kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বেনাপোল বন্দরে আগুন আমদানি পণ্য ছাই

বেনাপোল ও কালিয়াকৈর প্রতিনিধি   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বেনাপোল বন্দরে আগুন আমদানি পণ্য ছাই

যশোরের বেনাপোল বন্দরের ২৩ নম্বর শেডে গতকাল ভোরে লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের তৎপরতা। ছবি : ফিরোজ গাজী

দেশের সবচেয়ে বড় স্থলবন্দর বেনাপোলের গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় আমদানি করা প্রায় ১০০ কোটি টাকার মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

গতকাল রবিবার ভোর ৫টার দিকে অগ্নিকাণ্ডে বন্দরের ১৩ নম্বর শেডে রক্ষিত মালামালসহ বন্দর থানার আংশিক পুড়ে যায়।

প্রায় একই সময়ে গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুর এলাকায় যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান যমুনা ডেনিমস রিসাইক্লিং লিমিটেড কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তুলার গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে তা কারখানার নিটিং ও ফিনিশিং সেকশনে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে বিপুল পরিমাণ তুলা, সুতা, উৎপাদিত মাল ও মেশিন পুড়ে যায়।

বেনাপোল বন্দরের গুদামে আগুন : প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, গতকাল ভোরে বেনাপোলের গুদামের ২৩ নম্বর শেডে আগুন লাগে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। এতে গুদামে ও পাশে খোলা আকাশের নিচে রাখা বিভিন্ন মেশিনারিজ, টায়ার, সুতা, কাগজ, কেমিক্যাল এবং অন্যান্য আমদানি পণ্য পুড়ে যেতে থাকে। লোকজন ছোটাছুটি করে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে। খবর দেওয়া হয় ফায়ার সার্ভিসকেও।

বন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান স্বজন জানান, ভোরে আগুন লাগার পর ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি আসে আধাঘণ্টা পর। এরপর অন্যান্য ইউনিটের গাড়ি আসা শুরু হয়। কিন্তু এর আগেই আগুন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। বন্দরের নিজস্ব ফায়ার ফাইটার ইউনিট অকেজো থাকায় স্থানীয়ভাবে কোনো চেষ্টা করাই সম্ভব হয়নি। বাংলাদেশের ১২টি ইউনিট ও ভারতের একটি ইউনিট আগুন নেভানোর জোর চেষ্টা চালায়। পাঁচ-ছয় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি টাকার বেশি মালামাল পুড়ে গেছে বলে তিনি ধারণা করছেন।

বেনাপোল বন্দরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র সেন বলেন, ‘শর্টসার্কিট থেকে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে আমরা প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি। আগুন পুরোপুরি নিভলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানানো যাবে। বন্দর কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটির রিপোর্ট পেলে বিস্তারিত জানা যাবে। ’ এই কমিটি ১০ দিনের মধ্যে তাদের রিপোর্ট প্রদান করবে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষও একটি কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত কমিশনার ফিরোজ উদ্দিনকে প্রধান করে গঠিত এ কমিটিতে রয়েছেন আরো চার সদস্য। তাঁরা সাত দিনের মধ্যে রিপোর্ট প্রদান করবেন। অন্যদিকে একজন যুগ্ম সচিবকে প্রধান করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় তিন সদস্যবিশিষ্ট আরেকটি কমিটি গঠন করেছে।

সকাল ১১টার দিকে বেনাপোল বন্দরে গিয়ে দেখা গেছে, ২৩ নম্বর শেড ও পাশে খোলা আকাশের নিচে রাখা মালামাল পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। ফায়ার সার্ভিস তখনো আগুন নেভানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। বন্দর থানার সামনে রাখা বেশ কয়েকটি ভারতীয় ট্রাক ও বিভিন্ন সময়ে জব্দ করা প্রাইভেট কারও পুড়ে যেতে দেখা যায় এ সময়।

বন্দরের পরিচালক নিতাই চন্দ্র সেন বলেন, ওই গুদামে নানা ধরনের পণ্য ছিল। তবে প্রসাধন ও রাসায়নিক সামগ্রীই বেশি ছিল বলে জানান তিনি।

বন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মফিজুর রহমান বলেন, ১৯৯৬ সালেও বেনাপোল বন্দরে বড় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সে সময় প্রায় ২০০ কোটি টাকার মালামাল পুড়ে যায়। আমদানিকারকরা বন্দর থেকে এর কোনো ক্ষতিপূরণ পায়নি। বন্দরের নিজস্ব কোনো বীমা ব্যবস্থা না থাকায় সে সময় কোনো ক্ষতিপূরণ মেলেনি। এবার কী হয়, ব্যবসায়ীরা সেদিকে তাকিয়ে থাকবে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি দেখতে হেলিকপ্টারযোগে বেনাপোল বন্দরে আসেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান এমপি। তাঁর সঙ্গে ছিলেন নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব, বন্দরের চেয়ারম্যান ও যশোরের জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর।

কালিয়াকৈরে যমুনা কারখানায় আগুন : গাজীপুরের কালিয়াকৈরের সফিপুর এলাকায় যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান যমুনা ডেনিমস রিসাইক্লিং লিমিটেড কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল রবিবার ভোর সোয়া ৫টার দিকে যমুনা ডেনিমস রিসাইক্লিং কারখানার তুলার গুদাম থেকে আগুনের সূত্রপাত। পরে তা কারখানার নিটিং ও ফিনিশিং সেকশনে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে গুদামে থাকা বিপুল পরিমাণ তুলা, সুতা, পলিয়েস্টার, উৎপাদিত বিভিন্ন মালামাল, মেশিনসহ কারখানা ভবন পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের দাবি। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় আট ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এ সময় আগুন নেভাতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীসহ অন্তত পাঁচ শ্রমিক আহত হন। এ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডের সঠিক কারণ উদ্ঘাটনে জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

যমুনা ডেনিমস রিসাইক্লিং প্লান্টের ডিপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) আলমগীর হোসেন বলেন, ‘রাতে ওই কারখানায় ১৩ জন শ্রমিক কাজ করছিল। সেখানে কর্মরতরা আমাদের জানিয়েছে, কাজ শেষে রিসাইক্লিং মেশিন পরিষ্কার করার সময় হঠাৎ আগুন ধরে যায়। মুহৃতের্র মধ্যে আগুন ফিনিশিং সেকশন, প্যাকিং, তুলা ও সুতার গুদামে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের তাপে দুটি কারখানার ওপরের অংশ ধসে পড়ে। এ ছাড়া কারখানার ভেতর তুলা, সুতা, পলিয়েস্টার, রিসাইক্লিং ও ফিনিশিং মেশিনসহ বিভিন্ন মাল পুড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। ’

কারখানার ফায়ার অ্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) হরমুজ আলী বলেন, আগুনের সূত্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা যায়নি।

ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক শাকিল নেওয়াজ বলেন, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১৪টি ইউনিট ওই কারখানায় এসে চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুনের সূত্রপাতের কারণ ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যায়নি। তবে আগুনের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক জহুরুল আমীনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাহেনুল ইসলাম বলেন, কারখানার ক্ষয়ক্ষতি ও আগুনের সূত্রপাতের কারণ জানার জন্য গাজীপুর জেলা প্রশাসন ও ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।


মন্তব্য