kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বাংলাদেশের হারে মিশে রইল দীর্ঘশ্বাস

নোমান মোহাম্মদ   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশের হারে মিশে রইল দীর্ঘশ্বাস

ওয়ানডে অভিষেকে নিজের প্রথম বলেই উইকেট। এর আগে ব্যাটিংয়েও অপরাজিত ৪৫ রান। দিন শেষে হারের হতাশাই অবশ্য সঙ্গী হয়েছে মোসাদ্দেক হোসেনদের। ছবি : মীর ফরিদ

তাঁর ভুবন আলাদা। তাঁর জগৎ জলেশ্বরীর।

কিন্তু ওই সব্যসাচী লেখকের বিখ্যাত কয়েকটি পঙিক্ত কী দারুণভাবেই না প্রতিস্থাপন করা যায় এখনকার বাংলাদেশের ক্রিকেট ও ক্রিকেটারে—‘এ বড় দারুণ বাজি, তারে কই বড় বাজিকর/ যে তার রুমাল নাড়ে পরানের গহীন ভিতর। ’ কাদাজলের এই জনপদে এখন ক্রিকেটের চেয়ে বড় ‘বাজি’ আর কী! ক্রিকেটারদের চেয়ে বড় ‘বাজিকর’ কারা! কারাই বা পারেন তাঁদের মতো ‘পরানের গহীন ভিতরে রুমাল নাড়তে’!

সেই মহান লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মহাপ্রয়াণে কাল একটুখানি আবেগের স্পর্শ তো থাকতেই পারত বাংলাদেশের ক্রিকেটতীর্থে! হয়তো খানিক নীরবতায়। হয়তো ক্রিকেটারদের কালো বাহুবন্ধনী পরায়। কিন্তু বাংলাদেশ-আফগানিস্তান ম্যাচে ছিল না অমন কিছু। যদিও ক্রিকেটের ব্যাপ্তি এখন মাঠ ছাড়িয়ে বাংলার জনমানসে এত বিস্তৃত যে, ওইটুকুন প্রত্যাশায় বাড়াবাড়ি নেই কোনো!

যেমন বাড়াবাড়ি ছিল না আফগানিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের অনায়াস জয়ে। প্রথম ওয়ানডেতে হোঁচট খেতে খেতে বেঁচে যাওয়া না হয় অনভ্যাসে বিদ্যাহ্রাসের দোহাই। কিন্তু কাল দ্বিতীয় ম্যাচে? সেখানে আরো সড়গড় হবে ব্যাট-বলের ধার, পূর্বাভাস ছিল তেমন। প্রত্যাশা ছিল সিরিজ জয়ের সঙ্গে ওয়ানডেতে শততম জয়ের মাইলফলক ছোঁয়ার। হয় না কিছুই। আফগানদের কাছে উল্টো দুই উইকেটে হেরে যায় বাংলাদেশ।

প্রথম ম্যাচে যা ছিল আশঙ্কা, দ্বিতীয় ওয়ানডেতে তাই হয় বাস্তবতা! সে কারণেই রাতের স্তব্ধতা শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে। মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা গোটা বাংলাদেশে।

অথচ ক্রিকেট-যোদ্ধা হয়ে কী লড়াইটাই না কাল করেন সাকিব আল হাসান! পুঁজি মাত্র ২০৮ রানের। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা নতুন বল তুলে দেন ব্রহ্মাস্ত্রের হাতে। আস্থার প্রতিদান দিতে একদমই দেরি করেন না সাকিব। নিজের দ্বিতীয় এবং ইনিংসের চতুর্থ ওভারে জোড়া শিকারে। এরপর নতুন স্পেলে এসে ১৪তম ওভারে তুলে নেন আরেক উইকেট। এই তিন উইকেটের একটি আগের ম্যাচে ফিফটি করা রহমত শাহর। আরেকটি কাল চারটি চার ও দুই ছক্কায় ভয়ংকর হয়ে ওঠার ইঙ্গিত দেওয়া মোহাম্মদ শাহজাদের।

সাকিব যেন এভাবে ক্রিকেটের মঞ্চে হয়ে ওঠেন জীবনের যোদ্ধা। কোণঠাসা অবস্থায় ‘জাগো বাহে, কোনঠে সবাই...’ ডাকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করেন পুরো দলকে।

কিন্তু তাতে সতীর্থদের কাছ থেকে তো সাড়া পান না খুব একটা! কেবল ওয়ানডে অভিষেকে মোসাদ্দেক হোসেন লড়াই করেন দাঁতে দাঁত চেপে। শুরুতে দলের বিপর্যয়ের মধ্যে মাথা উঁচু করা অপরাজিত ৪৫ রানের ইনিংসে। পরে বোলিংয়েও। নিজের প্রথম বলে তুলে নেন হাসমত উল্লাহ শাহিদির উইকেট। পরের ওভারে সাকিব যখন আউট করেন শাহজাদকে, ৬৩ রানে চার উইকেট হারিয়ে ফেলে আফগানরা। ২০৮ রান নিয়ে স্বাগতিকদের জয় তখন মনে হচ্ছিল খুবই সম্ভব।

সম্ভব মনে হচ্ছিল ইনিংসের শেষাঙ্কেও। তা-ও মূলত ওই সাকিব-মোসাদ্দেকের সৌজন্যে। পঞ্চম উইকেটে আসগর স্টানিকজাই ও মোহাম্মদ নবি ১০৭ রান যোগ করে ম্যাচ থেকে প্রায় ছিটকে ফেলেন বাংলাদেশকে। শেষ ১১ ওভারে প্রয়োজন মোটে ৩৯ রান। নবিকে (৪৯) এলবিডাব্লিউয়ের ফাঁদে ফেলে জুটি ভাঙেন মাশরাফি। পরের ওভারে আরেক সেট ব্যাটসম্যান স্টানিকজাইকে (৫৭) ফেরান  মোসাদ্দেক। আবার মেঘ সরিয়ে উঁকি দেয় আশার আলো। তা আরো উজ্জ্বল সাকিব তাঁর শেষ ওভারে আরেক উইকেট নিলে। শেষ ৩০ বলে ২০ রান প্রয়োজন যে তখনো! প্রথম ওয়ানডের গতিপথ বিবেচনায় বাংলাদেশের শেষ তিন উইকেট তুলে নেওয়ার আশা বাড়াবাড়ি নয়।

কিন্তু সে জন্য তো সাকিব-মোসাদ্দেকের সঙ্গে অন্যদেরও হাতে হাত রাখা চাই। মুশফিকুর রহিম তা পারেন না। মোসাদ্দেকের বলে নাজিবুল্লাহ জাদরানের সহজ স্ট্যাম্পিং করেন মিস। ওই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে আফগানদের অষ্টম উইকেট পড়ে যায়। শেষ ১৯ বলে ১৩ রানের প্রয়োজনীয়তা হয়ে ওঠে বিশাল। মুশফিক হাতে বল জমাতে না পারায় তা হয় না। শেষ ওভারের তৃতীয় বলে দুই দলের স্কোর সমান থাকা অবস্থায় নাজিবুল্লাহর (২২) আউট আফসোস ছড়ায় আরো বেশি করে। পরের বলে চার মেরে দৌলত জাদরান দারুণ এক জয় এনে দেন আফগানিস্তানকে। ২০১৬-এর মিরপুরে ফিরিয়ে আনেন বাংলাদেশের সেই ২০১৪ ফতুল্লার দুঃস্বপ্ন।

সে দুঃস্বপ্নের প্রথম প্রহর ছিল ব্যাটিংয়েই। ৪৯.২ ওভারে ২০৮ রানে অলআউট হয়ে গিয়ে। ১০ ওভারে বিনা উইকেটে ৪৩ রানের সাবধানী শুরু হয় যদিও। এরপর তামিম ইকবাল (২০) বাজে শট খেলে বিলিয়ে আসেন উইকেট। বাজে সময়ের চোরাবালিতে আটকে যাওয়া সৌম্য সরকারও (২০) তাই। ইমরুল কায়েস বাদ পড়ায় ব্যাটিং অর্ডারে এগিয়ে আসা মাহমুদ উল্লাহ-মুশফিকুর রহিমের শুরুটা ভালো। কিন্তু তা টেনে নিতে না পারার অপরাধে তাঁরাও অপরাধী। এই দুজনের আউটে ১২২ রানে চার উইকেট পড়ে যায় বাংলাদেশের।

সাকিব এসে শুরু করেন তাঁর মতো। সহজ এক ক্যাচ দিয়ে বেঁচেও যান একবার। কিন্তু কতক্ষণ আর! নবির অফস্পিনে আউট ওই ওভারেই। পরের দুই ওভারে সাব্বির রহমান ও মাশরাফি বিন মর্তুজা আউট হলে হঠাৎ দিশাহারা বাংলাদেশ। ১৪১ রানে সাত উইকেট হারানোয় ২০০ তখন রীতিমতো হিমালয়ের চূড়া।

মোসাদ্দেকের বীরত্বে তত দূর অবশ্য যেতে পারে স্বাগতিকরা। সাত নম্বরে নেমে চারটি চার ও দুই ছক্কায় ৪৫ বলে ৪৫ করে থাকেন অপরাজিত। এর চেয়েও বড় ব্যাপার রুবেল হোসেনের সঙ্গে শেষ উইকেটে ৪৩ রানের জুটি গড়া। তাতে অলআউট হওয়ার আগে স্কোরবোর্ডে জমা হয় ২০৮ রান। জোটে কিছুটা লড়াইয়ের রসদ।

যোদ্ধার মতো সে লড়াই করেন সাকিব (১০-০-৪৭-৪), মোসাদ্দেককে (১০-১-৩০-২) সঙ্গে নিয়ে। চেষ্টার কমতি রাখেন না মাশরাফিও (১০-১-৩১-১)। কিন্তু আফগানিস্তানের কাছে বিব্রতকর হার তাতে এড়ানো যায় না। তাতে শেষবেলায় ওই মুশফিকের স্ট্যাম্পিং মিসের হাহাকার শোনা যায় কান পাতলে। আফগানদের কাছে পরাজয়ের দীর্ঘশ্বাসও।

কী আশ্চর্য, ওই হাহাকারের ধ্বনিও তো সৈয়দ হকের আরেক অমর পঙিক্ততে প্রতিধ্বনিত বলে কল্পনা করে নেওয়া যায়—‘পথিক, বাংলায় যদি জন্ম তোমার/আমার দীর্ঘশ্বাস শুনতে পাবে। ’ মহান লেখকের শেষযাত্রার দিনে ক্রিকেটের দীর্ঘশ্বাস মিশে রইল তাঁর কল্পরাজ্য জলেশ্বরীর আকাশে-বাতাসে।


মন্তব্য