kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভারত-পাকিস্তানকে সংলাপের তাগিদ আন্তর্জাতিক মহলের

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ভারত-পাকিস্তানকে সংলাপের তাগিদ আন্তর্জাতিক মহলের

কাশ্মীরে পাকিস্তান অংশে ঢুকে ভারত ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকস’ বা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে অভিযান চালানোর দাবির পর যে ‘যুদ্ধের দামামা’ বাজতে শুরু করেছে, তা নিরসনে প্রতিবেশী দুই দেশকে দ্রুত আলোচনায় বসতে তাগিদ দিচ্ছে আন্তর্জাতিক মহল। এরই মধ্যে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীন দুই পক্ষকেই যুদ্ধে না জড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।

তারা আশা করছে, দুই দেশ দ্রুত সংলাপে বসে পরিস্থিতি শান্ত করবে এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করবে।  

বুধবার রাতে জঙ্গি আস্তানায় সেই অভিযানের সময় পাল্টা গুলিতে আট ভারতীয় সেনা নিহত হওয়ার যে দাবি পাকিস্তান করছে তা ‘ভুয়া’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে নয়াদিল্লি। তারা বলছে, ওই অভিযানে ভারতের কোনো সেনা মারা যায়নি বরং ৩০-৪০ জন জঙ্গি ও তাদের মদদদাতা (পাকিস্তানি সেনা) নিহত হয়েছে। অবশ্য নিজেদের এক সেনা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে আটকা পড়ার কথা স্বীকার করেছে ভারত।  

ভারতের হামলা রুখতে গিয়ে নিজেদের দুই সেনা নিহত হওয়ার কথা স্বীকার করলেও পাকিস্তান তাদের ভূখণ্ডে ভারতীয় সেনাবাহিনীর হানার কথা অস্বীকার করেছে। তবে এই হামলার উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে বলে গতকাল হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান রাহেল শরিফ। বসে নেই ভারতীয় সেনাবাহিনীও। তারা বলছে, যেকোনো হামলা মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি তাদের রয়েছে। সীমান্তে জারি করা হয়েছে সতর্কতা।

সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় এরই মধ্যে পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী দুই দেশের সীমান্ত এলাকার বহু গ্রামের মানুষ বাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছে। কাশ্মীর সীমান্তের অনেক বাসিন্দা নিরাপত্তার জন্য বাংকার খুঁড়ছে। দুই দেশই সীমান্তে অতিরিক্ত সেনা ও অস্ত্রশস্ত্র মোতায়েন করেছে।    

কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, হুমকি-পাল্টা হুমকি যা-ই দেখা যাক, ভেতরে ভেতরে ভারত ও পাকিস্তান সরকার নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছে। যুদ্ধে নয়, শান্তিপূর্ণ উপায়েই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ। আন্তর্জাতিক মহল থেকেও আলোচনায় বসতে দুই দেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘ বলেছে, তারা সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। সমস্যার সমাধানে ভারত ও পাকিস্তানকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্ব সংস্থাটি।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে, সমস্যার সমাধানে ভারত ও পাকিস্তানকে আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাতে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জন কিরবি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছি। আমরা জানি, ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রাখছে। দুই পক্ষের কাছে আমাদের বার্তা একই, যৌথভাবে সন্ত্রাস মোকাবিলা করার জন্য পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে এবং পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। আলোচনা চালিয়ে যেতে দুই পক্ষকেই আমরা উদ্বুদ্ধ করছি। ’

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, ‘আমরা দুই দেশকেই সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছি। দুই দেশের সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনাও চালিয়ে যাচ্ছি। ’

চীন বলছে, যুদ্ধে নয়, ভারত-পাকিস্তান আলোচনায় বসে কাশ্মীর সমস্যা সমাধান করুক এটা তারা চায়। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গাও শুয়াং বলেন, ‘আমরা দুই দেশের সঙ্গেই আলাদাভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা চাই তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ আরো বাড়িয়ে দ্রুত সমস্যার সমাধান করুক। কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থানকে আমরা সম্মান জানালেও উপমহাদেশের নিরাপত্তা ও শান্তির প্রশ্নে আশা করি, ভারত-পাকিস্তান আবার হাত মেলাবে। ’

এদিকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ বলেছেন, নিয়ন্ত্রণ রেখায় যেকোনো সহিংসতা ও আগ্রাসন থেকে জনগণ ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে তার সরকার সব ধরনের ব্যবস্থা নেবে। গতকাল কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। নওয়াজ বলেন, ‘যেকোনো আগ্রাসন থেকে আমরা আমাদের মাতৃভূমিকে সুরক্ষা করব। গোটা জাতি আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আছে। ভারতীয় নৃশংসতা দিয়ে কাশ্মীরি জনগণের আকাঙ্ক্ষাকে দমানো যাবে না। ’

জম্মু-কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ রেখায় ভারতের সঙ্গে যে উত্তেজনা চলছে তা নিয়ে ওই বৈঠকে আলোচনা করা হয়। বৈঠকে নওয়াজ অভিযোগ করেন, ভারতীয় আগ্রাসন আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি তৈরি করেছে। ভারতের আগ্রাসন প্রতিহত করতে পাকিস্তান সরকার ও জনগণ ঐক্যবদ্ধ রয়েছে বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান রাহেল শরিফ গতকাল লাহোরে বলেছেন, ভারতকে উপযুক্ত জবাব দিতে তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন। তাঁর দেশ কোনো ধরনের প্রপাগান্ডায় কান দেয় না বলেও জানিয়েছেন তিনি।

এদিকে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে আটকা পড়া নিজেদের এক সেনাকে ফেরত আনতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। গতকাল দুপুরে জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থার অজিত দোভাল ও আইটিবিপি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এ কথা জানান। সেনা সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, ৩৭ রাষ্ট্রীয় রাইফেলে কর্মরত চান্দু বাবুলাল চৌহান নামের ওই সেনা বৃহস্পতিবার দুপুরে অসতর্কভাবে নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে পাকিস্তান অংশে ঢুকে পড়েছিলেন। কিন্তু নিজেদের সেনা সূত্রের বরাত দিয়ে পাকিস্তানের গণমাধ্যম জানায়, ভারতীয় ওই সেনা অস্ত্রসহ পাকিস্তানের ভেতর ঢোকার পর তাঁকে আটক করে তারা।

বুধবার মধ্যরাতে কাশ্মীরে নিয়ন্ত্রণ রেখা (লাইন অব কন্ট্রোল) পেরিয়ে পাকিস্তানের ভেতর আটটি জঙ্গি আস্তানায় হামলা চালায় ভারতীয় সেনারা। পরদিন বৃহস্পতিবার সকালে ভারতীয় সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশনসের মহাপরিচালক (ডিজিএমও) লে. জেনারেল রণবীর সিং সংবাদ সম্মেলন করে জানান, অভিযানে জঙ্গি ও তাদের মদদদাতাদের বিপুল ক্ষতি করেছেন তাঁরা। একটি সেনা সূত্র জানায়, অভিযানের সময় প্রতিরোধ করতে এলে পাকিস্তানের ৯ সেনা ও ৩০-৪০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে।

এর আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বর কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১৮ সেনা নিহত হয়। এ ঘটনার জন্য শুরু থেকেই পাকিস্তানকে দায়ী করছে ভারত। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি জাতিসংঘের অধিবেশনেও পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে উত্তেজনা ছড়ায়। উরি হামলার প্রতিশোধ নিতেই ভারত পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে হামলা চালিয়েছে বলে ভারতীয় কোনো কোনো কূটনীতিক বলছেন। আর এই হামলার জন্য প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারকে ভারতের সব দলই সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে।

ভারত ও পাকিস্তান উভয়েই পুরো কাশ্মীর নিজেদের বলে দাবি করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে স্বাধীন হওয়ার পর দুটি দেশ এ পর্যন্ত তিনটি যুদ্ধে জড়ায়। এর মধ্যে দুটিই হয় কাশ্মীর নিয়ে। সূত্র : এনডিটিভি, ডন, এএফপি, রয়টার্স।


মন্তব্য