kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পাকিস্তানে ঢুকে ভারতের অভিযান, গোলাগুলি

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পাকিস্তানে ঢুকে ভারতের অভিযান, গোলাগুলি

কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলার জের ধরে ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা ক্রমেই চরম আকার ধারণ করছে। হুমকি-পাল্টা হুমকির মধ্যেই গত বুধবার গভীর রাতে নিয়ন্ত্রণ রেখা (এলওসি) অতিক্রম করে কাশ্মীরের পাকিস্তান অংশের দুই কিলোমিটার ভেতরে সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকস’ নামের অভিযান চালানোর কথা জানিয়েছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

তাদের দাবি, সফল এ অভিযানে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক সন্ত্রাসী ও তাদের মদদদাতা হতাহত হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযানে অন্তত ৩০-৪০ সন্ত্রাসী ও তাদের মদদদাতা নিহত হয়েছে।

তবে পাকিস্তান বলছে, ভারতের দাবি অতিরঞ্জিত। প্রতিরোধের মুখে পাকিস্তান সীমানায় ঢুকতে পারেনি ভারতীয় বাহিনী। সীমান্তে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলি হয়েছে। এতে দুই পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে। একই সঙ্গে পাকিস্তান দাবি করে, তাদের হামলায় আট ভারতীয় সেনা নিহত হয়েছে। তা ছাড়া সীমান্ত থেকে এক ভারতীয় সেনাকে তারা আটক করেছে। তবে ভারত দাবি করেছে, তাদের কোনো সেনা ওই অভিযানে নিহত হয়নি।

এদিকে এ ঘটনা নিয়ে দুই দেশের উত্তেজনা বাড়তে থাকায় ভারত-পাকিস্তানকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ ও চীন। জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক বলেন, অমীমাংসিত বিষয়গুলো শান্তিপূর্ণভাবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত ভারত ও পাকিস্তানের।

কাশ্মীর সীমান্তের এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ একে ভারতীয় বাহিনীর ‘বিনা উসকানিতে নগ্ন আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব খর্ব করার যেকোনো ধরনের অপচেষ্টা ব্যর্থ করার সক্ষমতা আমাদের সেনাবাহিনীর আছে। ’

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিষয়টি নিয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি ফোন করে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায়, উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারি, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, জম্মু ও কাশ্মীরের রাজ্যপাল এন এন ভোরা ও মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির সঙ্গেও কথা বলেছেন। আর বিকেলে সর্বদলীয় বৈঠক করেন মোদি। এ অভিযানকে সমর্থন জানিয়েছে সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস। দলগতভাবে সমর্থন জানায় ক্ষমতাসীন বিজেপিও।    

মন্ত্রিসভার নিরাপত্তাবিষয়ক কমিটির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী মোদির বৈঠকের পরপরই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সেনাবাহিনী। দিল্লিতে সকাল সাড়ে ১১টার দিকে অনুষ্ঠেয় এ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশনসের মহাপরিচালক (ডিজিএমও) লে. জেনারেল রণবীর সিং। এ সময় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ তাঁর পাশে ছিলেন।

আক্রমণ কোন কোন স্থানে হয়েছে, তার চরিত্র ঠিক কী ধরনের ছিল, তা বিস্তারিত জানাননি রণবীর সিং। তবে তিনি বলেন, সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি ও যারা তাদের ভারতে পাঠিয়ে হামলা চালাতে সাহায্য করছে, তারাই ছিল ভারতীয় বাহিনীর লক্ষ্য। ভারত বারবার পাকিস্তানকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার কথা বললেও তাতে কোনো কাজ হয়নি। তাই বাধ্য হয়েই ভারতকে এ অভিযান চালাতে হয়েছে।

রণবীর সিং বলেন, কাশ্মীরে পাকিস্তান অংশে সন্ত্রাসী-জঙ্গিদের গতিবিধির ওপর বেশ কিছুদিন ধরেই নজর রাখছিল ভারতীয় বাহিনী। বহু জঙ্গি-সন্ত্রাসী নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে ভারতে ঢোকার চেষ্টা করছিল। জম্মু-কাশ্মীর ও ভারতের অনেক শহরে বড় ধরনের নাশকতা চালানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ভারতীয় সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে বুধবার রাতে এ অভিযান চালায়। এতে সন্ত্রাসী ও তাদের মদদদাতাদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি করা গেছে। অভিযানে ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।  

ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে, অভিযানে পাকিস্তানের অন্তত ৩০-৪০ জন সন্ত্রাসী ও তাদের মদদদাতা নিহত হয়েছে। রাত ১টায় এ অভিযান শুরু হয়। পাকিস্তানি সেনারা প্রতিরোধের চেষ্টা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি শুরু হয়, যা চলে ভোর প্রায় ৫টা পর্যন্ত।  

ডিজিএমও রণবীর সিং বলেন, নিয়ন্ত্রণ রেখার দুই কিলোমিটারের বেশি স্থানজুড়ে আটটি সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে প্যারা-কমান্ডোর সদস্যরা এ অভিযান চালায়। তাদের অভিযানস্থলে নামানো হয় বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার দিয়ে। অভিযানের বিষয়ে পাকিস্তানকে যথাযথ প্রটোকল অনুসরণ করে অবহিত করা হয়েছে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এ ধরনের অভিযান আর চালানোর পরিকল্পনা নেই। কিন্তু অনুপ্রবেশ ও সন্ত্রাসী মোকাবিলার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

সামরিক পরিভাষায় ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইকস’ হচ্ছে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে হানা দেওয়া। প্রায় কোনো রকম ঘোষণা ছাড়াই অভ্যন্তরীণ শত্রু, সংস্থা, সংগঠন বা বহিরাগত শত্রুর আস্তানায় অতর্কিতে এ অভিযান চালানো হয়। যারা টার্গেট, তাদের বাইরে আর কারো যাতে কোনো ক্ষয়ক্ষতি না হয় সে বিষয়ও এ অভিযানে খেয়াল রাখা হয়।

ভারতের সার্জিক্যাল স্ট্রাইকসের দাবি নাকচ করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গতকাল এক বিবৃতিতে জানায়, পাকিস্তানের ভেতর সন্ত্রাসী ঘাঁটিতে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকসের যে খবর ছড়ানো হচ্ছে, তা বিভ্রান্তিকর। ‘মিথ্যা প্রভাব বিস্তারের জন্য’ ভারত ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করছে। বিরোধপূর্ণ অঞ্চলের লাইন অব কন্ট্রোলে কোনো ধরনের উসকানি ছাড়াই ভারতীয় সেনাবাহিনী মাঝেমধ্যেই নিজেদের এলাকায় থেকে যেভাবে পাকিস্তানের দিকে গুলি ছুড়ে থাকে, বুধবার মধ্যরাত থেকেও তা-ই করছিল। এর উপযুক্ত জবাব দিয়েছে পাকিস্তান সেনাবাহিনী। গোলাগুলিতে দুই পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়েছে বলেও বিবৃতিতে জানানো হয়।

ভারতীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, গতকাল দুপুরের পর থেকে পাঞ্জাবে পাকিস্তান সীমান্ত বরাবর প্রায় ১০ কিলোমিটার পর্যন্ত বহু গ্রামের মানুষকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এর পরই বাড়তি বিএসএফ সদস্য মোতায়েন করা হয় ওই সীমান্তে। খালি করে দেওয়া হয়েছে সীমান্ত লাগোয়া জম্মু-কাশ্মীরের বেশ কিছু গ্রাম। গুজরাট থেকে জম্মু পর্যন্ত হাই অ্যালার্ট জারি করেছে ভারতীয় সেনাবাহিনী।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর কাশ্মীরের উরিতে নিয়ন্ত্রণ রেখার কাছে ভারতীয় সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১৮ সেনা নিহত হওয়ার পর থেকে প্রতিবেশী দেশ দুটির মধ্যে উত্তেজনা চলছে। ভারতের দাবি, পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসীরা এ হামলা চালিয়েছে। ওই হামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রী মোদি হামলার যোগ্য জবাব দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেন, ‘আমি দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, এই হামলার পেছনে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই শাস্তি দেওয়া হবে। ’

ভারত ইতিমধ্যে আগামী নভেম্বরে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে। বাংলাদেশ, ভুটান ও আফগানিস্তানও সম্মেলনে না যাওয়ার ঘোষণা দেওয়ার পর বুধবার সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে সার্কের বর্তমান সভাপতি দেশ নেপাল। সার্ক নিয়ে তৈরি হওয়া সংকটে আঞ্চলিকভাবে পাকিস্তান অনেকটাই ‘একঘরে’ হয়ে পড়ার হুমকিতে রয়েছে। সূত্র : এনডিটিভি, এএফপি, বিবিসি, রয়টার্স, আনন্দবাজার, ডন।


মন্তব্য