kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সার্ক সম্মেলন স্থগিত পাকিস্তানের দোষে

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



সার্ক সম্মেলন স্থগিত পাকিস্তানের দোষে

বাকি ছিল মাত্র ৪১ দিন। সংশয়ও ছিল।

সেই সংশয়ই সত্যি হলো গতকাল। স্থগিত হয়ে গেল ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে আগামী ৯ ও ১০ নভেম্বর হওয়ার কথা ছিল দক্ষিণ এশিয়ার আট দেশের জোটের এ সম্মেলন।

‘বিরাজমান পরিস্থিতি’তে বাংলাদেশ, ভারত, ভুটান ও আফগানিস্তান মঙ্গলবার ঘোষণা দেয় তারা ইসলামাবাদে সার্ক সম্মেলনে যাবে না। এই পরিস্থিতিতে গতকাল বুধবার সম্মেলন স্থগিতের ঘোষণা দেয় সার্কের বর্তমান সভাপতি দেশ নেপাল। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে ইংরেজি দৈনিক কাঠমাণ্ডু পোস্ট এ তথ্য জানিয়েছে।

বাংলাদেশ বলছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারসহ অভ্যন্তরীণ কিছু বিষয়ে অব্যাহতভাবে পাকিস্তান নাক গলানোয় বাংলাদেশ সার্ক সম্মেলনে যাচ্ছে না। অন্যদিকে সম্প্রতি কাশ্মীরে ভারতীয় সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করে ভারত বলছে, আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সন্ত্রাস একসঙ্গে চলতে পারে না। ভুটান ও আফগানিস্তান বলছে, সন্ত্রাসবাদ নিয়ে এ অঞ্চলে তৈরি হওয়া উত্তেজনার কারণে তারা পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। সার্কভুক্ত অন্য দেশগুলো হচ্ছে পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ।

সদস্য চার দেশের সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা ‘দুঃখজনক’ উল্লেখ করে পাকিস্তান বলছে, এ ব্যাপারে তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানানো হয়নি। আর সার্ক সম্মেলন নিয়ে তৈরি হওয়া সংকট নিরসনে পাকিস্তানের পরিবর্তে অন্য কোনো দেশে এ সম্মেলন আয়োজনের কথা নেপাল ভাবছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে জানিয়েছে।

সার্কের নিয়ম অনুযায়ী, জোটভুক্ত একটি দেশও সম্মেলনে অংশ নিতে অপারগ হলে সেই সম্মেলন স্থগিত বা বাতিল হয়ে যায়। এর আগে কয়েকটি সার্ক সম্মেলন বাতিল হওয়ার ইতিহাসও রয়েছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর কাশ্মীরের উরিতে ভারতীয় সেনাঘাঁটিতে সন্ত্রাসী হামলায় ১৮ সেনা নিহত হওয়ার ঘটনায় পাকিস্তানকে দায়ী করছে ভারত। জাতিসংঘের অধিবেশনেও এ নিয়ে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য উত্তেজনা ছড়ায়। বিষয়টি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর সার্কের সভাপতি দেশ নেপালকে সাফ জানিয়ে দেয়, তারা পাকিস্তানে প্রস্তাবিত সার্ক সম্মেলনে অংশ নিচ্ছে না। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বাংলাদেশ, ভুটান ও আফগানিস্তানও সম্মেলনে অংশ না নেওয়ার কথা জানিয়ে দেয় নেপালকে।

ইউএনবি জানায়, বিষয়টি নিয়ে গতকাল বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো. শাহরিয়ার আলম মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। ভারতের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে বাংলাদেশ সার্ক সম্মেলন বয়কট করছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের একান্তই নিজস্ব। এর সঙ্গে অন্য কোনো দেশের সিদ্ধান্তের সম্পর্ক নেই। ’

কাশ্মীরে সন্ত্রাসী হামলার পর সন্ত্রাস দমনে ভারতের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে বাংলাদেশ। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে পাঠানো এক চিঠিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই প্রতিশ্রুতির কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন, ‘ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও প্রতিবেশী হিসেবে এই অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকা ও সীমানাজুড়ে চলমান সব হুমকি নির্মূলে আমরা একসঙ্গে কাজ করব। ’

কাশ্মীর হামলার ঘটনায় পাকিস্তানকে একঘরে করার যে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে, বাংলাদেশের সার্ক সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে এর কোনো যোগসূত্র আছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমি সেটা বলব না। এটি বাংলাদেশের নিজস্ব একটি সিদ্ধান্ত। ’

প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘মঙ্গলবার সার্কের সভাপতি দেশ নেপাল ও সার্ক সচিবালয়কে চিঠি দিয়ে আমরা জানিয়েছি যে নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশ যোগ দিচ্ছে না। এর কারণ হিসেবে আমরা বলেছি, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে একটি দেশ নিয়মিত হস্তক্ষেপ করে যাওয়ার কারণেই বাংলাদেশ ইসলামাবাদে অনুষ্ঠেয় সম্মেলন বয়কটের পথে হাঁটতে বাধ্য হয়েছে। অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ এমন একটা পরিবেশ তৈরি করেছে, যা সম্মেলন আয়োজনের উপযোগী নয়। ’

প্রতিমন্ত্রী সেই ‘একটি দেশের’ নাম উল্লেখ না করলেও স্পষ্টতই পাকিস্তানের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। বাংলাদেশ একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করার পর থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছে পাকিস্তান। বিভিন্ন সময়ে এ বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের হস্তক্ষেপ ও পাকিস্তানে বিভিন্ন ইসলামী সংগঠনের বাংলাদেশবিরোধী বিক্ষোভে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপড়েন শুরু হয়। সবশেষ গত ৩ সেপ্টেম্বর যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের পর নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করা হয় পাকিস্তানের পার্লামেন্টে। জবাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এমন মন্তব্য এড়িয়ে চলার আহ্বান জানায় বাংলাদেশ সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানে সার্ক সম্মেলন বর্জনের ঘোষণা দিল বাংলাদেশ।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সব সময় যেটি বলি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে, বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে, বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচার প্রক্রিয়া এবং পরবর্তীতে ফাঁসি কার্যকর করার প্রশ্নে এই বিষয়গুলোতে বাংলাদেশ কারো সঙ্গে কখনো আপস করেনি, করবেও না। ’

পরিস্থিতি অনুকূলে এলে বাংলাদেশ সার্ক সম্মেলনে অংশ নেবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সার্কের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতা, কানেকটিভিটি ও সার্বিক সহযোগিতার বিষয়টি বিশ্বাস করে। সময়-সুযোগ যখন আসবে, তখন বাংলাদেশ এখানে অংশ নেবে। ’

পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হবে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেন, ‘সেটা সময়ই বলে দেবে। ’

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম বিবিসি বাংলাকে গতকাল বলেন, ‘সার্ক সম্মেলনে বাংলাদেশের না যাওয়ার সঙ্গে ভারতের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা এমনিতেও যেতাম না। ’ তিনি আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ পাকিস্তানের নাক গলানোর বিষয়ে ইতিমধ্যে প্রতিবাদ করেছে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূতকে ডেকে প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। প্রকাশ্যে সবাই প্রতিবাদ করেছি যে পাকিস্তান আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলাচ্ছে। প্রতিটি ফাঁসির পরই তারা শুধু সমালোচনাই করেনি, তারা পার্লামেন্টে নিন্দা প্রস্তাবও নিয়েছে। তাদের মন্ত্রীরা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিয়েছেন এবং এমন সব কথাবার্তা বলেছেন যেন আমরা পাকিস্তানি নাগরিকদের ফাঁসি দিচ্ছি। ওখানেই তো প্রমাণ হয়ে যায় যে তারা আমাদের ব্যাপারে কতখানি নাক গলাচ্ছে। ’

এইচ টি ইমাম বলেন, অন্যান্য রাষ্ট্র অন্য কারণে সার্কে যোগদান না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যেমন ভারত, আফগানিস্তান ও ভুটান বলছে, পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষক, তারা সন্ত্রাস রপ্তানি করে, যে কারণে তাদের প্রতিবেশীরা শান্তিতে থাকতে পারছে না।  

ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র বিকাশ স্বরূপ সাংবাদিকদের বলেন, বর্তমানে এ অঞ্চলের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারত আসন্ন সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে পারছে না। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে জোটের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বিদ্যমান থাকায় এ সম্মেলন সফল হওয়া সম্ভব নয়। আর আঞ্চলিক সহযোগিতা ও সন্ত্রাস একসঙ্গে চলতে পারে না।

নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী সাংবাদিকদের বলেন, উপমহাদেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। উপমহাদেশে যে অনাস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে সার্কের মতো শীর্ষ সম্মেলনের পরিস্থিতি নেই। এই অবিশ্বাস ও অনাস্থার পরিস্থিতিতে কোনো আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সফল হবে না। এ ধরনের অনুষ্ঠান অর্থহীন হয়ে যাবে বলেই মনে করে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের হাইকমিশনার বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ কিছু ঘটনায় আস্থার জায়গায় নেই। পাকিস্তান যেভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে, তাতে আস্থার সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ একাধিকবার তার মতো করে প্রতিবাদ জানিয়েছে, পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে তলব করেছে। তবে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। পাকিস্তান মনোভাব বদলায়নি। বাংলাদেশ অসন্তুষ্ট হয়েছে। সার্কের স্বরাষ্ট্র ও অর্থমন্ত্রীদের সম্মেলনেও বাংলাদেশ অংশ নেয়নি। এই নীরব প্রতিবাদের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার মনোভাব জানিয়ে দিয়েছে। তবে প্রতিবেশীদের ব্যাপারে পাকিস্তানের মনোভাব বদলায়নি।

পাকিস্তান টুডে জানায়, সার্ক সংকটের জন্য ভারতকে দায়ী করে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘তাদের অজুহাতের পরিপ্রেক্ষিতে বক্তব্য হচ্ছে, সমগ্র বিশ্ব জানে পাকিস্তানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের হোতা ও অর্থদাতা ভারত। ’ চার দেশ বয়কট করার পরও নির্দিষ্ট দিনেই পাকিস্তানে সার্ক সম্মেলন হবে বলে জানিয়েছে পাকিস্তান রেডিও। পাক পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র নাফিস জাকারিয়া বলেন, এ অঞ্চলের শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় পাকিস্তান প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।  

বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার ভারতের প্রভাবে চলে বলে পাকিস্তানের অনেক রাজনৈতিক নেতা অভিযোগ করে আসছেন। যুদ্ধাপরাধী জামায়াত নেতাদের দণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তান জামায়াতের নেতারা বলেছিলেন, নয়াদিল্লি বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সরকারকে ক্ষমতায় রেখেছে।   

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘বর্তমানে এ অঞ্চলের যে পরিস্থিতি, তাতে শিগগির সার্ক সম্মেলন আয়োজন করা সহজ হবে বলে মনে হয় না। ’

দক্ষিণ এশিয়াকে এক সূত্রে গাঁথার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৫ সালে গঠিত জোট সার্ক এখনো আশার সঞ্চার ঘটাতে পারেনি। পারস্পরিক সহযোগিতার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য পূরণের পথে বারবারই দিশা হারিয়েছে এই জোট। তার ওপর সরকারপ্রধানদের গুরুত্বপূর্ণ এই সম্মেলন না হওয়ায় হোঁচট খাবে আঞ্চলিক সহযোগিতার সব ক্ষেত্র।


মন্তব্য