kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জলেশ্বরীর জাদুকর চলে গেলেন

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



জলেশ্বরীর জাদুকর চলে গেলেন

জলেশ্বরীর জাদুকর চলে গেলেন। তিনি যে যাবেন তা জানতাম।

তিনি যখন ক্যান্সার রোগ নিয়ে লন্ডনে চিকিৎসার জন্য আসেন, তখনই জেনেছিলাম, তাঁর আরোগ্য লাভের সম্ভাবনা কম। তারপর ডাক্তাররা যখন বললেন, তাঁর শরীর আর চিকিৎসা সহ্য করতে পারছে না, তাঁর দেশে ফিরে যাওয়া উচিত। তখনই বুঝেছি এই আমাদের শেষ সাক্ষাৎ। তবে এত শিগগির তিনি চলে যাবেন, এটা ভাবিনি। ভেবেছিলাম অন্তত মাস ছয়েক থাকবেন। কিন্তু মাত্র মাসখানেকের ভেতরেই তাঁর এমন মৃত্যু শোকের জ্বালা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

এই রোগ জ্বর জ্বর শরীরে তিনি শেকসপিয়ারের ‘হ্যামলেট’ এর বাংলা রূপায়ণ করেছিলেন। নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুকে নিয়ে যখন আমি হ্যারোতে তাঁর শ্যালিকার বাসায় তাঁকে দেখতে যাই, তখন তিনি বাচ্চুকে বলেছিলেন, ‘বাচ্চু আমি এই হ্যামলেট শেষ করে যেতে চাই, এটা তোমার হাতে আমি তুলে দিয়ে যাব। ’ সেটা তিনি পেরেছিলেন কি না আমার জানা নেই। ওই বাসায় পরে তাঁর একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন লন্ডনের ডায়মন্ড স্টুডিওর পক্ষ থেকে গোলাম রব্বানী এবং অনুজিৎ সরকার। আমাদের দুজনেরই কথোপকথন তারা ভিডিও করেছিল। তাতে আমরা পঞ্চাশের দশকে ঢাকায় আমাদের পরিচয় এবং সাহিত্য চর্চার নানা স্মৃতি রোমন্থন করেছি। সৈয়দ শামসুল হক বলেছিলেন, ‘গাফ্ফার আমার এখন মরতে ভয় নেই। কেবল একটা সাধ, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীটা যেন দেখে যেতে পারি। আমি তাঁর জীবন নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি তৈরি করার জন্য সুদূর জাপানে গিয়েছিলাম। তাঁর জীবনচিত্রের মধ্যে ডুবে গিয়ে মনে হয়েছে এক অসাধারণ পুরুষের সাক্ষাৎ পেয়েছি। মাত্র আধঘণ্টার ডকুমেন্টারিতে তাঁকে ধরা যায় না। তাঁকে নিয়ে মহাকাব্য লেখা চলে। ’ তাঁর অনুরোধে ওই সাক্ষাৎকারে রবীন্দ্রনাথের একটি গানের দুই লাইন ভাঙা গলায় গেয়েছিলাম— চাহি না রহিতে বসে ফুরাইলে বেলা তখনই চলিয়া যাব শেষ হলে খেলা।

এই সাক্ষাৎকার রেকর্ডিং হওয়ার পর শামসুল হক বলেছিলেন, ‘আমার আরো কিছুদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছা। আরো কিছু কাজ বাকি আছে। সেগুলো শেষ হলে চলে যেতে দুঃখ নেই। ’ যেদিন তিনি চলে যাচ্ছেন লন্ডন ছেড়ে, সেদিন অত্যন্ত অসুস্থতার মধ্যেও এয়ারপোর্ট থেকে আমাকে টেলিফোন করেছিলেন, বললেন, ‘তুই আমাকে দেখতে এলি না?’ আমি সেদিন নানা কারণে হিথরো এয়ারপোর্টে তাঁকে শেষ দেখা দেখতে যেতে পারিনি। এই দুঃখটা চিরদিনের জন্য মনে রয়ে গেল।

সৈয়দ শামসুল হক আমাকে ডাকতেন ‘বান্ধব’ বলে। সম্পর্কটা ‘তুই’ এবং ‘তোমার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ঢাকায় থাকতে ঝগড়াবিবাদ অনেক হয়েছে। কিন্তু বন্ধুত্বটা ছিল পাকা। পঞ্চাশের দশকে ঢাকার ‘সওগাত’ অফিসে সাহিত্য বৈঠকে প্রথম আমাদের পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা। সেই সম্পর্কে আর কোনো দিন ক্ষয় ধরেনি। আমি মনে করি দেশভাগের পর ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যে শামসুল হক একটি মাইলফলক। একজন ক্রান্তিকালের সাহিত্যিক। যিনি ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যকে গ্রামনির্ভরতা থেকে প্রথম নাগরিক জীবনে টেনে তোলেন। কবিতায় এবং গল্পে—দুইয়ে তখনো আমরা পঞ্চাশের দশকের লেখকরা নগর জীবন নিয়ে লিখতে অভ্যস্ত হইনি। আমাদের নগর জীবন তখনো গড়ে ওঠেনি। ঢাকা শহর তখনো আধুনিক নাগরিকতার ছোঁয়া পায়নি। আমাদের প্রধান কবি শামসুর রাহমানও জীবনানন্দের প্রভাবে যে প্রকৃতি ও লোকজীবন নিয়ে কবিতা লিখতেন তাতে নগরবোধের ছোঁয়া কম ছিল। শামসুল হক এই বাধাটি অতিক্রম করেন। আমাদের শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণি তখন সবেমাত্র গড়ে উঠেছে। আমরা অনেক গ্রামীণ সংস্কার কাটিয়ে উঠছি। সৈয়দ শামসুল হক সেই গড়ে ওঠা নগর জীবন ও নাগরিকদের জীবনচিত্র তুলে ধরেন তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘তাস ও অন্যান্য গল্পগ্রন্থ’-এ। শরত্চন্দ্র এককালে ‘চরিত্রহীন’ উপন্যাস লিখে বাংলা সাহিত্যে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিলেন। সৈয়দ শামসুল হক ঢাকাকেন্দ্রিক সাহিত্যে সেই চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন তাঁর ‘খেলারাম খেলে যা’ উপন্যাসে।

তিনি সত্যিই ছিলেন সব্যসাচী লেখক। কবিতা, গল্প, গান, চিত্রনাট্য, নাটক—সব কিছুতেই তাঁর প্রতিভার স্বাক্ষর অম্লান। তাঁর ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’, ‘নূরলদীনের সারা জীবন’—বাংলা নাট্য সাহিত্যে অমর অবদান। সমসাময়িক রাজনৈতিক আবেগকে কিভাবে চিরায়ত সাহিত্যের রসে রসায়িত করা যায়, এই দুই নাটকেই শামসুল হক তার প্রমাণ রেখেছেন।

তাঁর কবিতাও ধারালো, আধুনিকতায় ঝকঝকে। তাঁর কবিতা হৃদয়গ্রাহ্য, সংবেদনশীল এবং তাঁর শব্দ চয়ন ও ভাষাতে রয়েছে উত্তরাধুনিকতার ছাপ। তাঁর এই সদ্য প্রয়াণের মুহৃর্তে তাঁর সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বেদনাবিধুর মনে শুধু ভাবছি তাঁর সঙ্গে কাটানো ঢাকা ও লন্ডনের দিনগুলোর কথা। একসঙ্গে লন্ডনে বিবিসি বাংলা রেডিওতে কাজ করেছি। লন্ডনের নানা রেস্তোরাঁয় ঘুরে বেরিয়েছি, আড্ডা দিয়েছি। এই একটি মাত্র মানুষ যিনি লন্ডনে থাকার লোভ সংবরণ করে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন। যখনই লন্ডনে আসতেন সঙ্গে সঙ্গে টেলিফোন, ‘বান্ধব, কখন দেখা হবে?’ তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হকও বিখ্যাত লেখিকা। আমরা তিনজন মিলে কখনো আমার বাসায়, কখনো তাঁর ছেলের বাসায় এবং কখনো কোনো রেস্তোরাঁয় আড্ডা দিতাম। দেশের অবস্থা, দেশের সাহিত্য এবং তাঁর নিজের আশা-আকাঙ্ক্ষার কথা নিয়ে আলোচনা করে আমরা সময় কাটাতাম। এবারও ক্যান্সার রোগ নিয়ে লন্ডনে এসে আমার বাসায় একদিন সারা দিন কাটিয়েছেন। যখন রোগশয্যায় কথা বলতে পারেন না তখন তাঁর স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক আমাকে টেলিফোন করে বলেছেন, ‘হক আপনার সঙ্গে কথা বলতে চান, আপনাকে দেখতে চান। ’ আমি টেলিফোন করতাম এবং কখনো কখনো তাঁর শ্যালিকার বাসায় চলে যেতাম। তাঁর সঙ্গে আমি শেষবারের মতো সভামঞ্চে উঠেছি গত ১৫ আগস্ট তারিখে। লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনারের উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু দিবসে এই সভা হয়। সেই সভায় আমরা দুজনেই ছিলাম বক্তা। শামসুল হক অসুস্থ শরীরে চেয়ারে বসে বঙ্গবন্ধুর জীবন নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বক্তৃতা শেষে পাশে বসা আমাকে বললেন, ‘বান্ধব, আমি এখন চলে যাই। আর পারছি না। শরীরে বড় যন্ত্রণা। ’ স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক সঙ্গে এসেছিলেন। সভা শেষ হওয়ার আগেই তাঁরা চলে যান।

অসুস্থ অবস্থায় একবার টেলিফোনে কথা হওয়ার সময় বললেন, ‘বান্ধব, পৃথিবীটাকে এত দিন ভালোবেসেছি এক চোখে। আজ ভালোবাসি আরেক চোখে। এই রূপ, রস, গন্ধময় পৃথিবী ছেড়ে চলে যাব—এটা যেন ভাবতেই পারি না। সারা পৃথিবী যেন দুবাহু দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরতে চাইছে, আমিও থাকতে চাইছি। ’ এই কথাকটি এখনো আমার কানে বাজে। ২৭ সেপ্টেম্বর দুপুরে যখন ঢাকা থেকে তাঁর মৃত্যুর খবর পেলাম তখন প্রথমেই মনে হয়েছে তাঁকে আর দেখব না। যিনি পৃথিবীকে ভালোবেসেছিলেন, তাঁকেও পৃথিবী ছেড়ে যেতে হলো! কুড়িগ্রামে তাঁকে সমাহিত করা হবে—এটি ছিল তাঁরই ইচ্ছা।

সৈয়দ শামসুল হক নেই। পঞ্চাশের দশকের শেষ দীপ্যমান নক্ষত্রটি যেন ঝরে গেল। নিজেকে মনে হয় বড় একা।

লেখক : কলামিস্ট, কথাসাহিত্যিক

অনুলিখন : শারমিনুর নাহার।


মন্তব্য