kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


শততম জয়ে সিরিজও জয়

নোমান মোহাম্মদ   

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



শততম জয়ে সিরিজও জয়

তামিম ইকবালের সেঞ্চুরি আর সাব্বির রহমানের হাফসেঞ্চুরি। এই দুজনের ১৪০ রানের জুটিতে বড় স্কোর গড়ে বাংলাদেশ। ছবি : মীর ফরিদ

মুহূর্তে যেন থমকে দাঁড়ায় মহাকাল। ফ্লাডলাইটের রুপালি আলোয় মহানন্দে উড়ে বেড়ানো ঘাসফড়িংও বুঝি বা ডানা গুটিয়ে বসে যায় চুপটি করে।

মুহুর্মুহু স্লোগানে আকাশ বিদীর্ণ করা গ্যালারিতে হঠাৎ পিনপতন স্তব্ধতা। অজানা আতঙ্কে। কিংবা জানা আশঙ্কায়। আবার কি তবে নির্মম নিয়তির নিষ্ঠুরতার শিকার মাশরাফি বিন মর্তুজা!

বোলিং করার সময় পা পিছলে পড়ে যাওয়া বাংলাদেশ অধিনায়কের পরিচর্যায় ছুটে আসেন ফিজিও। পড়িমরি দৌড়ে সতীর্থরা ঘিরে ধরেন তাঁকে। অদৃশ্য এক ছায়া হয়ে ১৬ কোটি ক্রিকেটপ্রাণের প্রার্থনা ওই ছোট্ট জটলার মাথায়। সেটিই যেন তখন এক টুকরো বাংলাদেশ। মাশরাফি উঠে দাঁড়ান। গ্যালারিতে ওঠে গর্জন। কয়েক পা হেঁটে বসে পড়েন আবার। অস্ফুট গোঙানিতে আবার বেজে ওঠে স্তব্ধতার গান। আশা-নিরাশায় দুলতে থাকেন বাংলার গণমানুষের জনমানসের নায়ক মাশরাফি।

তবে এবার তিনি হারেন না। ইতিহাসের আর্তনাদকে পাশ কাটিয়ে জয় হয় প্রার্থনার। বুকে চেপে রাখা নিঃশ্বাস ছাড়তে পারে গোটা বাংলাদেশ। চারপাশের হাসিমুখগুলো দেখে আবার যেন ডানা মেলার সাহস পায় ছোট্ট ঘাসফড়িং।

বাংলাদেশ-আফগানিস্তান সিরিজ নির্ধারণী দ্বৈরথ ছিল কাল। আগের দুই ম্যাচে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করা আফগানরা ১-১ সমতায়। প্রতিশ্রুতি ছিল তাই জমজমাট তৃতীয় ম্যাচের। কিসের কী! সিরিজে এই প্রথমবারের মতো যে খোলস ছেড়ে বেরোয় বাংলাদেশ! ব্যাট-বলের দাপটে চূর্ণ করে দেয় প্রতিপক্ষকে। জেতে ১৪১ রানের বিশাল ব্যবধানে। আর ফলের এমন গন্তব্য নিয়ে সামান্যতম শঙ্কা জাগেনি কখনো। ইনিংসের তৃতীয় ওভারে মাশরাফির পড়ে যাওয়াই ছিল বাংলাদেশের একমাত্র আতঙ্কের জায়গা।

নাহ্, একমাত্র নয়। ব্যাট-বলের ঠোকাঠুকির বাইরের আরেক ঘটনায়ও সতর্কঘণ্টার ধ্বনি। বাংলাদেশের বোলিং ইনিংসের ২৯তম ওভার। ১০২ রানে সাত উইকেট হারানো আফগানদের হার সময়ের ব্যাপার। তখনই ভিআইপি গ্যালারি থেকে ভোঁ দৌড়ে মাঠে ঢুকে পড়েন এক দর্শক। শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে এক দশকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট আয়োজনের ইতিহাসে এমনটা আর হয়নি কখনো। দর্শক দৌড়ে চলে আসেন মাশরাফির কাছে। শুরুতে স্বাভাবিক কারণেই চমকে ওঠেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। যখন বুঝতে পারেন, এ নিতান্তই এক ভক্তের পাগলামি—বুক দিয়ে আগলে তাঁকে রক্ষার চেষ্টা নিরাপত্তাকর্মীদের কাছ থেকে। ‘ওয়াকিটকি বাহিনী’ তখন যে রীতিমতো মারমুখী! যদিও বাংলাদেশ ক্রিকেটকে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া ঘটনাটি ঠেকাতে পারেনি তারা। আর নিরাপত্তা নিয়ে অনেক নাটক শেষে ইংল্যান্ড ক্রিকেট দল বাংলাদেশে আসার এক দিন পরই কেন এমন ঘটনা ঘটল—তা জোরালো তদন্তের দাবি রাখে।

মাশরাফির ইনজুরির ভয়, মাশরাফির দিকে ছুটে আসা ভক্তের সৌজন্যে নিরাপত্তাজনিত ভয়—স্বাগতিকদের জন্য এই দুটোই কালকের ম্যাচের আতঙ্ক। ব্যাট-বলের লড়াই একেবারেই না। প্রথম দুই ম্যাচে রোমাঞ্চ কাল অনুপস্থিত পুরোপুরি। বাংলাদেশ যে খেলে বাংলাদেশের মতো! দাপটের সঙ্গে। আধিপত্য বিস্তার করে। ১৪১ রানের বিশাল ব্যবধানের জয় সেই বার্তাই তো দেয়। টানা ষষ্ঠ ওয়ানডে সিরিজ জয়ের সঙ্গে তাই এই ফরম্যাটে শততম জয় হয়ে যায় বাংলাদেশের ক্রিকেট-বীরদের।

বাংলাদেশের সেই জয়ের ভিত্তি ব্যাটসম্যানদের গড়ে দেওয়া। বলা ভালো, তামিম ইকবাল-সাব্বির রহমান জুটির। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে নিজের সপ্তম সেঞ্চুরি তুলে নেন তামিম। সাকিব আল হাসানকে ছাড়িয়ে শতরান সংখ্যা চূড়া দখল করেন এককভাবে। আর কাল প্রথমবারের মতো ওয়ানডের তিন নম্বরে নেমেই ৫০ পেরোনো ইনিংস সাব্বিরের। দুজনের ১৪০ রানের জুটিতে বড় স্কোরের পথ খুঁজে পায় বাংলাদেশ। তাতে ভাগ্যের সহায়তা রয়েছে সত্যি। কেননা পুল করতে যাওয়া তামিমের ভুল টাইমিংয়ের শটে সহজ ক্যাচ যখন ফেলে দেন আসগর স্ট্যানিকজাই, তিনি তখন মাত্র ১ রানে। এর কী চড়া মূল্যই না চুকাতে হয় আফগানদের! আউট হওয়ার আগে ১১৮ বলে ১১৮ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলে যান তামিম।

কিন্তু তাঁর ওপেনিং সঙ্গী সৌম্য সরকারের দুঃসময়ের গেরো কাটে না কালও। উইকেটরক্ষকের হাতে ক্যাচ দিয়ে আউট হন ১১ রানে। তামিম-সাব্বিরের হাল ধরা এরপর। তাতে ৩০ ওভারে এক উইকেটে ১৫৭ রানের শক্তিশালী অবস্থানে চলে যায় বাংলাদেশ। ৩০০ তখন খুবই সম্ভব। চাই-কী আরো বেশি! কিন্তু সে জন্য অন্য ব্যাটসম্যানদেরও তো দায়িত্ব পালন করতে হবে!

কেউ তা পারেন না। সাব্বিরের (৬৫) আউটে ভাঙে জুটি। সেঞ্চুরি পূরণের পরের ওভারে রহমত শাহকে টানা তিন বলে চার, ছক্কা, ছক্কা মেরে আরো বিস্ফোরক হওয়ার ইঙ্গিত তামিমের ব্যাটে। কিন্তু খানিক পর মোহাম্মদ নবিকে মারতে গিয়ে লং অফে ক্যাচ দিয়ে আউট হয়ে যান। তার পরও সাত উইকেট অক্ষত রেখে শেষ ১০ ওভারে ঢোকা বাংলাদেশ ওই সময়ে কেন মোটে ৬৪ রান যোগ করবে! সাকিব আল হাসান ৩৫ বলে ১৭ করে বাজেভাবে আউট। মুশফিকুর রহিমও পারেন না ১২-এর বেশি করতে। শেষ দিকে এক মাহমুদ উল্লাহই কেবল ২২ বলে অপরাজিত ৩২ রান করে বাংলাদেশের স্কোর নিয়ে যান ২৭৯-তে।

প্রথম ওয়ানডেতে স্বাগতিকদের ২৬৫ রান প্রায় টপকে ফেলার জায়গায় চলে যায় আফগানিস্তান। কালকের স্কোরেও শুরুতে তাই ছিল না স্বস্তি। ইনিংসের তৃতীয় ওভারের প্রথম বলে মাশরাফি দারুণভাবে মোহাম্মদ শাহজাদকে বোল্ড করে আশ্বস্ত করেন যেন সবাইকে। কিন্তু পরের বল করতে গিয়েই তো ওই ইনজুরি-আশঙ্কার অস্বস্তি। তা সামলে পরে ছোট রানআপেও দারুণ বোলিং করেন অধিনায়ক। ৬-২-১৫-১ বোলিং বিশ্লেষণ সেই সাক্ষ্য দেয়। আট বছর পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফেরা মোশাররফ হোসেন (৮-১-২৪-৩), তাসকিন আহমেদরাও (৭-০-৩১-২) দেন যোগ্য সংগত। ফলে ৩৩.৫ ওভারে মাত্র ১৩৮ রানে গুটিয়ে যায় আফগানিস্তান। ১৪১ রানের বিশাল জয়ে সিরিজের পাশাপাশি শততম ওয়ানডে জয়ও নিশ্চিত করে বাংলাদেশ।

সেই জয়ের পথে মাশরাফির ইনজুরি আতঙ্ক না হয় তাড়ানো গেছে! কিন্তু দর্শক মাঠে ঢুকে পড়ায় নিরাপত্তার যে কলঙ্ক-দাগ পড়ল, তা মুছতে সময় লাগবে অনেক দিন।


মন্তব্য