kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বন্দরে পণ্যজট কমাতে লাগবে তিন সপ্তাহ

ভোক্তাদেরই দিতে হবে মাসুল

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বন্দরে পণ্যজট কমাতে লাগবে তিন সপ্তাহ

চট্টগ্রাম বন্দর চত্বর ও বেসরকারি ১৬টি কনটেইনার ডিপোতে যে পরিমাণ পণ্যভর্তি কনটেইনারের জট লেগেছে সেটা স্বাভাবিক করতে অন্তত তিন সপ্তাহ সময় লাগবে। বন্দর ও বন্দর ব্যবহারকারী সব সংস্থা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করলেও এই সময় লাগবে।

যদি নতুন করে কোনো ধর্মঘট হয়, তাহলে এই সময় আরো বেড়ে যাবে।

বন্দরে পণ্য পরিবহনকারী গাড়ির চালক ও শ্রমিকদের প্রায় ১০০ ঘণ্টার ধর্মঘটে চট্টগ্রাম বন্দরে জমে আছে ২০ ফুট দৈর্ঘ্যের ৪০ হাজার একক কনটেইনার। এর বাইরে বেসরকারি কনটেইনার ডিপোতে জমে আছে ১১ হাজার একক কনটেইনার। আমদানি ও রপ্তানি পণ্যভর্তি এসব পণ্যের বাজারমূল্য অন্তত ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

নির্ধারিত সময়ে পণ্য রপ্তানি করতে না পারায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছে তৈরি পোশাক কারখানা মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। অন্যদিকে ঠিক সময়ে পণ্য বন্দর থেকে ছাড় করতে না পারার মাসুল যোগ হয়ে বেড়ে যাবে আমদানি পণ্যের দাম।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (অ্যাডমিন ও প্ল্যানিং) জাফর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, বন্দরের পণ্য ওঠানামা ও সরবরাহ একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর কোথাও ব্যাঘাত ঘটলে পুরো প্রক্রিয়ার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি জানান, ঈদের ছুটিতে কনটেইনারের জট সামাল দিতে বন্দর কর্তৃপক্ষের ১২ দিন সময় লেগেছিল। সেই ধাক্কা সামলে না উঠতেই এখন নতুন জটের সৃষ্টি হয়েছে। নতুন করে কোনো সমস্যা না হলে পরিস্থিতি সামলে উঠতে অন্তত ২০ দিন সময় লাগবে বলে বন্দরের এ কর্মকর্তা মনে করেন।

বন্দরের ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ধর্মঘট স্থগিত করায় শুক্রবার ছুটির এক দিনে প্রায় দুই হাজার ৭০০ একক কনটেইনার ছাড় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বন্দরে রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার প্রবেশ করেছে দেড় হাজার একক। সেগুলো জাহাজীকরণ করা হলেও আরো কনটেইনারের অপেক্ষায় জাহাজ ছেড়ে যায়নি। আজ রবিবার একসঙ্গে সাতটি জাহাজ ছেড়ে যাওয়ার সময়সূচি নির্ধারিত রয়েছে। কিন্তু এক রাতে এত রপ্তানি কনটেইনার ঢুকতে না পারলে কয়েকটি জাহাজের ছেড়ে যেতে দেরি হতে পারে।

কনটেইনার ডিপো মালিকদের সংগঠন বিকডার সচিব রুহুল আমিন সিকদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চাপ সামাল দিয়ে স্বাভাবিক হতে কমপক্ষে দুই সপ্তাহ লাগবে। ’ তিনি জানান, ১৬টি ডিপোতে ১১ হাজার এককের বেশি কনটেইনার জমে গেছে। এগুলোর বাজারমূল্য ১২ হাজার কোটি টাকা। প্রতিদিন দেড় হাজার কনটেইনার বের হলেও এর বেশি আমদানি কনটেইনার প্রবেশ করছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, শুক্রবার পর্যন্ত বন্দরে ৪০ হাজার একক পণ্যভর্তি কনটেইনার জমেছিল। প্রতিটি কনটেইনারে এক থেকে দেড় হাজার কোটি টাকার পণ্য থাকে। সে হিসাবে বন্দরেই পড়ে আছে ৫০ হাজার কোটি টাকার পণ্য। রপ্তানি পণ্য দেরিতে জাহাজীকরণ হওয়ায় অনেকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে, কারো হয়তো অর্ডার বাতিল হবে। আমদানি পণ্য ঠিক সময়ে সরবরাহ না করায় পণ্যের দামের সঙ্গে বাড়তি মাসুল যোগ হয়ে পণ্যের বিক্রয়মূল্য বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এই বোঝা বইতে হবে ভোক্তাদের।

বিজিএমইএর পরিচালক আ ন ম সাইফুদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর এতটা অপরিহার্য বলেই বছরের ৩৬৫ দিনই (দুই ঈদে দুই শিফটে মাত্র ১৬ ঘণ্টা ছাড়া) খোলা রাখা হয়। সুতরাং এর সঙ্গে জড়িত বন্দর ব্যবহারকারী-সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে অপরিহার্য খাত হিসেবে ঘোষণা দিয়ে তাদেরও সেভাবে চালানো উচিত।

সাইফুদ্দিন আরো বলেন, বন্দর ব্যবহার-সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একটি সুপ্রিম কমিটি থাকবে। কোনো সংস্থার দাবি-দাওয়া থাকলে আগে সেখানেই উপস্থাপন করতে হবে। কমিটি বিষয়টি সমাধান করবে। তা না হলে হঠাৎ করেই যে কেউ দাবি আদায়ে ধর্মঘট ডেকে অচলাবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।

উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়কের স্থায়িত্ব রক্ষায় সড়ক ও জনপথ বিভাগ গত ১৬ আগস্ট প্রজ্ঞাপন জারি করে গাড়িভেদে পণ্য পরিবহনের সীমা বেঁধে দেয়। নির্ধারিত সীমা পার হলেই গাড়িগুলোকে স্তরভেদে দুই হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে বলে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়। কনটেইনার পরিবহনকারী গাড়ি প্রাইম মুভার ও ট্রেইলরগুলো ১৪ চাকার। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এ ধরনের গাড়ি মালামালসহ ৩৩ টন পর্যন্ত পরিবহন করতে পারবে। কিন্তু প্রাইম মুভার ও ট্রেইলর মালিক-চালকরা একজোট হয়ে এর বেশি পণ্য পরিবহনের দাবিতে গত ২৫ সেপ্টেম্বর সকাল থেকে হঠাৎ ধর্মঘট ডেকে বসেন। এতে প্রায় আট হাজার ট্রেইলর ও প্রাইম মুভারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে দেশের পুরো আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম নগর পুলিশের কমিশনার ইকবাল বাহার চৌধুরীর মধ্যস্থতায় গাড়ির মালিক-শ্রমিকরা ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ধর্মঘট স্থগিত করে। এরপর ওই দিন দুপুর ১২টা থেকে পণ্য পরিবহন আবার শুরু হয়।

এদিকে ৫ অক্টোবর থেকে নতুন করে পণ্য পরিবহন ধর্মঘটের হুমকি দিয়েছে আন্তজেলা ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতি। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সমিতি ছয় দফা দাবি উত্থাপন করে এ কর্মসূচি ঘোষণা করে।


মন্তব্য