kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


লোকসান বাড়ছে আয় কমছে

পার্থ সারথি দাস   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



লোকসান বাড়ছে আয় কমছে

দর্শকরা মুখ ফিরিয়ে নেওয়ায় আয় কমে গেছে বিটিভির। একসময়ের লাভজনক প্রতিষ্ঠানটি সাত বছর ধরে লোকসান গুনছে।

সম্প্রচারে থাকা বেসরকারি ২৬টি টেলিভিশনে ভাগ হয়ে গেছে আয়ের প্রধান উৎস বিজ্ঞাপন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনুষ্ঠানের মান কমে যাওয়ায় দর্শক ধরে রাখতে পারছে না বিটিভি। আর জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ায় বিজ্ঞাপনদাতারাও আগের মতো বিটিভির দ্বারস্থ হচ্ছেন না। আমলানির্ভরতায় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে দক্ষ ব্যবস্থাপনাও গড়ে ওঠেনি।

বিটিভির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৩-০৪ অর্থবছরে বিটিভির লাভ ছিল ৫২ কোটি টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে লোকসানি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বিটিভি। ওই অর্থবছরে বিটিভির আয় ছিল প্রায় ১৩২ কোটি টাকা, ব্যয় ছিল ১৪৩ কোটি টাকা। লোকসান হয়েছে ১১ কোটি টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে বিটিভির লোকসান ছিল ৪৩ কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা ছিল  ১০১ কোটি টাকা। লোকসানের এই ধারা এখনো অব্যাহত আছে।

১৯৯৪ সালে বিটিভিতে বিদেশি অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হতো ২১.৪৬ শতাংশ। বিজ্ঞাপন সম্প্রচার হতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্যে ১৫ শতাংশ। এখন তা নেমেছে ৬ শতাংশে। বিটিভির সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে ২০১৪ সালে ‘পরিলেখা’ নামের প্রকাশনায় ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৪ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছরের অনুষ্ঠান সম্প্রচার সময়ের ওপর করা তথ্যচিত্র থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরের সম্প্রচারিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানের হারের হিসাবে দেখা গেছে, বিনি (বিশেষ নির্দেশিত) বিজ্ঞাপন সম্প্রচারিত হয়েছে ৩.৯১ শতাংশ। গত জুনে সম্প্রচারিত হয়েছে ৫৩৯ দশমিক ৫৮ ঘণ্টার অনুষ্ঠান। এর মধ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠান হয়েছে ৬৭ দশমিক ২৮ ঘণ্টা, বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান হয়েছে ৫৮ দশমিক ৫১ ঘণ্টা এবং সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে ৮০ ঘণ্টার অনুষ্ঠান। কিন্তু বিনি বিজ্ঞাপন সম্প্রচারিত হয়েছে ১৬ দশমিক ৩ ঘণ্টা। এ চিত্র থেকেই বোঝা যায়, বিটিভিতে বিজ্ঞাপন সম্প্রচার কমছে। বিজ্ঞাপন কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা দর্শক কমে যাওয়া ও বিজ্ঞাপনের উচ্চ হারকে দায়ী করেছেন। বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, এখন বিটিভির ঈদের অনুষ্ঠানেও স্পন্সর পাওয়া যায় না। কারণ প্রতি মিনিট বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য বিটিভিতে লাগে ৭২ হাজার টাকা। বেসরকারি চ্যানেলগুলোয় তা ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকাতেই হয়ে যায়। ফলে বিজ্ঞাপন কমছে বিটিভিতে।

বিটিভির প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ২০০৯-১০ অর্থবছরে বিটিভিতে বিজ্ঞাপন থেকে আয়ের পরিমাণ ছিল ১০৭ কোটি ৩০ লাখ ২৯ হাজার টাকা, ২০১০-১১ অর্থবছরে ছিল ১১৬ কোটি ৬২ লাখ ৭২ হাজার টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ১০২ কোটি ৩২ লাখ ২০ হাজার টাকা এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে আয় ছিল ৮৬ কোটি তিন লাখ ৪৪ হাজার টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ৭০ কোটি ৪১ লাখ সাত হাজার টাকা।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে আয় কমে হয় ৫২ কোটি ১৫ লাখ আট হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা আরো কমে হয়েছে ৪৫ কোটি ৭২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা।

লাইসেন্স থেকেও আয় কমছে। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এ খাতে বিটিভির আয় ছিল তিন কোটি ৫৬ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা কমে হয় তিন কোটি ৩৮ লাখ ৭৩ হাজার টাকা।

জানা গেছে, ২০০২ সাল থেকে বিটিভিকে ফ্রিকোয়েন্সি চার্জ দিতে হচ্ছে। টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন অনুসারে বিটিভির ১৬টি ট্রান্সমিটারকে একক ধরে এ ফি দিতে হয়। বছরে যার পরিমাণ গড়ে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা। টেরেস্ট্রিয়াল সম্প্রচারের জন্য এ পর্যন্ত বিটিভিকে ওই ফি বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে দেড় হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বেসরকারি স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর ক্ষেত্রে এই ফি অনেক কম। কারণ বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর কোনো উপকেন্দ্র নেই।

দর্শক ও আয় কমার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিটিভি ছাড়াও এখন বিটিভি ওয়ার্ল্ড ও সংসদ বাংলাদেশ টিভি চালু আছে। বিটিভির অনুষ্ঠানই স্যাটেলাইটে সম্প্রচার করা হয় বিটিভি ওয়ার্ল্ডে। সংসদ বাংলাদেশ টিভির নিজস্ব স্টুডিও নেই। বিটিভির কারিগরি সহযোগিতায় স্বল্পসংখ্যক জনবল দিয়ে এটি চলছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম হিসেবে বিটিভির সংবাদে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের পুরো চিত্র তুলে ধরা হয় না। বিভিন্ন খাতের অব্যবস্থাপনা, বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন নির্মাণ ও সম্প্রচার করা হয় না। দেশের অন্য বেসরকারি টেলিভিশনগুলো যখন তাৎক্ষণিক সব সংবাদ পরিবেশন করে দর্শক টানছে, তখন বিটিভি হাঁটছে উল্টো পথে। বর্তমান সরকার অবাধ তথ্যপ্রবাহে বিশ্বাস করলেও বিটিভি কর্তৃপক্ষ অতীতের তোষণনীতিই অনুসরণ করছে। এতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে প্রতিষ্ঠানটি। বিটিভিতে কে সংবাদ পাঠ করবে, কোন শিল্পীকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, কার নাটক বা অনুষ্ঠান কেনা যাবে, টক শোতে কারা আলোচক হিসেবে আমন্ত্রিত হবেন—তোষামোদনীতি অনুযায়ী তা ঠিক করেন বিটিভিসংশ্লিষ্ট আমলারা। ফলে দক্ষ-যোগ্যরা বাদ পড়েন, মানসম্পন্ন কাজও হয় না। বছরের পর বছর ধরে চলছে এ চর্চা।

পরিস্থিতি বদলানোর জন্য বিভিন্ন সময় বিটিভিকে স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার দাবি ওঠে। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সচিব আসফ্উদ্দৌলাহেক চেয়ারম্যান করে ১৬ সদস্যের একটি স্বায়ত্তশাসন নীতিমালা প্রণয়ন কমিশন গঠন করা হয়েছিল। ওই কমিশন ব্রিটেন, ভারত, ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশ ঘুরে বেতার-টিভির পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসনের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের মধ্যভাগে সরকারের কাছে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিয়েছিল। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শেষ মুহূর্তে সংসদে একটি বিলও পাস হয়। কিন্তু পরে আর তা বাস্তবায়িত হয়নি।

তথ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিও বিটিভিতে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠান ও সংবাদের মান নিয়ে ক্ষুব্ধ। গত ২৮ আগস্ট সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কমিটি। তারা বিটিভিতে পেশাদার সাংবাদিক ও সংবাদ উপস্থাপক নিয়োগ দেওয়ার সুপারিশ করেছে।

কমিটির সদস্যরা ওই বৈঠকে বলেন, রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমটি সর্বসাধারণের চাহিদা মেটাতে পুরোপুরি ব্যর্থ। দেশে এখন অনেক বেসরকারি টিভি চ্যানেল আছে। সেগুলোর অনুষ্ঠানমালা ও সংবাদ মানুষের চাহিদার দিকে নজর রেখে নির্মাণ ও সম্প্রচার করা হয়। যে কারণে দর্শকরা বেসরকারি চ্যানেলের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। বিটিভিকে টিকে থাকতে হলে অনুষ্ঠানের মানোন্নয়ন, অনুষ্ঠান উপস্থাপনে দক্ষতা ও মেধার সমন্বয় ঘটানো জরুরি।

যোগাযোগ করলে ওই কমিটির সভাপতি এ কে এম রহমতুল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিটিভির অনুষ্ঠান ও সংবাদের মান উন্নয়ন হলে দর্শক আবার এ চ্যানেল দেখবে।

তবে বিটিভির মহাপরিচালক এস এম হারুণ-অর-রশীদ বলেন, শুধু বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান সম্প্রচারই বিটিভির একমাত্র কাজ নয়। ৭০ শতাংশ অনুষ্ঠানই তথ্য ও শিক্ষামূলক। এসব অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপন মেলে না। জনগণের সৃজনশীলতার বিকাশই সরকারি একমাত্র টেলিভিশনের মূল লক্ষ্য। এখানে অর্থ উপার্জন বড় নয়। তবে দেখতে হবে লোকসানটা যেন যৌক্তিক হয়। ভারতের টিভি চ্যানেল দূরদর্শনে বিজ্ঞাপন নেই, জাপানের সরকারি টেলিভিশন এনএইচকেও বিজ্ঞাপন নেয় না। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, ভবের হাট, পঞ্চ কবির গান, রবীন্দ্র-নজরুলের অনুষ্ঠান নিয়মিত সম্প্রচার করে জাতীয় দায়িত্ব পালন করতে হয় বিটিভিকে। অন্যান্য বেসরকারি চ্যানেলকে তা না করলেও চলে।

অভিযোগ রয়েছে, দেশের বেশির ভাগ এলাকায় বিটিভিতে ঝাপসা দৃশ্য দেখা যায়। এ বিষয়ে মহাপরিচালক এস এম হারুণ-অর-রশীদ বলেন, এখন বিটিভির সম্প্রচার হয় টেরেস্ট্রিয়াল সার্ভিসে। ১৪টি উপকেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের ৯৮ শতাংশ এলাকায় সম্প্রচারিত হচ্ছে বিটিভি। ১৪টি উপকেন্দ্রের মধ্যে মাত্র ছয়টি থেকে ডিজিটাল ট্রান্সমিশন দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। বাকিগুলো থেকে অ্যানালগ ট্রান্সমিশন করতে হচ্ছে। ট্রান্সমিশন সম্পূর্ণ ডিজিটাল করতে হবে। তাহলে ঝকঝকে দৃশ্য দেখা যাবে, দর্শকও বাড়বে।


মন্তব্য