kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভার্জিনিয়ায় প্রধানমন্ত্রী

জঙ্গিবাদে মদদদাতাদের বিচার হবে

আজ ফিরছেন, বিপুল সংবর্ধনা দেবে আ. লীগ

নিউ ইয়র্ক প্রতিনিধি ও নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জঙ্গিবাদে মদদদাতাদের বিচার হবে

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, অর্থ ও নির্দেশ দিয়ে যারা জঙ্গিবাদে মদদ জোগাচ্ছে, যুদ্ধাপরাধীদের রক্ষায় মাঠে নেমেছে, পেট্রলবোমায় জনগণকে পুড়িয়ে মেরেছে, তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। বিএনপি-জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো রাজনৈতিক নয়, জনগণকে পুড়িয়ে মারার মামলা।

যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ায় স্থানীয় সময় গত বুধবার রিজ কার্লটন হোটেলে আওয়ামী লীগের ওয়াশিংটন শাখার নেতাকর্মীদের এক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রায় ৫০ মিনিটের বক্তব্যে জিয়াউর রহমানকে বঙ্গবন্ধুর খুনি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, হত্যা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসেছিলেন। আর যত দিন ক্ষমতায় ছিলেন তত দিন ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই ছিলেন। তবে এখন দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। অপরাধীদের বিচার হচ্ছে। জাতির জনকের হত্যার বিচার হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। জাতীয় চার নেতা হত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার আইনি প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে জানিয়ে তিনি বলেন, স্বাধীন বাংলায় দেশবিরোধীদের ঠাঁই হবে না।

দেশের রাজনীতি নিয়ে বিদেশিদের কাছে ঢালাও অভিযোগ করার জন্য বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের শক্তির ওপর তাঁর কোনো আস্থা নেই।

নিজের জন্মদিন জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন না করা প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, অন্যের কল্যাণে স্বার্থত্যাগের বিষয়টি বাল্যকালেই তিনি তাঁর মরহুম মা-বাবার কাছ থেকে শিখেছেন। বাংলাদেশের জনগণ ওই সময় যখন খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য সংগ্রাম চালাচ্ছিল তখন তাঁর পরিবারের সদস্যরা কখনোই জাঁকজমকপূর্ণভাবে জন্মদিন পালন করেনি। তিনি বলেন, জিয়ার পুত্র (তারেক) অর্থপাচারকারী, যা এফবিআইয়ের তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, পঁচাত্তরপরবর্তী জিয়া, এরশাদ, খালেদা আমলে সরকার ছিল সবচেয়ে দুর্বল এবং এই শাসকরা ভারতের সঙ্গে স্থল সীমান্ত চুক্তি বাস্তবায়ন অথবা ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা ইস্যু উত্থাপনে সাহস পাননি। তাঁদের নীতি ছিল দেশকে ভিক্ষুকে পরিণত করা এবং অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া।

স্লোগান ও করতালির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ ৬৮ বছর পর তাঁর সরকার ভারতের সঙ্গে ছিটমহল বিনিময় এবং ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক আদালতে শান্তিপূর্ণভাবে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের মাধ্যমে এ সমস্যার সমাধান করেছে।

প্রধানমন্ত্রী পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগের ক্ষেত্রে তাঁর চ্যালেঞ্জের কথা তুলে ধরেন। বিশ্বব্যাংক এ ব্যাপারে দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণ হাজির করতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর সরকার নিজস্ব অর্থায়নে এ সেতু নির্মাণ করছে। তিনি বলেন, ‘আমি জনগণের জন্যই সব কিছু করেছি। যখনই সমস্যার মুখোমুখি হয়েছি, আমি জনগণের সমর্থন পেয়েছি। ’

যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সভাপতি ড. সিদ্দিকুর রহমানের সভাপতিত্বে ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সামাদ আজাদের সঞ্চালনায় এতে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন বাস্তবায়নে সরকার যুগান্তকারী অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা পৌঁছে দিতে চার হাজার ৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। তৈরি করা হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বিশাল ন্যাশনাল ওয়েব পোর্টাল। কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত স্থাপিত পোর্টালের সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। বিদ্যুতে সাফল্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় গ্রিডে অতিরিক্ত ছয় হাজার ৩২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সরবরাহ বেড়েছে। ফলে বিদ্যুতের সুবিধাভোগীর সংখ্যা ৪৭ থেকে বেড়ে ৬২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

শেখ হাসিনা শিক্ষা খাতে সাফল্যের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দিতে সরকার শতভাগ ছাত্রছাত্রীর মধ্যে বিনা মূল্যে বই বিতরণ কার্যক্রম হাতে নিয়েছে। নারীশিক্ষা এগিয়ে নিতে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু করা হয়েছে উপবৃত্তি। গরিব ও মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে প্রণয়ন করা হয়েছে শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট আইন। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের নারী ও শিশুর উন্নয়নে ভূমিকা রাখার জন্য জাতিসংঘের সাউথসাউথ, চ্যাম্পিয়ন অব দি আর্থ, ডেভেলপমেন্ট অ্যাওয়ার্ড ফর আইসিটি, প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন ও এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ডে আমাকে ভূষিত করা হয়েছে। ’

প্রধানমন্ত্রী সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে নিউ ইয়র্কে আসার আগে তাঁকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার কথা জানান। তিনি আরো বলেন, ‘দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছি। তাই পরিবারে তেমন সময় দেওয়া হয় না। ওয়াশিংটনে বসেও প্রতিদিন ছয় ঘণ্টা করে অফিস করেছি। বাংলাদেশকে জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার সংকল্পে ঝাঁপিয়ে পড়েছি। আমার আর কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই। ’

নেতাকর্মীদের উল্লাস ধ্বনির মধ্যে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কঠিন সময়ে দলের নেতাকর্মীরা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, বড় নেতারা ভুল করেছে, তবে তৃণমূলের কর্মীরা তা করেনি। ’ তিনি দলের দুর্দিনে ভূমিকা রাখার জন্য প্রবাসীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও দেশের ভাবমূর্তি উন্নয়নে তাদের কাজ করে যাওয়ার আহ্বান জানান। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী বাংলাদেশিদের হত্যার নিন্দাও জানান শেখ হাসিনা।

এর আগে দুপুরে ম্যারিল্যান্ড, ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি ও নিউ ইয়র্কের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা শান্তি সমাবেশ ও শোভাযাত্রা করে। এ সময় জন্মদিন উপলক্ষে শেখ হাসিনার জীবনসংগ্রাম নিয়ে রচিত বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী আজ দেশে ফিরছেন, বিপুল সংবর্ধনা  দেবে আওয়ামী লীগ জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭১তম অধিবেশনে যোগদান শেষে শেখ হাসিনা আজ শুক্রবার বিকেলে দেশে ফিরবেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের এবারের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী দুটি সম্মাননা ও পদক লাভ করায় তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেবে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল। বিকেল ৫টা ২০ মিনিটে ঢাকায় অবতরণের পর বিমানবন্দর থেকে গণভবন পর্যন্ত রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে তাঁকে সংবর্ধনা দেবে ১৪ দলের নেতাকর্মীরা।

গতকাল আওয়ামী লীগের উপদপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী ১৫ দিনব্যাপী যুক্তরাজ্য, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে আজ দেশে ফিরে আসবেন। সফরকালে তিনি বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে বৈঠক করেন। জাতিসংঘের ৭১তম অধিবেশনে ভাষণ দেন। তিনি দক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনায় বহুমাত্রিক অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ পদক ‘প্ল্যানেট ৫০-৫০ চ্যাম্পিয়ন’ ও ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ অ্যাওয়ার্ডে’ ভূষিত হন। এই বিরল সম্মান লাভের জন্য বাঙালি জাতি গর্বিত। জাতির পক্ষ থেকে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল, সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে খিলক্ষেত, কুড়িল ফ্লাইওভার, হোটেল র‌্যাডিসন, কাকলীর মোড়, বনানী, জাহাঙ্গীর গেট, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বিজয় সরণি, সামরিক জাদুঘর, জাতীয় সংসদ ভবন মোড় ও গণভবন পর্যন্ত রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানাবে।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক  ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগের প্রতিটি থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন, সহযোগী, ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর নেতাকর্মী ও সর্বস্তরের জনগণকে যথাসময়ে এই অভ্যর্থনা কর্মসূচিতে উপস্থিত থাকার জন্য বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ‘বাঙালি জাতি জননেত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে যা পেয়েছে, অন্য কেউ তা দিতে পারেনি। তিনি দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন। এ দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য তিনি যে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন বিনিময়ে আমরা তাঁকে কিছু দিতে পারব না। শুধু একটু ফুল দিয়ে তাঁকে অভিনন্দন জানাব। ’ তিনি গতকাল বিকেলে রাজধানীর কাফরুলে ৪ নম্বর ওয়ার্ড কমিউনিটি সেন্টারে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে এর আয়োজন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর ওয়াশিংটন ত্যাগ : প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীদের বহনকারী এমিরেটস এয়ারলাইনসের ফ্লাইট ইকে ২৩২ ওয়াশিংটনের স্থানীয় সময় গতকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে ডুলেস ইন্টারন্যাশনাল বিমানবন্দর ত্যাগ করে। প্রধানমন্ত্রী দুবাই হয়ে আজ বিকেলে ঢাকা পৌঁছবেন।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম জিয়াউদ্দিন, জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি মাসুদ বিন মোমেন ও বাংলাদেশ দূতাবাসের পদস্থ কর্মকর্তারা বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানান। প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশিও বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিল।


মন্তব্য