kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আমলাদের দাপটে স্তব্ধ সৃজনশীলতা

পার্থ সারথি দাস   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আমলাদের দাপটে স্তব্ধ সৃজনশীলতা

পৃথিবীটা ছোট হতে হতে স্যাটেলাইট আর কেবলের হাতে বন্দি হয়েছে অনেক আগেই। টেলিভিশনের রিমোট টিপলে মুহূর্তেই দুনিয়ার সব কিছু দেখা যায়।

কিন্তু সেই রিমোটে যে বোতাম চাপলে বিটিভি (বাংলাদেশ টেলিভিশন) দেখা যায়, তাতে চাপ পড়ে সবচেয়ে কম। কারণ বিটিভি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে দর্শক। অথচ টেরেস্ট্রিয়াল চ্যানেল হওয়ায় বিটিভি দেখতে কেবল সংযোগেরও দরকার হয় না।

একটি বেসরকারি সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, দেশি দর্শকের ৭০ শতাংশই বিদেশি টেলিভিশন চ্যানেল দেখে। বাকি ৩০ শতাংশের মধ্যে বিটিভির দর্শক একেবারে কম। বিশেষ করে নগর এলাকায় বিটিভির দর্শক সবচেয়ে কম। দেশের ৯৮ শতাংশ এলাকায় সম্প্রচারিত হয়, রয়েছে সর্বাধুনিক স্টুডিও, তবু বেশির ভাগ এলাকায় বিটিভির দৃশ্য ঝাপসা।

১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর ‘পাকিস্তান টেলিভিশন’ হিসেবে পথচলা শুরু, স্বাধীনতার পর নাম বদলে বিটিভি হয়েছে। বয়স চলছে ৫২ বছর। সাদা-কালোর যুগ শেষে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনটি রঙিন সম্প্রচার শুরু করেছে ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে। তবে সম্প্রচার রঙিন হলেও প্রতিযোগিতার বাজারে বিটিভির অবস্থা দিন দিন ফিকে হয়ে যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বছরের পর বছর মানহীন অনুষ্ঠান সম্প্রচারের কারণেই দর্শক হারিয়েছে একসময়ের তুমুল জনপ্রিয় চ্যানেলটি। মানসম্পন্ন অনুষ্ঠানের খরার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। ২৭ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সরাসরি নিয়োগ, শূন্য পদের হাহাকার সর্বত্র। কাজ চলছে প্রেষণে ও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে। দিন-রাত মিলিয়ে ১০ বার সংবাদ সম্প্রচার করা হয়। অথচ জন্মের পর থেকে বার্তা বিভাগে প্রতিবেদক পদই সৃষ্টি করা হয়নি। ১৯৯০ সালের পর থেকে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বিভিন্ন ক্যাডার থেকে আসা কর্মকর্তারা। দক্ষ লোকদের এড়িয়ে গড়ে উঠেছে আমলাদের সিন্ডিকেট। সৃজনশীল লোকজন নেই। সব মিলিয়ে কর্কট রোগীর মতো ধুঁকছে বিটিভির প্রাণ।  

বিটিভি কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন করে প্রতিযোগিতায় নামতে হলে ৭৯১টি পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দিতে হবে। বর্তমান জনবল কাঠামোয় শূন্য রয়েছে ৪০৭টি পদ।   সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আশির দশক থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সোনালি সময় ছিল বিটিভির। আশির দশকে বিটিভিতে বিভিন্ন পদে যোগ দিয়েছিলেন ম হামিদ, নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু, খ ম হারুন, আবু তাহের, আল মনসুর, আহসান হাবীব, মেনকা হাসান প্রমুখ। তারও আগে ষাটের দশকে যোগ দিয়েছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার, কলিম শরাফী, খালেদা ফাহমী, আবদুল্লাহ আল-মামুন, মোস্তাফিজুর রহমান, আতিকুল হক চৌধুরী, নওয়াজেশ আলী খান, বরকতউল্লাহদের মতো সৃজনশীল ব্যক্তি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন দক্ষ ও সৃজনশীল লোকজনকে বিটিভিমুখী করা যাচ্ছে না উপযুক্ত নিয়োগবিধির অভাবে। ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিটিভির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করা ম হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, সঠিক লোক বাছাই করলে সঠিক পথেই চলে কোনো প্রতিষ্ঠান। ভুল নিয়োগ ও পদোন্নতির ফলে ২০০০ সালের পর থেকেই বিটিভিতে সৃজনশীল লোকের অভাব প্রকট হতে থাকে। সামগ্রিক কর্মকাণ্ডে তার বিরূপ প্রভাব পড়েছে। নিচের স্তর থেকে ওপরের স্তরে পদোন্নতির ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগছে। সর্বশেষ পদোন্নতির মাত্র দুই থেকে তিন বছর পরই কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবসরে যাচ্ছেন।

ম হামিদ ১৯৮০ সালে প্রযোজক হয়ে ঢুকেছিলেন বিটিভিতে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, সত্তরের দশকের শেষ ভাগ থেকে অনুষ্ঠানের মান বাড়ছিল। আশির দশকে তার সামগ্রিক বিকাশ ঘটে। অভিজ্ঞ, দক্ষ ও সৃজনশীল ব্যক্তিরা ছিলেন নেতৃত্বে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে বিটিভিতে শ্রেষ্ঠ কাজগুলো হয়েছে। বিটিভির অনুষ্ঠান দেখতে দর্শক হুমড়ি খেয়ে পড়ত। নির্দিষ্ট সময়ে টিভির সামনে হাজির থাকতে রাস্তাঘাট পর্যন্ত ফাঁকা হয়ে যেত।  

এখনো শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে সচেতন করে তুলতে সবচেয়ে বেশি অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে বিটিভি। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়েও নিয়মিত অনুষ্ঠান নির্মিত হচ্ছে বিটিভিতেই। তবে সেসব দেখার কেউ নেই। কারণ দর্শক-রুচির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানসম্পন্ন বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান নেই বিটিভিতে।    

দেশে বেসরকারি টিভির সম্প্রচার শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। প্রায় দুই দশকের ব্যবধানে সরকার অনুমোদন দিয়েছে ৪১টি বেসরকারি চ্যানেলের। তার মধ্যে এখন সম্প্রচারে আছে ২৬টি বেসরকারি চ্যানেল। তাদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অনুষ্ঠানের মান বাড়িয়ে দর্শক ধরে রাখা ও বিজ্ঞাপন থেকে আয় বাড়ানোর মহা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিটিভি। আর তাতে হারের বৃত্তটাই দিন দিন বড় হচ্ছে। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকায় দেড় দশক ধরে বিজ্ঞাপনের একচেটিয়া বাজার হাতছাড়া হয়েছে বিটিভির।

বিটিভির সাবেক মহাপরিচালক এ কে এম হানিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, মানুষ বাধ্য না হলে বিটিভি দেখে না। যাদের ঘরে বা বাড়িতে কেবল সংযোগ নেই, তারাই এখন বিটিভির অনিবার্য দর্শক। কিন্তু বিটিভিতে ভালো মানের অনুষ্ঠানের ঘাটতিতে দর্শকরা বেসরকারি চ্যানেল বা বিদেশি চ্যানেল দেখছে।

বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিটিভিতে সাংঘাতিক সংকট চলছে। যোগ্য প্রযোজক নেই। বিসিএস ক্যাডার থেকে যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, তাঁদের এ বিষয়ে যথাযথ ধারণা নেই। এটি একটি আমলাতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ১৯৬৮ সাল থেকে বিটিভির সঙ্গে ছিলাম। বিটিভিতে অসংখ্য ভালো নাটক লিখেছি, অভিনয়ও করেছি। আমরা বিটিভির স্বায়ত্তশাসন চেয়েছিলাম, সেটা তো হয়নি। এখন সৃজনশীলতা ও উন্নয়নের জন্য বাইরের দক্ষ লোক নিতে হবে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে। ’

সাবেক মহাপরিচালক ম হামিদের মতে, বেসরকারি চ্যানেলগুলোতে নিয়ত সৃজনশীলতার পরীক্ষা দিয়ে টিকে থাকতে হয়। বিটিভিতে তা নেই। পিএসসির (সরকারি কর্মকমিশন) পরীক্ষার মাধ্যমে তো আর সৃজনশীল লোক বাছাই করে নিয়োগ দেওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে বিটিভিতে নিয়োগের সময় পিএসসির নিয়মের পাশাপাশি সৃজনশীলতার জন্য পরীক্ষা নেওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে সফল সাংস্কৃতিক ব্যক্তিদের নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যোগ করা যায়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিচ্ছিন্নভাবে মাঝেমধ্যে বিভিন্ন পদে নিয়োগ দেওয়া হলেও সরাসরি নিয়োগ বন্ধ রয়েছে ২৭ বছর ধরে। মহাপরিচালক থেকে ব্যবস্থাপক পর্যন্ত তিন ডজন পদে নিজস্ব কর্মকর্তা আছেন মোটে পাঁচ থেকে ছয়জন। বাকিরা অতিরিক্ত দায়িত্বে, প্রেষণে বা পদোন্নতি পেয়ে এসেছেন। অস্থায়ী ও চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীর আধিক্যে বিটিভির অনুষ্ঠানের মান ও ব্যবস্থাপনা তলানিতে ঠেকেছে। শুরুতে সম্প্রচারকাল ছয় ঘণ্টা থাকলেও বর্তমানে বিটিভিতে দিনে ১৮ ঘণ্টার টেরেস্ট্রিয়াল সম্প্রচারসহ বিটিভি ও বিটিভি ওয়ার্ল্ডে ২৪ ঘণ্টা স্যাটেলাইট সম্প্রচার চলছে। তবে জনবল কাঠামোতে পরিবর্তন হয়নি। ছয় ঘণ্টা সম্প্রচারের জন্য ১৯৮৩ সালে যে জনবল কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল, এখনো তা দিয়েই বিটিভির সম্প্রচার চলছে।

জনবল বিষয়ে বিটিভির তৈরি করা সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে, স্থায়ী এক হাজার ৫৯৪টি পদের মধ্যে ৩১৪টি এবং অস্থায়ী ১২৯টি পদের ৯৩টি শূন্য রয়েছে। বিটিভির চট্টগ্রাম কেন্দ্রে সম্প্রচারকাল দেড় ঘণ্টা থেকে ছয় ঘণ্টা করার পরিকল্পনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ওই কেন্দ্রে ৩৪২টি নতুন পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দিতে হবে। পাশাপাশি ঢাকা কেন্দ্র ও উপকেন্দ্রগুলোতে আরো ৩৯৯টি নতুন পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ দিতে হবে।

বিটিভি-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ১৯৮৩ সালে অনুমোদিত সাংগঠনিক কাঠামোয় ঢাকা কেন্দ্র এবং চট্টগ্রামসহ আটটি উপকেন্দ্র থেকে ছয় ঘণ্টা অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সম্প্রচারের জন্য এক হাজার ২৬৩ জনবল নির্ধারণ করা হয়। পরে আরো কিছু পদ সৃষ্টি হওয়ায় স্থায়ী এক হাজার ৫৯৪টি ও অস্থায়ী ১২৯টিসহ মোট পদ আছে এক হাজার ৭২৩টি। এ সময়ের মধ্যে বিটিভির উপকেন্দ্র বাড়ানো হয়েছে ছয়টি। বর্তমানে উপকেন্দ্রের সংখ্যা ১৪।

বিটিভির তৈরি করা প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুষ্ঠান শাখায় ৬৫ পদের মধ্যে ৩১টি, বার্তা বিভাগের ৩৩টির মধ্যে সাতটি, শিল্প নির্দেশনা শাখায় ৩১টির মধ্যে ১৭টি, প্রকৌশল শাখায় ৮২টির মধ্যে ৩৯টি, ক্যামেরা শাখায় ৫৪টির মধ্যে ২১টি পদ শূন্য রয়েছে। অনুষ্ঠান শাখায় অনুষ্ঠান নির্বাহীর চারটি পদে একটিতে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে কাজ চালানো হচ্ছে। নির্বাহী প্রযোজকের ১১টি পদের মধ্যে চারজন আছেন চলতি দায়িত্বে, একজন আছেন প্রেষণে। বার্তা শাখায় প্রযোজক (বার্তা) গ্রেড-২ পদে ১৫ জনের মধ্যে আছেন একজন। ক্যামেরা শাখায় চিত্রগ্রাহকের (গ্রেড-২) ১৯টি পদের মধ্যে মাত্র সাতজন কর্মরত আছেন। প্রকৌশল শাখায় টিভি প্রকৌশলী গ্রেড-২-এর ২১ জনের মধ্যে আছেন দুজন। ডিজাইন শাখায় ঊর্ধ্বতন শিল্প নির্দেশকের সাতজনের মধ্যে কর্মরত আছেন দুজন।

বিটিভিতে প্রধান চিত্রগ্রাহকের পদ আছে পাঁচটি, কর্মরত আছেন তিনজন আর অতিথি চিত্রগ্রাহক আছেন ২৪ জন। বার্তা বিভাগে প্রতিবেদকের পদ নেই। অস্থায়ী ভিত্তিতে ৬০ জন প্রতিবেদককে চুক্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বেশির ভাগের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা নেই।

অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের অনুগত কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন ক্যাডার থেকে নিয়োগ পাওয়া বিটিভির মহাপরিচালক, উপমহাপরিচালক ও জেনারেল ম্যানেজার। বিটিভিতে নিজস্ব নির্মাতাদের কাজের সুযোগ সীমিত করে অনভিজ্ঞদের দিয়ে অনুষ্ঠান বানানো হচ্ছে। তথ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব থেকে গত ১৬ জানুয়ারি বিটিভির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পান হারুণ-অর-রশীদ। সচিব হওয়ার জন্য যাঁদের খুশি রাখা দরকার তাঁদের নিয়েই তিনি অনুষ্ঠান পরিকল্পনা করেন। তবে নতুন মহাপরিচালক কালের কণ্ঠ’র কাছে দাবি করেছেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে অনুষ্ঠানের মান বাড়ানো হচ্ছে। নতুন নতুন অনুষ্ঠান নির্মাণ করা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও দর্শক কেন কমছে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বেসরকারি চ্যানেল বেড়েছে বলেই এটি হচ্ছে। ’  

বিটিভির উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) পদে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক যুগ্ম সচিব সুরথ কুমার সরকারকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিটিভির নিজস্ব নির্মাতা ও প্রযোজকদের এড়িয়ে বেতার থেকে আসা কিছু কর্মকর্তাকে নিয়ে অনুষ্ঠান পরিকল্পনা ও নির্মাণে বেশি উৎসাহী তিনি। বেতার থেকে বিটিভিতে প্রেষণে পর পর তিনটি পদে দায়িত্ব পালন করছেন এস এম নোমান হাসান খান। তিনি অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ (প্রশাসন), অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ (সংগীত) এবং মা ও শিশু উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক। সহকর্মীরা আড়ালে বলেন, অনুষ্ঠান প্রযোজনা ও নির্মাণের কিছুই বোঝেন না এস এম নোমান হাসান খান। তবু তাঁকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে রাখা হয়েছে। কারণ তাঁর ওপর সুরথ কুমারের আশীর্বাদ রয়েছে। নিয়ম অনুসারে, কোনো ক্যাডার কর্মকর্তা তিন বছরের বেশি কোনো পদে থাকতে পারেন না। নোমান হাসান খান ২০০৯ সালের ২ নভেম্বর থেকে বিটিভিতে আছেন।

অভিযোগের বিষয়ে এস এম নোমান হাসান খান বলেন, ‘বেতারে ৯ বছর কাজ করেছি। বেতার থেকে আসায় কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়ে আমার বিরুদ্ধে অনভিজ্ঞতার অভিযোগ করতে পারেন। ’

অনুষ্ঠান নির্মাণের কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও অনুষ্ঠান অধ্যক্ষ (নাটক) পদে আছেন বেতার থেকে আসা আজগর আলী। ২০১৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তিনি কন্ট্রোলার প্রোগ্রাম ম্যানেজার পদে যোগ দেন। নিজের প্রতিটি অনুষ্ঠান তিনি বিটিভির অন্যান্য সহযোগী বা প্রযোজকদের দিয়ে করিয়ে নেন। যোগাযোগ করলে আজগর আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পেশাগত ঈর্ষা থেকে কেউ আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিতে পারে, তবে সেগুলো সত্য নয়। ’

২০১৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে মাহফুজার রহমান অনুষ্ঠান অধ্যক্ষের সাময়িক দায়িত্বে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর ১০টি উদ্যোগের দেখভাল করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁকে। তবে তিনিও নিজে অনুষ্ঠান বানান না। অন্যদের দিয়ে নির্মাণ করান। একটি প্রকল্পের সাচিবিক দায়িত্বও পালন করছেন তিনি। বিটিভির মহাপরিচালক তাঁকে এ পদে বসিয়েছেন। তাতে তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোনো মত নেওয়া হয়নি।

ডিএফপির চিত্রগ্রাহক থেকে প্রেষণে ফজলে আজিমকে ২০০৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিটিভির নির্বাহী প্রযোজক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনুষ্ঠান নির্মাণে তাঁরও কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ২০১৩ সালের ১৬ জানুয়ারি থেকে শাহরিয়ার মোহাম্মদ হাসান কন্ট্রোলার/প্রোগ্রাম ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন। তিনি মূলত মুখ্য সম্পাদক উপস্থাপন ও মনিটরিংয়ে অভিজ্ঞ। নিয়োগবিধিতে না থাকলেও উপস্থাপন ও মনিটরিংয়ের মুখ্য সম্পাদক থেকে তাঁকে অনুষ্ঠান অধ্যক্ষের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আইনবহির্ভূতভাবে তাঁকে দায়িত্ব ভাতাও দেওয়া হচ্ছে। কারণ উপমহাপরিচালক (অনুষ্ঠান) সুরথ কুমারের সঙ্গে তাঁর সখ্য রয়েছে। বিটিভির দর্শকদের মতামত বা জরিপের কাজের দায়িত্বও শাহরিয়ার হাসানের। তবে সেই দায়িত্ব পালন করেন না তিনি। বর্তমানে তিনি সরকারি সফরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন। জেনারেল ম্যানেজারের পদটিতে অনুষ্ঠান নির্মাতা ও সৃজনশীল লোকদের নিয়োগ দেওয়ার কথা। তবে সেখানে দায়িত্ব পাওয়া মাসুদুল হকের এ বিষয়ে যথাযথ অভিজ্ঞতা নেই। যদিও মাসুদুল হক কালের কণ্ঠ’র কাছে দাবি করেছেন, তিনি আসার পর মানসম্মত অনুষ্ঠান তৈরি করতে সচেষ্ট আছেন।

যোগাযোগ করলে সুরথ কুমার সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিটিভির সঙ্গে দেশের অন্যান্য বেসরকারি চ্যানেলের পার্থক্য রয়েছে। আমরা কোনো বেসরকারি চ্যানেলকে প্রতিযোগী মনে করি না। কারণ বিটিভি একেবারে বিনোদন বা একেবারে সংবাদনির্ভর চ্যানেল নয়। সরকারের উন্নয়নকাজ আমাদের গুরুত্বসহকারে সম্প্রচার করতে হয়। যোগ্য লোক না থাকায় সরকার প্রেষণে বিটিভিতে লোক নিয়োগ দিচ্ছে। যাঁদের যোগ্য মনে হয়েছে, তাঁদেরই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা অনুষ্ঠানের মান বাড়াতে চেষ্টা করছেন। আমার বিরুদ্ধে সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগও ঠিক নয়। ’ সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সুরথ কুমার সরকারকে দেড় মাসের প্রশিক্ষণে পাঠানো হয়েছে।

বিটিভির ইতিহাসে ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন ৩৫ জন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ১৯৯০ সালের পর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বিভিন্ন ক্যাডার থেকে আসা কর্মকর্তারা। তাঁদের অনেকেই স্বল্প সময়ের জন্য বিটিভি পরিচালনা করেছেন। বিটিভি বোঝার আগেই তাঁদের অনেকে বদলি হয়ে গেছেন। বিটিভির প্রধান সমস্যা নিয়োগনীতি। ফলে বিভিন্ন পদে বিশেষ করে অনুষ্ঠান, প্রশাসন, হিসাব, বিজ্ঞাপন, লাইসেন্সসহ সব কটি শাখায় এখন আর বিটিভির নিজস্ব লোক আগের মতো নেই। বিভিন্ন ক্যাডার থেকে প্রেষণে আসা কর্মকর্তারা বিটিভি চালাচ্ছেন।  

বিটিভির মহাপরিচালক এস এম হারুণ-অর-রশীদ বলেন, ‘সরকার যেভাবে নিয়োগনীতি তৈরি করেছে তা আমাদের মানতে হবে। এখন বিটিভিতে প্রযোজক ও প্রকৌশলীর অভাব সবচেয়ে বেশি। প্রথম ও মধ্য স্তরের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর বড় অংশই শূন্য। ছয় ঘণ্টা সম্প্রচারের বিষয়টি মাথায় রেখে চালু হয়েছিল, এখন ২৪ ঘণ্টা সম্প্রচারে থাকতে হচ্ছে। বিটিভির অনুষ্ঠান সম্প্রচার করা হচ্ছে ১৮ ঘণ্টা, তার সঙ্গে আছে বিটিভি ওয়ার্ল্ড। সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশনকেও সহযোগিতা করতে হচ্ছে। প্রযোজকরা প্রতিদিন গড়ে ১৭টি অনুষ্ঠান তৈরি করেন। বিশ্বের কোনো চ্যানেল এক দিনে এত কমসংখ্যক প্রযোজক দিয়ে এত অনুষ্ঠান করছে না। চারটি স্টুডিও, ইএফপি ইউনিট চারটি, এডিটিং প্যানেল ৯টি, কিন্তু এডিটর আছেন পাঁচজন। বিটিভিতে গ্রাফিকস ডিজাইনার আছেন মাত্র একজন। পার্বত্য অঞ্চলে কেবল অপারেটর নেই। জনবলের প্রস্তাব তৈরি করে এ বিষয়ে সুপারিশের জন্য তথ্য মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। ’


মন্তব্য