kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এবার যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে বিএনপি

এনাম আবেদীন   

১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এবার যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে বিএনপি

ভারতের আশা ছেড়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে বিএনপি। দলটির বেশির ভাগ নেতাকর্মীর আশা, আগামী নভেম্বরে ডেমোক্রেটিক দলীয় প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নতুন মোড় নিতে পারে।

অর্থাৎ সব দলের অংশগ্রহণে এ দেশে একটি নির্বাচনের ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সরকার চাপ বাড়াবে; যদিও প্রেসিডেন্ট পদে পরিবর্তন হলেই সংশ্লিষ্ট দেশটির বৈদেশিক নীতির পরিবর্তন হবে কি না তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। এর বড় প্রমাণ ভারত। দেশটিতে সরকার বদলালেও শেষ পর্যন্ত বিএনপির আশা ভঙ্গ হয়েছে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জনের পরও ভারতের নির্বাচনকে সামনে রেখে একরকম আশা জেগেছিল বিএনপিতে। ওই বছরের ৭ এপ্রিল থেকে ১২ মে পর্যন্ত প্রতিবেশী দেশটিতে লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আশাবাদী ছিল, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত কংগ্রেসকে হটিয়ে বিজেপি ক্ষমতায় এলে তাদের লাভ হবে। বিএনপিকে সমর্থন না করলেও অংশীদারিমূলক একটি নির্বাচনের প্রশ্নে দিল্লি অন্তত নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকবে বলে মনে করতেন বিএনপি নেতারা। এ জন্য বিজেপি নেতাদের সঙ্গে দলটি যোগাযোগও বাড়ায় ওই সময়। এরপর ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলেও বিএনপির তাতে কোনো লাভ হয়নি। বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষমতায় রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তির পরিবর্তন হলেও দেশটির বৈদেশিক সম্পর্ক নীতিতে কোনো পরিবর্তন আসেনি। পূর্ববর্তী কংগ্রেসের মতো মোদি সরকারও বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক

বজায় রেখে চলেছে। ক্ষেত্রবিশেষে বিজেপি সরকার সহযোগিতার হাত আরো সম্প্রসারিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও, বিশেষ করে বাংলাদেশ প্রশ্নে খুব বড় পরিবর্তন আসবে—এমনটা মনে করছেন না অনেকেই।

বিএনপিও সাম্প্রতিককালে বিষয়টি বুঝতে পেরেছে বলে জানা যায়। ফলে গত দুই বছর মোটামুটি ভারতমুখী নীতি অনুসরণ করলেও ইদানীং এ ক্ষেত্রে কিছুটা পরিবর্তন আনার কথা ভাবছে দলটি। নেতাদের বক্তৃতা-বিবৃতিতেও সাম্প্রতিককালে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্কবিষয়ক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, হিলারি ক্লিনটনের সঙ্গে কতগুলো বিষয়ে, বিশেষ করে অধ্যাপক ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের মতপার্থক্য থাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে। বিশেষ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তাঁর বাংলাদেশ সফরের সময় এগুলো বেশ আলোচিত হয়। এ ছাড়া ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের ভিন্নমত ছিল। ফলে হিলারি ক্ষমতায় এলে ওই চাপ বাড়বে বলে বিএনপি মনে করতে পারে। কিন্তু একজন ব্যক্তির পরিবর্তন হলেই যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতিও যে বদলে যাবে তা কিন্তু বলা যায় না।

তা ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য চাপ বাড়ালেও যুক্তরাষ্ট্র এটিও বলে আসছে যে বিষয়টি এ দেশের জনগণের নিজস্ব ব্যাপার। ফলে হিলারি প্রেসিডেন্ট হলে বিএনপির লাভ হবে—এটা জোর দিয়ে বলা যাবে না। যোগ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের এই অধ্যাপক।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, বিএনপি একেক সময় একেক আশা নিয়ে বসে থাকে। কিন্তু নিজের সাংগঠনিক শক্তি নিয়ে দাঁড়াতে না পারলে তারা কিছুই অর্জন করতে পারবে না। তা ছাড়া ক্ষমতাধর অন্য কোনো দেশ বিএনপিকে কেন ক্ষমতায় আনবে, তাদের কি ঠেকা পড়েছে—এমন প্রশ্ন তুলে সুধীসমাজের এই প্রতিনিধি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এ দেশে গণতন্ত্র চায়; কিন্তু বিএনপির জন্য তারা তো এখানে যুদ্ধ ঘোষণা করবে না! তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ভারত যে-ই হোক, তারা তাদের জাতীয় স্বার্থকে সব কিছুর ঊর্ধ্বে স্থান দেয়। এ ক্ষেত্রে বিএনপি তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে সব কিছু ভারতের কাছে ছেড়ে দিয়েছে। কারণ চীনকে ম্যানেজ করতে হলে ভারতকে তার পাশে দরকার।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন সব সময় গণতন্ত্রের পক্ষে এবং তারা এ দেশে একটি অংশীদারিমূলক নির্বাচনের কথা বলেও আসছে। কিন্তু আমরা নিজেরা আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায় করতে না পারলে কারো সমর্থনে কোনো লাভ হবে না। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এর আগে ভারতের নির্বাচনের সময় একই ধরনের আশাবাদ থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা কাজে লাগেনি।

স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘আশাবাদের কথা বাদই দিলাম। বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক একটি দেশ বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রাখলে বিএনপি খুশি হবে। কিন্তু অন্য একটি দেশ বিএনপিকে ক্ষমতায় বসাবে, এটি ভাবা ঠিক নয়। ’

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ কাদের মনে করেন, হতাশ অবস্থা থেকে উদ্ধার বা সমাধানের জন্য বিএনপি হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে আছে। আবার হিলারি ক্ষমতায় এলে এ দেশে তার কিছু প্রভাব পড়লেও পড়তে পারে; কিন্তু এতে আমূল  কোনো পরিবর্তন হবে না।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে এ দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মহাজোট সরকারের সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, আসলে দুই পক্ষের মধ্যে অনিশ্চয়তা থেকে এ ধরনের আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়েছে; কিন্তু তাদের জনসমর্থন রয়েছে। অন্যদিকে সাংগঠনিক কাঠামো অত্যন্ত শক্তিশালী এবং দেশে প্রশাসনযন্ত্র পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে থাকলেও আওয়ামী লীগের জনসমর্থন নেই। দুই পক্ষের এই দুর্বলতার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের প্রভাব নিয়ে এ দেশে আগাম আলোচনা হচ্ছে।

২০১২ সালের ৫ মে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সময় তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাড়াও সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সফর শেষে আয়োজিত যৌথ সংবাদ সম্মেলনে গণতন্ত্র থেকে বিচ্যুতি এড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসার আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া তিনি গ্রামীণ ব্যাংক ইস্যুতে ড. ইউনূসের পক্ষে কথা বলেন। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে হিলারির বক্তব্য অপ্রয়োজনীয় বলে সরকার এর প্রতিবাদ জানায়।


মন্তব্য