kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিবিএসের প্রতিবেদন আজ প্রকাশ

বিবাহিত নারীর ৮০% নির্যাতনের শিকার

আরিফুর রহমান   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিবাহিত নারীর ৮০% নির্যাতনের শিকার

সরকারপ্রধান, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকার, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রীসহ সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পদে নারীদের জয়জয়কার সত্ত্বেও দেশে ৮০ শতাংশ নারী বিবাহিত জীবনে নির্যাতনের শিকার। স্বামীর মাধ্যমে জীবনের কোনো না কোনো সময়ে তারা যৌন, শারীরিক, অর্থনৈতিক, মানসিক নির্যাতন ভোগ করেছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। বিবিএস বলছে, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করে তারা দেখেছে, বিবাহিত নারীদের প্রতি যৌন নির্যাতন কমে এলেও শারীরিক নির্যাতন বেড়েছে। সমাজে সম্মানহানি ও হেয় হওয়া থেকে রক্ষা পেতে তারা আইনের আশ্রয় নেওয়া থেকে বিরত থেকেছে। নির্যাতনের পর বেশির ভাগ নারীই মামলা করেনি। এতে করে শারীরিক নির্যাতন আরো বাড়ছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, অবিবাহিত নারীদের ওপরও নির্যাতন বেড়েছে। বিবিএসের করা প্রতিবেদনটি আজ রবিবার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করার কথা রয়েছে। রাজধানীর শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।

নারী নেত্রীরা বলছেন, দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে নারী  নির্যাতন কমছে না। এখন পর্যন্ত দেশে একটি দৃষ্টান্তও স্থাপিত হয়নি যে পুরুষরা স্ত্রীর ওপর নির্যাতন করার পর বড় ধরনের শাস্তি পেয়েছে। যত দিন অপরাধীদের শাস্তি না হবে, তত দিন নারী নির্যাতন চলতেই থাকবে বলে মনে করেন তাঁরা।

দেশে নারী নির্যাতন নিয়ে এর আগে ২০১১ সালে একটি জরিপ করেছিল বিবিএস। ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনস্ট উইমেন’ শিরোনামের ওই জরিপে বলা হয়েছিল, বিবাহিত নারীর ৮৭ শতাংশই নির্যাতনের শিকার। সে হিসাবে চার বছরের ব্যবধানে এ হার ৭ শতাংশ কমেছে। জরিপের সমন্বয়ক জাহিদুল হক সরদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মাঠপর্যায়ে তথ্য আনতে গিয়ে দেখেছি, সার্বিকভাবে নারী নির্যাতনের হার কিছুটা কমেছে। তবে শারীরিক নির্যাতন বেড়েছে। ’ বিবিএসের এ তথ্যের সঙ্গে একমত নন নারী নেত্রীরা। তাঁদের মতে, বিবাহিত নারীর ওপর নির্যাতন কমেনি, বরং বেড়েছে। বিবিএসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রংপুর ও খুলনা বিভাগে শারীরিক ও যৌন নির্যাতন বেশি হচ্ছে। এই দুই অঞ্চলের ৩৪ শতাংশ নারী বলেছে, তারা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। আর ৬০ শতাংশ বলেছে শারীরিক নির্যাতনের কথা। সিলেট অঞ্চলে যৌন নির্যাতনের হার তুলনামূলক কম—২০ শতাংশ।

মহিলা আইনজীবী সমিতির নেতা ও বিশিষ্ট আইনজীবী সালমা আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, নারী নির্যাতনের প্রধান কারণ হলো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা। পুরুষের হাতে আছে অর্থনৈতিক শক্তি। ঐতিহাসিকভাবে পুরুষরা স্ত্রীদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে আসছে এবং পরিবারের প্রধান কর্তা হিসেবে ভেবে আসছে। এসব কারণে নারী নির্যাতন কমছে না, বরং বাড়ছে। তিনি বলেন, দেশে পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইন আছে। তাতে পারিবারিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু সে আইনের কোনো বাস্তবায়ন নেই।

অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, কয়েক বছর আগেও মেয়েরা এতটা প্রতিবাদী ছিল না। তবে ধীরে ধীরে অবস্থা পাল্টাচ্ছে। ঢাকায় নারীদের পক্ষ থেকে ডিভোর্সের হার বেড়েছে। এর কারণ তারা এখন অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আদালত ও বিভিন্ন মহিলা সংগঠনেও নারীদের অভিযোগের হার বাড়ছে বলে জানান তিনি। অপরাধ করেও শাস্তি না পাওয়ার কারণে নারী নির্যাতন বাড়ছে বলেও মনে করেন সালমা আলী।

বিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৫০ শতাংশ নারী জানিয়েছে, তারা পরিবার থেকে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ২৭ শতাংশ স্ত্রীর দাবি, তারা যৌন নির্যাতনের শিকার। ১১ শতাংশ স্ত্রী বলেছে, তাদের অর্থনৈতিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। ৫৫ শতাংশ জানিয়েছে, কনট্রোলিং বা নিয়ন্ত্রণ কিংবা কর্তৃত্ব করেছে স্বামী। বিবিএস বলেছে, গ্রামে নারী নির্যাতনের হার বেশি। গ্রামাঞ্চলে ৭৫ শতাংশ নারী স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) ও মহিলা আইনজীবী সমিতির নেতারা বলেছেন, নারী নির্যাতনের প্রধান কারণই হলো পুরুষের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণের মনোভাব। আর এর জন্য দেশের সমাজব্যবস্থাকে দায়ী করেছে তারা। যেখানে এখনো নারীর ওপরে ওঠা, কর্তৃত্ব, অধিকার ও তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি স্বামী ও সমাজ মেনে নিতে পারে না। নারী নেত্রীরা বলছেন, সমাজ এখনো পুরুষের আধিপত্যে বিশ্বাসী। স্ত্রীর ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য দেওয়া হয় না পরিবারে। এই মনোভাব পরিবর্তন করা জরুরি।

প্রতিবেদনে আরো দেখা গেছে, স্বামীর মাধ্যমে যারা নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই সহিংসতার বিষয়টি কাউকে জানায়নি। বিবিএসের কর্মকর্তারা বলেছেন, নারীদের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তারা (নারী) বলেছে, নির্যাতনের বিষয়টি শুধু তাদের (স্ত্রীর) পরিবারের সদস্য ও পাড়া-প্রতিবেশীকে জানানো হয়েছে। দেখা গেছে, ২ শতাংশ নারী আনুষ্ঠানিকভাবে সমাজ ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে অভিযোগ করেছিল। আর মাত্র ১ শতাংশ নারী নির্যাতনের বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। পরিবারের সম্মান, ভয় ও হয়রানির ভয়ে বেশির ভাগ নারী অভিযোগ করেনি বলে জানিয়েছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৩৫ শতাংশ অবিবাহিত নারী পরিবারের সদস্যদের বাইরে বিভিন্ন সহিংসতার শিকার হয়েছিল। ৫ শতাংশ অবিবাহিত নারী বলেছে, তারা পরিবারের বাইরে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল।

বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের এক জরিপেও দেখা গেছে, দেশে নারী নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে। সম্প্রতি করা ওই জরিপে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে নারী নির্যাতনের ঘটনা ৭৪ শতাংশ বেড়েছে। ব্র্যাকের তথ্য মতে, নারীর প্রতি সহিংস ঘটনার ৬৮ শতাংশই নথিভুক্ত হয় না। নথিভুক্ত হলে সংখ্যাটি আরো বাড়ত।


মন্তব্য