রচার করে দর্শক ধরে রাখছে, দর্শক সৃষ্টি করছে। ’ 

ম হামিদ আরো বলেন, বেসরকারি টেলিভিশনের বিকাশে সরকারের আন্তরিকতা রয়েছে। সে তুলনায় বিটিভির প্রতি আন্তরিকতা ও নজরদারি আরো বাড়ানো দরকার। আগে থেকে চলে আসা নিয়োগ পদ্ধতি বদলে দিয়ে এমন নিয়োগ পদ্ধতি আনতে হবে যাতে সৃজনশীল লোকজন অবদান রাখতে পারেন।  

বেসরকারি হিসাবে, দেশে কম হলেও ছয় কোটি কেবল টিভি দর্শক আছে। তাদের বেশির ভাগই দেশি চ্যানেল দেখে না। বাংলাদেশ কেবল টিভি দর্শক ফোরামের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের দর্শকদের ৭০ শতাংশই দেশি চ্যানেল দেখে না। তাদের বেশির ভাগই ভারতীয় চ্যানেল দেখছে। ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে ২০১৩ সালের মে পর্যন্ত দেশের ২০টি স্থানে পৌনে পাঁচ লাখ দর্শকের ওপর জরিপ চালিয়ে ওই অবস্থা জানা গিয়েছিল। এখন দেশি চ্যানেল না দেখার হার আরো বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মত।

ভারতীয় বাংলা পে চ্যানেল জি বাংলা, স্টার জলসা এবং হিন্দি চ্যানেল জিটিভি ও স্টার টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দর্শকদের দেশীয় চ্যানেলে ফিরিয়ে আনার দাবি তোলা হচ্ছে বিভিন্ন মহল থেকে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্ধ করে নয়, বিশ্বায়নের যুগে প্রতিযোগিতা করে টিকতে হবে। বিটিভিকে চ্যালেঞ্জ নিতে হবে।   

নব্বইয়ের দশকে দেশে টেলিভিশন সম্প্রচারে উন্নয়ন শুরু হয়। ডিশ অ্যান্টেনা ও স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল তখন থেকে। বিটিভি তখন থেকে দর্শকদের ধরে রাখতে মহাপরিকল্পনা নিতে পারত, গবেষণা করতে পারত—এ মন্তব্য করে নাট্যব্যক্তিত্ব তারিক আনাম খান বলেন, নাটকগুলোয় বার্তা থাকতে হবে। সংবাদ পরিবেশন করতে হবে দর্শকদের চাহিদা অনুসারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ জে এম শফিউল আলম ভুঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, বিটিভির কৃষি, উন্নয়নসংক্রান্ত অনুষ্ঠান, ছায়াছন্দ, টক শোর দর্শক আছে। কিন্তু সংবাদের দর্শক কম। অনুষ্ঠানের মান উন্নয়ন না হলে দর্শক কমবে বিটিভির।   

এসব বিষয়ে বিটিভি ঢাকা কেন্দ্রের জেনারেল ম্যানেজার মাসউদুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিটিভি দিনে ১৫ থেকে ১৬টি নতুন অনুষ্ঠান নির্মাণ করছে। একসঙ্গে এত অনুষ্ঠান নির্মাণ করলে কোনোটি মানসম্মত বলে মনে নাও হতে পারে। কিন্তু বেসরকারি চ্যানেলগুলো দিনে তিন-চারটি অনুষ্ঠান নির্মাণ করছে। আমরা নিজেরা অনুষ্ঠান তৈরি করি। কিন্তু অন্যান্য চ্যানেল বাইরে থেকে অনুষ্ঠান কিনে থাকে। আমরা চেষ্টা করছি উন্নয়নের জন্য। ’

মাসউদুল হক আরো বলেন, শহরে বিটিভির দর্শক কমতে পারে, কিন্তু গ্রামাঞ্চলে বিটিভির দর্শক বাড়ছে। ছায়াছন্দের মতো অনুষ্ঠান গ্রামের মানুষ আজও দেখছে। দেশের ৯৮ শতাংশ স্থানে বিটিভির বিভিন্ন অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে। বেশির ভাগ বেসরকারি টেলিভিশনের অনুষ্ঠান বড় জোর ২৫ শতাংশ এলাকায় দেখা যায়। কোনোটি সর্বোচ্চ ৬০ শতাংশ এলাকা কাভার করে। কিন্তু বিটিভির কাভারেজ এরিয়া সবচেয়ে বেশি। শুধু শহরের দর্শক দিয়ে গোটা বিটিভির জনপ্রিয়তা মাপা যাবে না।

বিটিভির দর্শক জরিপের কোনো ব্যবস্থা আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তা আমার জানা নেই। ’

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের প্রতি জাতির শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের দিন শহীদ মিনার থেকে সরাসরি সম্প্রচার না করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিটিভির সেটআপ করতে জটিলতা তৈরি হয়, সময় লাগে। অন্যান্য চ্যানেলের সেই জটিলতা হয় না। তবে আমাদের সংবাদে বারবার ওই চিত্র দেখিয়েছি। ’

বিটিভির মহাপরিচালক এস এম হারুণ-অর-রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যোগদানের পর থেকে অনুষ্ঠান ও সংবাদে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছি। কম জনবল দিয়ে যথেষ্ট ও মানসম্মত অনুষ্ঠান তৈরির বড় চ্যালেঞ্জ আমাদের নিতে হচ্ছে। ’


মন্তব্য