kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সুন্দরবনে এবার ইট রড সিমেন্ট!

আরিফুর রহমান   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সুন্দরবনে এবার ইট রড সিমেন্ট!

সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের সম্ভাব্য ক্ষতির আশঙ্কায় এর পাশে রামপালে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো যখন সোচ্চার, সে অবস্থায় সুন্দরবন রক্ষার নামে এর ভেতরে ইট-সুরকির অবকাঠামো নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। ১৮৭৯ সালে ঘোষিত সংরক্ষিত বনে ইট-সুরকির অবকাঠামো নির্মাণে নিরুৎসাহ করা হলেও বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য ক্যাম্পে তৈরি করা হবে চারতলাবিশিষ্ট বেশ কয়েকটি ভবন।

অফিসের জন্যও ইট-বালু-রড-সিমেন্ট দিয়ে তৈরি হবে একাধিক ভবন। জলাবেষ্টিত সুন্দরবনের আশপাশের জেলাগুলোতে চলাচলের জন্য তিন কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি জিপ ও ২০টি মোটরসাইকেল কেনারও আয়োজন চলছে। সেই সঙ্গে পর্যটকদের থাকার জন্য ডরমিটরি ও ইকো কটেজ নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে বন বিভাগ।

ওই সব নির্মাণ উপকরণ নেওয়া হবে সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে। এতে সুন্দরবনের ভেতর থাকা বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী সব সময় আতঙ্কের মধ্যে থাকবে। সুন্দরবনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যেও বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

‘প্রটেকশন অব সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট’ শিরোনামের প্রকল্পের আওতায় এসব কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। ৭৮৫ কোটি টাকা ব্যয় ধরে প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অতি সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে বন বিভাগ। ইউনেসকো ঘোষিত বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান সুন্দরবন পর্যবেক্ষণের লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণেরও পরিকল্পনা নিয়েছে সরকারি সংস্থাটি। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর নির্মাণ করা হবে সীমানা দেয়াল। ইকো ট্যুরিজমের উন্নয়ন ঘটাতে সুন্দরবনের ভেতর সড়ক ও ঝুলন্ত সেতুও নির্মাণ করতে চায় বন বিভাগ।

পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ছয় হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে সুন্দরবন ‘সংরক্ষিত এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত। সেখানে ইকো ট্যুরিজমকে উৎসাহিত করা ঠিক হবে না। ইকো ট্যুরিজমকে উৎসাহিত করলে বনের ভেতর পর্যটকদের চলাচল বেড়ে যাবে। এতে বনের ভেতর থাকা বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণীর জীবন ও বসবাস হুমকিতে পড়বে। বনের ভেতর নতুন করে অবকাঠামো না গড়ে ইকো কটেজের ওপর গুরুত্ব দিতে বন বিভাগকে পরামর্শ দিয়েছেন কমিশনের কর্মকর্তারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক ভাগে গড়ে ওঠা সুন্দরবনকে তার মতো করেই থাকতে দেওয়া উচিত। নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা ঠিক হবে না। তাঁরা বলছেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে সেখানকার ইকো সিস্টেমের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বন্য প্রাণীর মধ্যেও ভয় ঢুকে যাবে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, এ প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে চলতি সপ্তাহে একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে। সে সভায় বন বিভাগের এসব প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হবে।

অবশ্য পরিকল্পনা কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, এ প্রকল্পে বিভিন্ন উপকরণ ও সেবা কেনা বাবদ অস্বাভাবিক খরচ ধরা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। তা ছাড়া কিছু অযৌক্তিক চাহিদাও দেওয়া হয়েছে। এক কর্মকর্তা বলেন, এ প্রকল্পের আওতায় ৫০ কোটি টাকা খরচ করে ১০টি সার্ভে করার কথা বলেছে বন বিভাগ। এ ছাড়া আরো ৫০ কোটি টাকা খরচ করে নদী ও খাল ড্রেজিং করার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাজারমূল্যের সঙ্গে পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এসব ব্যয় অস্বাভাবিক ও অযৌক্তিক। বাস্তবতার নিরিখে এসব ব্যয় ঠিক করা হয়নি। ওই কর্মকর্তা বলেন, সুন্দরবন নিয়ে আগেও অনেক জরিপ হয়েছে। তখন এত টাকা খরচ হয়নি। বন বিভাগের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় ১৮ কোটি টাকা ব্যয় রাখা হয়েছে পরামর্শক বাবদ। কিন্তু ঠিক কী কারণে এই পরামর্শকের প্রয়োজন হবে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো যুক্তি দেখাতে পারেনি বন বিভাগ। এর আগে জার্মানির সরকারি সংস্থাকে দিয়ে প্রায় একই ধরনের সার্ভে করা হয়েছে অত্যন্ত কম খরচে। গবেষণার জন্য ব্যয় ধরা আছে ছয় কোটি টাকা।

কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সুন্দরবন রক্ষার জন্য প্রধান কাজ হচ্ছে বেশি করে স্পিড বোট, ট্রলার ও অন্যান্য নৌযান কেনা। বন কর্মকর্তারা যাতে নির্বিঘ্নে অভিযানে যেতে পারেন, সে জন্য সার্বক্ষণিক নৌযান ও তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে আধুনিক অস্ত্র ও গুলি নিশ্চিত করা। এগুলো থাকলে যেকোনো অভিযান পরিচালনা করা সম্ভব। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্পে অস্ত্র, গুলি, ট্রলার ও নৌযান কেনায় তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে পরামর্শক, সার্ভে, ভবন নির্মাণ ও যানবাহন ক্রয়ে। এতে বোঝা যায়, প্রকল্পটি সুন্দরবন রক্ষায় নেওয়া হয়নি; হয়েছে ব্যক্তি লাভের উদ্দেশ্যে। এসব বিষয় আন্তমন্ত্রণালয় সভায় উত্থাপন করা হবে বলে জানান ওই কর্মকর্তা।

কয়েক মাস আগে সুন্দরবনে চাঁদপাই রেঞ্জে কর্মরত বন বিভাগের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন, যেকোনো অভিযানে যেতে তাঁদের ট্রলারের অপ্রতুলতা আছে। চাহিদা মতো তেল পাওয়া যায় না। চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে যে ধরনের আধুনিক অস্ত্র থাকা দরকার, তাঁদের কাছে তা নেই। এ জন্য বাধ্য হয়ে তাঁদের ডাকাতদল ও চোরাকারবারিদের সঙ্গে সমঝোতা করে থাকতে হয়। সুন্দরবনের ভেতর চোরাকারবারি ও ডাকাত প্রতিরোধে আধুনিক অস্ত্র, পর্যাপ্ত ট্রলার ও নৌযান এবং চাহিদার আলোকে তেল সরবরাহ করা জরুরি বলে জানান তিনি। অথচ প্রস্তাবিত প্রকল্পে এসব বিষয়ে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

বন বিভাগের প্রস্তাবে দেখা গেছে, মোট ব্যয় ৭৮৫ কোটি টাকার মধ্যে চায়নিজ রাইফেল ও বুলেট কেনা হবে মাত্র ছয় কোটি টাকার। এ ছাড়া শটগান ও বুলেট বাবদ এক কোটি ২৫ লাখ টাকা, চেতনানাশী বন্দুক ও ওষুধ বাবদ ৪০ লাখ টাকা, রিভলবার ও এর জন্য বুলেট বাবদ এক কোটি টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি হেলমেট কিনতে ২০ লাখ এবং হাতকড়া কেনা বাবদ মাত্র এক কোটি টাকা খরচ ধরা হয়েছে। এ ছাড়া তেল কেনা বাবদ খরচ ধরা হয়েছে ১১ কোটি টাকা। বন বিভাগের প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ প্রকল্পের আওতায় পরামর্শক খাতে খরচ হবে ১৮ কোটি টাকার মতো। দেশের মধ্যে এ ধরনের প্রকল্পে পরামর্শক খাতের ব্যয় নিয়েও আপত্তি তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন।

পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রস্তাবে বন বিভাগ জানিয়েছে, সিডর, আইলার মতো বড় ধরনের ঘূর্ণিঝড় থেকে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাঁচানোর জন্য সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জে ক্যাম্পগুলোতে চারতলা ভবন নির্মাণ করতে চায় তারা। ইকো ট্যুরিজমের উন্নয়নে বাগেরহাটের চাঁদপাই রেঞ্জে দুটি স্টাফ ব্যারাক নির্মাণ এবং চাঁদপাই, কটকা, করমজল, হাড়বাড়িয়া ও কৈলাসগঞ্জে প্রক্ষালনকক্ষ নির্মাণের প্রস্তাব করেছে বন বিভাগ। এ ছাড়া সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে ইকো ট্যুরিজম উন্নয়নের লক্ষ্যে একটি ডরমিটরি নির্মাণেরও পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলেন, বড় দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি। এসব ভবন হবে ইট-বালু-রড-সিমেন্ট দিয়ে। কিন্তু পরিবেশবিদরা বলছেন, এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ সুন্দরবনের বাইরে করা ভালো। তাঁরা বলছেন, ভবন বানালে জোরে শব্দ হবে। গভীর নলকূপ বসালে মোটর ছাড়তে গেলেও শব্দ হবে। এতে বন্য প্রাণীর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে।

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, সংরক্ষিত বনে এ ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা ঠিক হবে না। এসব অবকাঠামো সুন্দরবনের বাইরে নির্মাণ করা যেতে পারে। কারণ যেকোনো পর্যটক যখন সুন্দরবনে যায়, সে সুন্দরবনের ভেতরে থাকার আশা করে না। নদীর মাঝখানে লঞ্চে থাকতে সে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। তাই পর্যটকদের জন্য সুন্দরবনের ভেতরে কটেজ নির্মাণের প্রয়োজন পড়ে না। তিনি আরো বলেন, সাধারণত এসব প্রকল্প নেওয়া হয় ব্যক্তিগত লাভের জন্য; সুন্দরবন রক্ষা কিংবা উন্নয়নের জন্য নয়। তাঁর মতে, ওয়াচ টাওয়ার ইট-সুরকির বদলে কাঠ দিয়ে নির্মাণ করলে সেটি কোনো সমস্যা নয়।

এ প্রকল্পের আওতায় চারটি জিপ ও ২০টি মোটরসাইকেল কিনতে চায় বন বিভাগ। চারটি জিপ কেনা বাবদ আড়াই কোটি টাকা আর ২০টি মোটরসাইকেল কিনতে ৫০ লাখ খরচ হবে। সব মিলিয়ে তিন কোটি টাকা খরচের প্রস্তাব করা হয়েছে যানবাহন ক্রয়ে। জলাবেষ্টিত বন রক্ষার নামে জিপ ও মোটরসাইকেল কেনার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলেছেন, সুন্দরবন রক্ষায় বন বিভাগের উচিত বোট ও নৌযানের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া; যানবাহনের ওপর নয়। এ প্রসঙ্গে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আবদুল্লাহ হারুন চৌধুরীও বলেন, সুন্দরবনের জন্য বেশি করে বোট ও ট্রলার থাকা জরুরি। মোটরসাইকেল ও জিপ গুরুত্বপূর্ণ নয়। এসব যানবাহন কর্মকর্তারা ব্যবহার করবেন। তিনি বলেন, বোটের মধ্যে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও ল্যাবরেটরি করতে পারলে সেটি আরো উপকারী।

ওই প্রকল্প প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক জহির উদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বন বিভাগের আওতায় অনেক খাসজমি, বনায়ন ও চরের জমি আছে। সেগুলো নজরদারি করতে গাড়ি ও মোটরসাইকেল কেনার প্রস্তাব করা হয়েছে। সুন্দরবনের ভেতর ভবন নির্মাণের বিষয়ে তিনি বলেন, চারতলা নয়, ক্যাম্পগুলোতে এক থেকে দেড় তলা ভবন নির্মাণ করা হবে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। বড় ধরনের দুর্যোগে জেলেরা যাতে আশ্রয় নিতে পারে সে জন্য এসব ভবন নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আপনি এসব তথ্য কোথায় পেয়েছেন? এগুলো এখনো চূড়ান্ত হয়নি। ’ তবে বন বিভাগের সক্ষমতা বাড়াতে এসব অবকাঠামো নির্মাণ জরুরি বলে মত দেন তিনি। জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আমাকে সক্ষম করে তোলার পর যদি দেখেন আমি পারছি না, তাহলে ব্যর্থ বলতে পারেন। তার আগেই ব্যর্থ বলা ঠিক নয়। তা ছাড়া বড় কিছু করতে গেলে ছোটখাটো দুর্বলতা থেকে যায়। ’

জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো ১৯৯৭ সালে সুন্দরবনকে ৭৯৮তম বিশ্ব ঐতিহ্যের স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। দেশের দক্ষিণাঞ্চলের চার জেলার ১৯ উপজেলার ৩০ লাখ মানুষ সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জীবন-জীবিকা এই সুন্দরবন ঘিরে।


মন্তব্য