kalerkantho

মঙ্গলবার। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৯ ফাল্গুন ১৪২৩। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জিপিএ ৫ পাওয়া কঠিন হবে ভয়ে আন্দোলন!

হুজুগে পথে শিক্ষার্থীরা নীরব প্রতিষ্ঠানগুলো

শরীফুল আলম সুমন   

৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



হুজুগে পথে শিক্ষার্থীরা নীরব প্রতিষ্ঠানগুলো

গত মাসের মাঝামাঝিতে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার নম্বর পুনর্বণ্টন করে শিক্ষা বোর্ডগুলো। এতে ২০১৭ সাল থেকে এমসিকিউ (মাল্টিপল চয়েজ কোয়েশ্চন) বা বহুনির্বাচনী অংশ থেকে ১০ নম্বর কমিয়ে সৃজনশীল অংশে তা যুক্ত করা হয়। সৃজনশীল অংশে একটি প্রশ্ন বাড়ানোর পাশাপাশি এ জন্য সময়ও বাড়ানো হয়।   সৃজনশীল বিষয়ে আগে একটি প্রশ্নের উত্তর করার জন্য শিক্ষার্থীরা ২১.৬৬ মিনিট সময় পেত। এখন পাবে ২১.৪২ মিনিট। ফলে সময় কোনোভাবেই কমছে না। কিন্তু এর পরও নতুন নম্বর বণ্টনের পরপরই শিক্ষার্থীরা আগের পদ্ধতিতেই পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। ব্যস্ততম সড়ক অবরোধসহ নানা কর্মসূচিও পালন করেছে শিক্ষার্থীরা। এমনকি আজকের মধ্যে দাবি না মানলে কঠোর কর্মসূচিরও হুমকি দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, পুরো বিষয়টি না বুঝে হুজুগেই আন্দোলন করছে শিক্ষার্থীরা। আর জিপিএ ৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমে যাওয়ার ভয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, সৃজনশীলে প্রশ্ন বাড়ানোয় তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। তারা বলছে সৃজনশীল ছয়টি প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়েই হিমশিম খেতে হয়। সাধারণত শেষ প্রশ্নের উত্তরটা বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই সময় অভাবে ঠিকমতো লিখতে পারে না। এখন আরো একটি প্রশ্ন বাড়ানো হয়েছে। সময় বাড়ানো হয়েছে মাত্র ১০ মিনিট। ফলে আড়াই ঘণ্টা সময়ে সাতটি প্রশ্নের উত্তর করা খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে।

তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগের ব্যাপারে একমত নয় ঢাকা শিক্ষা বোর্ড কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, নম্বর পুনর্বণ্টনের পাশাপাশি সময়েও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে সৃজনশীল অংশে ছয়টি প্রশ্ন লেখার জন্য দুই ঘণ্টা ১০ মিনিট সময় পেত শিক্ষার্থীরা। আর ওএমআর শিট পূরণের জন্য সময় দেওয়া হতো ১০ মিনিট। এখন শিক্ষার্থীদের সাতটি প্রশ্নের উত্তরের জন্য আড়াই ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়েছে। বলা যায়, একটি প্রশ্নের জন্য সময় বাড়ছে ২০ মিনিট। কারণ আগে পরীক্ষা শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিট আগে খাতা দেওয়া হতো। কিন্তু প্রথম পাঁচ মিনিটে শিক্ষার্থীদের ওএমআর (অপটিক্যাল মার্ক রিডার) শিট পূরণ করা সম্ভব হতো না। তারা মূল সময়ের মধ্যেও ওএমআর পূরণ করত। এ ছাড়া দুই পরীক্ষার মাঝে বিরতিও ছিল। মূলত দুই ঘণ্টা ২০ মিনিট পরীক্ষা হলেও এর মধ্যে ১০ মিনিট সময় বরাদ্দ ছিল ওএমআর শিট পূরণের জন্য। সৃজনশীল অংশের জন্য মূল সময় পেত দুই ঘণ্টা ১০ মিনিট। ২০১৭ সাল থেকে পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিট আগে খাতা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে সৃজনশীল ও এমসিকিউয়ের ওএমআর শিট দিয়ে দেওয়া হবে। এ জন্য তাদের মূল সময়ে হাত দিতে হবে না। এতে তাদের ১০ মিনিট সময় বাঁচবে। ফলে একটি প্রশ্ন বাড়লেও সে জন্য কার্যত ২০ মিনিট সময় পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

নম্বর পুনর্বণ্টন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, আগে সৃজনশীল অংশে দুই ঘণ্টা ১০ মিনিট হিসেবে একটি প্রশ্ন লেখার জন্য শিক্ষার্থীরা গড়ে সময় পেত ২১.৬৬ মিনিট। কিন্তু এখন সাতটি প্রশ্ন হওয়ায় প্রতি প্রশ্নোত্তরে সময় পাবে ২১.৪২ মিনিট। আর পরীক্ষা শুরুর ১৫ মিনিট আগে ওএমআর শিট দেওয়ায় ও বিরতি না দেওয়ায় শিক্ষার্থীদের আরো কিছুটা সময়ের সাশ্রয় হবে। ফলে সব মিলিয়ে সময় কোনোভাবেই কমছে না।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের সদস্য (কারিকুলাম) প্রফেসর মো. মশিউজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সৃজনশীল অংশে একটি প্রশ্নের উত্তর লেখার স্ট্যান্ডার্ড সময় ২১.৩০ মিনিট। আমরা সেই হিসাবেই সাতটি প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় ধরেই আড়াই ঘণ্টা নির্ধারণ করেছি। এতে সময় কোনোভাবে কমছে না বরং কিছুটা বাড়ছে। আর এমসিকিউ অংশের ৩০ মিনিট শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগেই সৃজনশীলের প্রশ্ন ও খাতা দিয়ে দেওয়া হবে। এতে কারো যদি আগেই এমসিকিউ শেষ হয়ে যায় সে সৃজনশীল শুরু করতে পারবে। আসলে পুরো ব্যাপারটি শিক্ষার্থীরা না বুঝেই আন্দোলন করছে। শিক্ষার্থীরা কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হোক এটি কেউ চিন্তা করে না। তারা যাতে লাভবান হয় সেটি চিন্তা করেই নম্বর পুনর্বণ্টন করা হয়েছে। ’ 

শিক্ষক ও বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা বেশি করে লেখে। শুধু খাতা ভরতে থাকে। বেশি করে অতিরিক্ত পাতা নেয়। এই শিক্ষার্থীরা মনে করে, বেশি করে লিখলে বেশি নম্বর পাওয়া যায়। এটি সম্পূর্ণই ভুল ধারণা। সৃজনশীল এমনই একটি পদ্ধতি যেখানে বেশি লেখার সুযোগ নেই। যথাযথ ও সঠিক নিয়মে উত্তর করলেই পূর্ণ নম্বর পাওয়া সম্ভব। একটি সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর লেখার জন্য ২১ মিনিট যথেষ্ট সময়। যেহেতু সিলেবাসে কোনো পরিবর্তন হয়নি তাই এই সময়ের মধ্যেই সুন্দরভাবে প্রশ্নের উত্তর করা সম্ভব।

ধানমণ্ডি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. ইনছান আলী বলেন, ‘নতুন নম্বর বণ্টন আমরা শিক্ষার্থীদের বোঝানোর চেষ্টা করছি। কেউ কেউ বুঝলেও অনেকেই একটি প্রশ্ন বেশি দেখেই মনে করছে এত প্রশ্ন কিভাবে লিখব? তবে টেস্ট পরীক্ষায় নতুন নম্বর বণ্টন অনুযায়ী পরীক্ষা নিলেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হয়ে যাবে। ’

প্রতিবছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় প্রায় ২৫ লাখ শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। আর এই শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই মফস্বল বা গ্রামের। তবে আগের পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার দাবিতে আন্দোলনে মফস্বলের শিক্ষার্থীদের দেখা যাচ্ছে না। মূলত আন্দোলন করছে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বিভাগীয় ও বড় শহরের নামিদামি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এর কারণ হিসেবে জানা যায়, এসব প্রতিষ্ঠান থেকেই প্রতিবছর বেশির ভাগ জিপিএ ৫ পায় শিক্ষার্থীরা। নতুন নম্বর বণ্টনের ফলে জিপিএ ৫ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছে তারা। আগে এমসিকিউ অংশে ৪০ নম্বরের মধ্যে ৪০-ই পেত শিক্ষার্থীরা। আর সৃজনশীলের ৬০ নম্বরের মধ্যে ৪০ পেলেই জিপিএ ৫ নিশ্চিত হতো শিক্ষার্থীদের। এখন জিপিএ ৫ পেতে এমসিকিউতে ৩০ নম্বরের মধ্যে শিক্ষার্থীরা ৩০ পেলেও সৃজনশীলের ৭০ নম্বরের মধ্যে ৫০ নম্বর পেতে হবে। যা কিছুটা কষ্টকর। ফলে নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পক্ষে আগের মতো বেশি সংখ্যক জিপিএ ৫ পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়বে। মূলত এই কারণে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বাদ দিয়ে আন্দোলন করলেও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, এমসিকিউতে নম্বর কমানোয় প্রশ্ন ফাঁসও অনেকাংশে রোধ হবে। চলতি বছরের পরীক্ষায়ও দেখা যায়, শিক্ষকরা এক থেকে দেড় ঘণ্টা আগে প্রশ্ন পেয়ে এমসিকিউ অংশ সমাধান করে ফেলে। এরপর আগে থেকেই চুক্তি করা শিক্ষার্থীদের উত্তরগুলো জানিয়ে দেয়। আবার প্রতিষ্ঠানের ভালো ফলের জন্য সব শিক্ষার্থীরই এমসিকিউ অংশ সমাধান করে দেওয়া হয়। ফলে জিপিএ ৫ পাওয়া সহজ হয়। কিন্তু এমসিকিউ অংশে নম্বর কমে যাওয়ায় পুরো নম্বর পেলেও জিপিএ ৫ পাওয়া সহজ হবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতেই চলতি বছরের শুরুতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাবিদদের নিয়ে এক মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। এতে শিক্ষাবিদরা পর্যায়ক্রমে এমসিকিউ তুলে দেওয়ার পক্ষে মত দেন। তখনই মূলত শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ এমসিকিউ থেকে ১০ নম্বর কমানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমসিকিউর জন্য শিক্ষার যে পরিবেশ, যে মেথড দরকার তা আমাদের নেই। আমাদের ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত, ক্লাসরুম, শিক্ষকদের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে এমসিকিউ থেকে যে সুফল পাওয়ার কথা তা আমরা পাচ্ছি না। তাই আমরা এমসিকিউ পর্যায়ক্রমে কমিয়ে আনতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দিয়েছিলাম। সেই হিসেবে ১০ নম্বর কমানো হয়েছে। এখন শিক্ষার্থীদের কেউ কি মিসগাইড করছে কি না তা বোঝা যাচ্ছে না। নইলে তাদের আন্দোলনে যাওয়ার কথা নয়। ’ 

আন্তশিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, ২০১৭ সাল থেকে এমসিকিউতে কমছে ১০ নম্বর। আর সেই ১০ নম্বর বাড়ছে সৃজনশীল অংশে। যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক আছে এখন থেকে সেসব বিষয়ে ৫০ নম্বর থাকবে সৃজনশীলে, ২৫ নম্বর এমসিকিউতে ও ২৫ নম্বর থাকবে ব্যবহারিকে। আগে এমসিকিউতে ৩৫ ও সৃজনশীলে ছিল ৪০ নম্বর। আর যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক নেই সেসব বিষয়ে সৃজনশীলে থাকবে ৭০ নম্বর ও এমসিকিউতে থাকবে ৩০ নম্বর। আগে সৃজনশীলে ছিল ৬০ নম্বর ও এমসিকিউতে ছিল ৪০ নম্বর। তবে এসএসসিতে ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি, চারু ও কারুকলাসহ কয়েকটি বিষয় এবং এইচএসসিতে বাংলা দ্বিতীয় পত্র, ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয় পত্র, চারু ও কারুকলাসহ কয়েকটি বিষয়ে নম্বর বণ্টন অপরিবর্তিত থাকবে। ব্যবহারিক ছাড়া সৃজনশীল বিষয়ে ১১টি প্রশ্ন থাকবে, সাতটির উত্তর দিতে হবে। আর যেসব বিষয়ে ব্যবহারিক রয়েছে সেসব বিষয়ে আটটি প্রশ্ন থাকবে, পাঁচটির উত্তর করতে হবে।

আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাবকমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. মাহবুবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমসিকিউতে নম্বর কমানোর এই ঘোষণা কিন্তু আগেই দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অবশ্যই সেটা জানার কথা। তবে শিক্ষার্থীরা যে আন্দোলন করছে সেটা না বুঝেই। একজন শিক্ষার্থী পড়ালেখা করলে একটি প্রশ্নের জন্য তার কোনো সমস্যাই হওয়ার কথা নয়। আর নতুন নম্বর বণ্টন অনুযায়ী টেস্ট পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছেও ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে ও তাদের আয়ত্তের মধ্যে চলে আসবে। ’

আগের পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণের দাবিতে আন্দোলনকারীদের অন্যতম সমন্বয়ক সরকারি বিজ্ঞান কলেজের ছাত্র জোবায়ের রাইয়ান গত রবিবার সংবাদ সম্মেলনে বলে, ‘আমরা এত দিন আমাদের যৌক্তিক দাবি তুলে ধরেছি। সুশৃঙ্খলভাবে কর্মসূচি পালন করেছি। কারণ আড়াই ঘণ্টায় সাতটি প্রশ্নের উত্তর কোনোভাবেই দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা আবারও শিক্ষামন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করছি পুরনো পদ্ধতিতেই পরীক্ষা নেওয়ার জন্য। মঙ্গলবারের মধ্যে এ ব্যাপারে কোনো জবাব না পেলে কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব। ’

 


মন্তব্য